‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’ /নিউইয়র্ক টাইমসে হাসিনাকে পদত্যাগের আহ্বানের খোলা চিঠিতে যা ছিল

জুলাই অভ্যুত্থানে আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার প্রতি সংহতি জানিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন প্রবাসীরা। বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য তৎপরতা ছিল যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিদের সংগঠন ‘উই লাভ বিডি’র।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে ২০২৪ সালের ২ আগস্ট বিজ্ঞাপন আকারে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করে সংগঠনটি। এতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবি করা হয়।
উই লাভ বিডির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আব্দুল আজিজ ভূঁইয়া। তিনি নিউইয়র্কের হিলসাইড ইসলামিক সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত এবং নিউইয়র্ক সিটির কাউন্সিল মেম্বার জোহরান মামদানির ট্রানজিশন টিমের সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে এই আন্দোলনের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে কাজ করে গেছে সংগঠনটি। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানোর ক্ষেত্রেও তাদের ভূমিকা ছিল। এ ছাড়া জাতিসংঘ মহাসচিবসহ সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের তখনকার পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য তারা তহবিল সংগ্রহ করে চিকিৎসা ও ত্রাণসামগ্রী পাঠায়।
যা ছিল সেই খোলা চিঠিতে:
নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত ‘উই লাভ বিডি’র সেই চিঠিটির বাংলা অনুবাদ নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো।
বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি একটি খোলা চিঠি
পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা
আসসালামু আলাইকুম। আপনার নেতৃত্বে বর্তমান বাংলাদেশের অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে আমরা আপনার কাছে লিখছি। এই চিঠিটি আপনাকে দ্রুত গভীরভাবে চিন্তা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ—সেসব মানুষের পক্ষ থেকে, যারা বিশ্বাস করেন দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার আজ ভুলুণ্ঠিত। যা দৃশ্যত, সব বিষয় ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে সর্বব্যাপী আদর্শ— অর্থাৎ ‘ন্যায়বিচার কর এবং সৎকাজ কর’ (কোরআন- ১৬: ৯০), তা পুরোপুরি বিসর্জন দেওয়া হয়েছে।

মানবাধিকারসংক্রান্ত উদ্বেগ
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক বিষয়। সংবিধান অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থেকে তাকে বঞ্চিত করা যাবে না। পাশাপাশি এটি আটক হওয়া ব্যক্তিদের জন্যও সুরক্ষার ব্যবস্থা প্রদান করে।
সম্প্রতি যারা বৈষম্যমূলক, স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের ৫৫ শতাংশ কোটা পদ্ধতি সংস্কারের মাধ্যমে তাদের ন্যায্য অধিকার চেয়েছিল, বিনা উসকানিতে সেই ছাত্র ও নাগরিকদের ওপর গুলি চালানো, হত্যা এবং গণগ্রেপ্তারের বিষয়ে আমেরিকান বাংলাদেশি কমিউনিটি সত্যিকার অর্থেই উদ্বিগ্ন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আপনি ব্যক্তিগতভাবে তাদের সবাইকে ‘রাজাকার’ হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য একটি পুরোনো গালি ব্যবহার করেছেন, যা ১৯৭১ সালের দুই প্রজন্ম আগের স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। আন্দোলনকারীদের এমন ঘৃণ্য চরিত্রায়ন মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।
পরিহাসের বিষয়, ১৯৮৮ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নেত্রী হিসেবে আপনি পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে বিক্ষোভকারী জনতার ওপর গুলি না করার জন্য সতর্ক করেছিলেন। অথচ এখন আপনার চোখের সামনেই শত শত নিরীহ বাংলাদেশি, যাদের বয়স পাঁচ থেকে ত্রিশের মধ্যে, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে এমনকি ছাদের ওপর এবং ঘরের ভেতরেও হত্যা করা হয়েছে। স্পষ্টতই, একজন নির্দোষ মানুষকে হত্যা করা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার শামিল (কোরআন-৫:৩২) এই সতর্কবাণী আপনার কাছে পৌঁছায়নি।
সুশাসন ও গণতন্ত্রের ইস্যু
বাংলাদেশিরা আপনাকে দুইবার ক্ষমতায় বসিয়েছিল। কিন্তু আপনার দিক থেকে এর যথাযথ প্রতিদান আসেনি। সমৃদ্ধ ব্যক্তিগত ইতিহাসের কারণে বাংলাদেশিরা আপনার কাছ থেকে উন্নত শাসন এবং তাদের মৌলিক অধিকারের প্রতি সম্মান আশা করেছিল। অথচ ক্ষমতায় থাকাকালীন আপনি ‘বিভক্ত করো এবং শাসন করো’ নামক বিলুপ্ত ঔপনিবেশিক নীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশ পরিচালনা করা বেছে নিয়েছিলেন, যার ফলে এটিকে একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে! বিরোধী দলে থাকাকালীন আপনি দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন একটি নিরপেক্ষ ‘অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ এর অধীনে অনুষ্ঠিত হোক। এটি ২০০৯ সালে আপনার ক্ষমতায় আসার পথ প্রশস্ত করেছিল। তবে ক্ষমতায় আসার পর আপনি এই আইনটি বাতিল করার পথে হাঁটেন। এভাবে ২০১৯ সালে নির্বাচনে ভোটারদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার পর, ২০২৪ সালে নির্বাচনের আগে বিরোধী দলের নেতাদের জেলখানায় বন্দি করেন, যার ফলে তারা মনোনয়ন জমা দেওয়ার নিরর্থকতা বুঝতে পারে।
আপনি অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থ হয়েছেন। ইসলামী ব্যাংকসহ (যা দেশের শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংক ছিল) ব্যাংকিং খাতের অস্থির অবস্থা এবং দুই বছরে টাকার মান ৩৭ শতাংশ দ্রুত হ্রাস পাওয়া ব্যংক ব্যবস্থার ব্যর্থতার স্পষ্ট লক্ষণ। এটি এমন সময়ে ঘটেছে যখন অর্থনীতির প্রকৃত খাতগুলো সমৃদ্ধ হচ্ছিল।
৯/১১ পরবর্তী পশ্চিমা ঝোঁকের কথা মাথায় রেখে, আপনি জনগণকে দমন করার জন্য ক্রমাগত কাল্পনিক ইসলামী উগ্রবাদের হুমকির ভয় দেখিয়ে আসছেন। এক দশক আগে, গভীর রাতে (৬ মে, ২০১৩) বিদ্যুৎ, টিভি ও ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে আপনার বাহিনী ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অসংখ্য ছাত্র ও শিক্ষকদের হত্যা করে। নিহতদের পরিবারগুলোকে হুমকি দেওয়া হয় যাতে তারা প্রকাশ না করে যে, কারা বা কতজন নিহত হয়েছে।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর আপনার হিংসাত্মক দমন-পীড়ন যে কোনো সুশীল সমাজের জন্য অশোভন। একইভাবে, আন্দোলনকারীরা প্রধান বিরোধী দলগুলোর ‘শিকার’ দাবি করে আপনার সহমর্মিতার প্রদর্শন এবং ত্রাণ দেওয়ার প্রস্তাবটি সুকৌশলে ম্যাকিয়াভেলিয়ান (চাতুর্যপূর্ণ)।
পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক সংস্কার জরুরি প্রয়োজন। এরমধ্যে রয়েছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের বিচার এবং একটি নতুন, জনসমর্থিত সংবিধান প্রতিষ্ঠা যা স্বচ্ছতা, মেধাভিত্তিক সমাজ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত প্রতিষ্ঠান এবং একটি স্বাধীন বিচার বিভাগকে উৎসাহিত করবে। প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে শ্বাসরুদ্ধকর দলীয় আধিপত্য এবং পারিবারিক শাসনের অবসান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবেই ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্তকারী শক্তিগুলোকে পাল্টে দেওয়া সম্ভব হতে পারে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি বারবার আপনার পবিত্র প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন। যারা তাদের শপথ লঙ্ঘন করে সেই শাসকদের অবজ্ঞা করার ক্ষমতা আমাদের দেওয়া হয়েছে (কোরআন- ৯: ১২)। আপনার কর্তৃত্ববাদ ও বিশ্বাসহীনতা নেতাদের ‘কর্তৃত্বশীল ও বিশ্বস্ত’ হওয়ার যোগ্যতার পরিপন্থি (কোরআন- ২৮: ২৬)।
অতএব, আল্লাহর প্রতি ভয় ও শ্রদ্ধা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রতি আপনার যদি সামান্যতম সম্মানবোধ অবশিষ্ট থাকে, তবে আপনার অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত।
উই লাভ বিডি ইনকরপোরেশনের পক্ষে পাঠানো এই খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেন আব্দুল আজিজ ভূঁইয়া, শাফি এ খালেদ, হাবিব রহমতুল্লাহ, মোহাম্মদ শরীফ খান, মনসুর আহমেদ, ড. মুজিবুর রহমান, ড. মতিউর রহমান, সুলতান উজ জামান, মো. শাহেদুর রহমান, তাজ হাশমি, আফতাব মান্নান, বেলাল আহমেদ, মীর মাসুম আলী, তাসলিমা খালেদ, তাকী খালেদ, তাইসির খালেদ, আকিব খালেদ, গিয়াস আহমেদ, জয়নাল আবেদীন, তুহিন জামান, আমিন মেহেদী এবং ওয়াহিদ ইসলাম।
source: Asia Post







