ধর্মীয় সম্প্রীতি উন্নয়নে ২ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকার প্রকল্প উঠছে একনেকে

স্থানীয় পর্যায়ে নৈতিক মূল্যবোধ ও সামাজিক কল্যাণ সুসংহত করার পাশাপাশি ধর্মীয় সম্প্রীতি জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (এসআইডিপি)’ নামে একটি প্রকল্প নিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৫৬৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় সারাদেশের ৫৩ হাজার মসজিদ, মন্দির, চার্চ, প্যাগোডা, গুরুদুয়ারা, ঈদগাহ, কবরস্থান ও শ্মশানের মতো ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সংস্কার এবং নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বুধবার (৪ নভেম্বর) চলতি অর্থবছরের ষষ্ঠ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিতব্য এ সভায় সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান। এর আগে গত ২৫ অক্টোবর বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের কারণে তা স্থগিত করা হয়।
একনেকের নোটিশ অনুযায়ী, অনুমোদনের জন্য সভায় প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের ১৪টি উন্নয়ন প্রকল্প উপস্থাপন করা হবে। এর মধ্যে নতুন প্রকল্প ১২টি এবং সংশোধিত প্রকল্প দুটি। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ১১ হাজার ৮৯৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, প্রকল্প ঋণ থেকে ৩১৬ কোটি টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ২৮৭ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বুধবারের একনেক সভার আলোচ্যসূচিতে ১৪টি প্রকল্প থাকলেও তালিকার বাইরে সরাসরি টেবিলে আরও দুটি প্রকল্প উপস্থাপন করা হবে। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগের ‘সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (এসআইডিপি)’ রয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগের ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-৩ (আইআরআইডিপি-৩) (তৃতীয় সংশোধন)’ নামের আরও একটি প্রকল্প সরাসরি একনেকে উপস্থাপন করা হবে। প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ধর্মীয় সম্প্রীতি উন্নয়নে স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে নেওয়া ‘সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (এসআইডিপি)’ বাস্তবায়ন করবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। একনেকে অনুমোদন পেলে চলতি বছরই প্রকল্পটির কাজ শুরু হবে। ২০৩০ সালের জুনের মধ্যে এটি শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশের আট বিভাগের ৬৪ জেলার সব উপজেলায় এ উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো, স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক কল্যাণ, ধর্মীয় চেতনা ও সম্প্রীতি সুসংহত করার লক্ষ্যে সারাদেশের ধর্মীয় ও সামাজিক অবকাঠামোর সার্বিক উন্নয়ন করা। এর মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে ৫৩ হাজার ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, সংস্কার ও সম্প্রসারণ।
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দেশের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সম্প্রীতি বজায় থাকার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। দেশব্যাপী সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী করতে সামাজিক সমাবেশ, ধর্মীয় আচার ও অনুষ্ঠান পালনে সামাজিক অবকাঠামো অপরিহার্য। কবরস্থান, শ্মশান, মসজিদ, মন্দির, চার্চ, প্যাগোডা, গুরুদুয়ারা ও ঈদগাহের মতো সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন এবং সেবা মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এ ছাড়া প্রস্তাবনায় হাওরাঞ্চলের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বিশেষ সামাজিক প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্ষাকালে হাওর অঞ্চল প্লাবিত থাকলে মৃতদেহের সৎকারে স্থানীয় বাসিন্দারা সমস্যার সম্মুখীন হন। এ ধরনের প্লাবিত এলাকায় উঁচু ও সংরক্ষিত কবরস্থান অথবা শ্মশান নির্মাণ করা হলে সেই সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে। পাশাপাশি খাসজমি বা দান করা জমিতে গড়ে ওঠা বিদ্যমান সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত সংস্কার ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হলে নাগরিকেরা সহজে ও নিরাপদে এলাকাভিত্তিক আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনা করতে পারবেন। এতে সমাজে নৈতিকতা ও সম্প্রীতি রক্ষায় ভূমিকা রাখবে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার ও সম্প্রসারণ সরকারের অগ্রাধিকার কার্যতালিকার অন্যতম বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এটি সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা তথা সামাজিক সেবার প্রতিশ্রুতি রক্ষার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য কমাতে সহায়তা করবে। এ প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে ২ হাজার ৫৬৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের যৌক্তিকতা
প্রকল্পের যৌক্তিকতা হিসেবে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত প্রকল্পটি একটি সেবাধর্মী ও কল্যাণমূলক প্রকল্প। এর মাধ্যমে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো সংস্কার ও সম্প্রসারণের পাশাপাশি নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হবে। প্রকল্পের আওতায় এসব প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা হলে জনগণ সহজে, নিরাপদে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে এলাকাভিত্তিক সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতে পারবেন। সামাজিক, ধর্মীয়সহ অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে সমাজে নৈতিকতা, সম্প্রীতি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হবে। এক কথায়, নৈতিক ও মানসিক বিকাশের মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে এবং রাষ্ট্র কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত হবে। এ কার্যক্রম সহজতর করার স্বার্থে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
চলতি প্রকল্পের অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিয়ে সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্প
প্রকল্পের নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার বিশাল প্রকল্প প্রস্তাব করা হলেও কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়নি। এটি একটি ‘সেবাধর্মী প্রকল্প’ এমন যুক্তি দেখিয়ে এর কোনো আর্থিক বা অর্থনৈতিক আয়-ব্যয় বিশ্লেষণও ডিপিপিতে যুক্ত করা হয়নি।
এ বিষয়ে প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, এলজিইডি কর্তৃক ইতিপূর্বে বাস্তবায়িত দ্বিতীয় পর্যায়ের অনুরূপ সমাপ্ত প্রকল্পের ফলাফল ও সাফল্য বিবেচনায় প্রকল্পটি ইতিবাচক বলে প্রতীয়মান হয়। এ ছাড়া এটি একটি সেবাধর্মী ও কল্যাণমূলক প্রকল্প হওয়ায় এবং প্রত্যক্ষ কোনো রাজস্ব আয় না থাকায় অর্থনৈতিক আয়-ব্যয় বিশ্লেষণ করা হয়নি।
পিইসি সভার নির্দেশে বাদ বিলাসিতা ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়
প্রকল্প প্রস্তাবনা সূত্রে জানা গেছে, আলোচ্য প্রকল্পে প্রচার ও বিজ্ঞাপনসহ বেশ কিছু খাতে অত্যধিক ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় অপ্রয়োজনীয় আড়ম্বর ও বিলাসী কেনাকাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
পিইসির নির্দেশে প্রকল্পের আওতায় নতুন গাড়ি কেনার প্রস্তাব নাকচ করে কেবল একটি গাড়ি ভাড়ায় চালানোর সংস্থান রেখে ডিপিপি পুনর্গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রচার ও বিজ্ঞাপন খাতে ১১ কোটি টাকা কমিয়ে ৯৩ লাখ টাকা করা হয়েছে। কুরিয়ার খাতের ১২ লাখ টাকা, অডিও-ভিডিও নির্মাণ খাতের ১৫ লাখ টাকা, বিভিন্ন নিবন্ধন ফি খাতের ৫ লাখ টাকা, টপোগ্রাফিক্যাল সার্ভে খাতের ৫০ লাখ টাকা, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি খাতের ২৫ লাখ টাকা এবং জেনারেটর খাতের ৬ লাখ টাকার প্রস্তাব ডিপিপি থেকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে।
অফিসে ফটোকপিয়ার কেনার বাজেট ১৪ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে একটি ফটোকপিয়ারের জন্য ৬ লাখ টাকা করা হয়েছে। একইভাবে ১২ সেট অফিস আসবাবপত্রের সংস্থান কমিয়ে আট সেটে নামিয়ে আনা হয়েছে। ভ্রমণ ব্যয় প্রস্তাবিত ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ব্যয় ১১ লাখ টাকা কমিয়ে ১০ লাখ টাকা এবং ফটোকপি ব্যয় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৪০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া পিইসি সভায় বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় নতুন কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যাবে না। সরকারি অর্থ দেওয়া যাবে কেবল বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সংস্কার ও সম্প্রসারণে। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক মালিকানাধীন কোনো প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের সীমানাপ্রাচীরে টাইলস লাগানো, বাইরের দেয়ালে টাইলস বসানো কিংবা দৃষ্টিনন্দন ফটক নির্মাণের মতো অপচয়মূলক সৌন্দর্যবর্ধন কাজে কোনো প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার করা যাবে না।
পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ
প্রকল্প প্রস্তাবনার ওপর গত ৯ তারিখ পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রকল্প প্রস্তাবনা পর্যালোচনা করে কয়েকটি শর্ত ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়। পিইসি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার বিভাগ ডিপিপি পুনর্গঠন করে গত ১৩ অক্টোবর পাঠায়। সভার নির্দেশনা অনুযায়ী ডিপিপি পুনর্গঠনের পর একনেকে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগ।
পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, গ্রামীণ অঞ্চলে সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণ ও উন্নয়নের মাধ্যমে এগুলোর পরিচালন সক্ষমতা বাড়বে এবং স্থানীয়ভাবে সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি উন্নয়নে প্রকল্পটি সহায়ক হবে। এ বিবেচনায় প্রকল্পটি অনুমোদনযোগ্য। সার্বিক বিবেচনায় প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হলো।
source: Asia Post







