‘বাংলাদেশ মডেলের সহিংসতা’, রেজিম চেঞ্জ চায় কংগ্রেস: ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সরকার পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলেছে ক্ষমতাসীন বিজেপি। দলটির দাবি, নির্বাচন কমিশনের বিরোধিতার আড়ালে নরেন্দ্র মোদির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা চলছে।
দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং দাবি করেছেন, দিল্লিতে চলমান আন্দোলনে ‘বাংলাদেশ মডেলের সহিংসতা’ অনুসরণ করছে মল্লিকার্জুন খাড়গে নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস। দলটির সমালোচনা করে রাজনাথ বলেছেন, তাদের আন্দোলন সিইসি জ্ঞানেশ কুমার বা এসআইআর-এর বিরুদ্ধে নয়; বরং ‘বাংলাদেশ মডেল’ অনুসরণ করে গণতন্ত্রকে দুর্বল করে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করাই তাদের লক্ষ্য।
শুক্রবার (১৫ অক্টোবর) উত্তর প্রদেশের লখনউয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে রাজনাথ সিং এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশ মডেল’ বলতে তিনি মূলত বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার পতনের ঘটনাকে বুঝিয়েছেন। তবে বক্তব্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেননি তিনি।
নির্বাচন কমিশনকে ‘পুতুল’ বানানোর অভিযোগ
লখনউয়ের সংবাদ সম্মেলনে রাজনাথ সিং কংগ্রেসের অতীত ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার অভিযোগ, ক্ষমতায় থাকার সময় কংগ্রেস নির্বাচন কমিশনকে নিজেদের ‘পুতুলে’ পরিণত করেছিল।
১৯৯৩ সালের একটি ঘটনার উল্লেখ করে রাজনাথ বলেন, সে সময় নির্বাচন কমিশনে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার রাষ্ট্রপতির কাছে নির্বাচন কমিশনার নবীন চাওলাকে অপসারণের সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস সরকার উলটো পরে চাওলাকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদে উন্নীত করে বলে দাবি করেন তিনি।
ভোটার পরিচয়পত্র চালুর বিষয়টিও তুলে ধরেন রাজনাথ। তার দাবি, ১৯৯৩ সালের আগে ভারতে ভোটারদের পরিচয় প্রমাণের জন্য ভোটার পরিচয়পত্রের ব্যবস্থা ছিল না। এই পরিচয়পত্র চালুর পর কংগ্রেস আর এককভাবে সরকার গঠন করতে পারেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশন ও ভোটার তালিকা নিয়ে কংগ্রেসের বর্তমান আপত্তির পেছনে রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে।
‘রাহুল গান্ধী মবোক্রেসিকে পথ মনে করেন’
একই দিন এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিজেপির জাতীয় সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী স্মৃতি ইরানিও কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ তোলেন। তার দাবি, রাহুল সংসদীয় পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধান না করে রাস্তায় জনচাপ তৈরি করে সরকার পরিবর্তন করতে চাইছেন।
সাক্ষাৎকারে স্মৃতি ইরানি বলেন, রাহুল গান্ধী সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে কিংবা সংসদীয় ব্যবস্থার মধ্যে থেকে বিরোধ মেটাতে আগ্রহী নন। বরং তিনি ‘মবোক্রেসি’র মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের পথ বেছে নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন ইরানি।
রাহুলের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ২০২৫ সালে তার দেওয়া একটি বক্তব্যের প্রসঙ্গ টানেন স্মৃতি ইরানি। তার দাবি, সে সময় রাহুল বলেছিলেন, তিনি আর বিজেপির বিরুদ্ধে লড়ছেন না; তিনি ‘ইন্ডিয়ান স্টেট’-এর বিরুদ্ধে লড়ছেন।
‘ইন্ডিয়ান স্টেট’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, সেই প্রশ্ন তুলে ইরানি বলেন, ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থা গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। নির্বাচন কমিশন সেই ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। অথচ রাহুল গান্ধী বারবার এই কমিশনকে আক্রমণ করছেন।
ইরানির অভিযোগ, বিরোধীদের সাম্প্রতিক আন্দোলনের উদ্দেশ্য নির্বাচনব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা নয়, বরং ‘শুধুই রেজিম চেঞ্জ’।
তিনি বলেন, রাহুল গান্ধী মনে করেন, দেশ শাসন করা তার ‘জন্মগত অধিকার’। কিন্তু সেই বিশ্বাস থেকে তিনি আইন ভাঙতে বা সহিংসতায় উসকানি দিতে পারেন কি না, সেটিই প্রশ্ন।
‘প্রমাণ নেই’ বলেও প্রমাণ দিচ্ছেন না কেন?
ভারতে ভোট চুরি ও নির্বাচনি অনিয়মের অভিযোগ তুলে দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে আসছেন রাহুল গান্ধী। স্মৃতি ইরানির দাবি, বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে রাহুল তার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ দিতে চাইছেন না।
ইরানি বলেন, রাহুল একদিকে ভোট চুরির অভিযোগের প্রমাণ দিতে চান না, কারণ তার দাবি— এ নিয়ে কোনো প্রমাণই নেই; অন্যদিকে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতেও রাজি নন। এর পরিবর্তে তিনি রাস্তায় নেমে আন্দোলনের পথ বেছে নিয়েছেন।
বিজেপির এই নেত্রীর অভিযোগ, রাহুলের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কিছু মানুষ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে গালাগাল করছেন, এমনকি তার প্রয়াত মাকেও আক্রমণ করছেন। ভারতীয় সেনাবাহিনীকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য এবং পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগও তোলেন তিনি।
স্মৃতি ইরানি আরও বলেন, এসব অভিযোগের মধ্যেও বিরোধীদের প্রতিবাদের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তার বক্তব্য, সরকার বিরোধীদের আন্দোলনের অধিকার কেড়ে নেয়নি; বরং নির্ধারিত স্থানে প্রতিবাদ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
‘বিদেশি সাহায্য’ নিয়েও রাহুলকে আক্রমণ
সাক্ষাৎকারে রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিদেশি সহায়তা চাওয়ার অভিযোগও তোলেন স্মৃতি ইরানি। তার দাবি, কংগ্রেসের নেতারা অতীতে পাকিস্তান ও যুক্তরাজ্যে গিয়ে বিদেশি সহায়তার কথা বলেছেন। রাহুলও বিদেশে গিয়ে ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাইরের সহায়তা চেয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
একজন দায়িত্বশীল বিরোধীদলীয় নেতার আচরণ এমন হওয়া উচিত কি না, সেই প্রশ্ন তোলেন ইরানি। তিনি বলেন, বিজেপিও দীর্ঘ সময় বিরোধী দলে ছিল এবং তিনি নিজেও রাজ্যসভায় বিরোধী দলের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু সে সময় বিজেপির কোনো নেতা অন্য দেশে গিয়ে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের আহ্বান জানিয়েছিলেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
এসআইআর নিয়ে বিরোধীদের আপত্তি
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরকে কেন্দ্র করেই বর্তমান রাজনৈতিক বিরোধের সূত্রপাত। এ প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা পুনরায় যাচাই ও সংশোধন করছে নির্বাচন কমিশন।
বিরোধী দলগুলোর আশঙ্কা, এ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ পড়তে পারে এবং ভোটাধিকার প্রয়োগে বৈষম্য তৈরি হতে পারে। রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী নেতারা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
তাদের অভিযোগ, সংশোধনের নামে ভোটারদের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিজেপি অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, এসআইআরকে কেন্দ্র করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে।
আদালতেও গড়িয়েছে বিরোধ
নির্বাচন কমিশন ও এসআইআর নিয়ে বিরোধ রাজনৈতিক মঞ্চ ছাড়িয়ে আদালতেও গড়িয়েছে। সিইসি জ্ঞানেশ কুমারকে একাধিক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নোটিশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে দিল্লির জন্তর মন্তরকে প্রতিবাদের নির্ধারিত স্থান থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং বিক্ষোভের সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও আদালতে প্রশ্ন উঠেছে।
আদালত বিক্ষোভের সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। এসআইআর পরিচালনা, ভোটার নিবন্ধনের ফরম-৬-এ পরিবর্তন এবং বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ক্ষমতার আইনি সীমা নিয়েও শুনানি চলছে।
ফলে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত ও প্রতিবাদের অধিকার নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি আইনি লড়াইও চলছে।
সরকার পতনের চেষ্টা, নাকি ভোটাধিকার রক্ষার আন্দোলন?
বিজেপির বক্তব্য, রাহুল গান্ধী ও কংগ্রেস এসআইআর কিংবা সিইসির নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানানোর সীমা ছাড়িয়ে সরকার পরিবর্তনের আন্দোলনে নেমেছেন। স্মৃতি ইরানির অভিযোগ, রাহুল সংসদীয় প্রক্রিয়ার বদলে রাস্তাকে রাজনৈতিক চাপ তৈরির মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছেন। আর রাজনাথ সিংয়ের দাবি, কংগ্রেস সহিংসতার মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করতে চাইছে।
অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, ভোটার তালিকার নির্ভুলতা ও ভোটাধিকার রক্ষার জন্যই তারা আন্দোলন করছে। তাদের দাবি, এই প্রতিবাদকে সরকার পতনের ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
দুই পক্ষের পালটাপালটি অবস্থানে সিইসি জ্ঞানেশ কুমার ও এসআইআরকে ঘিরে বিরোধ এখন ভারতের বড় রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে। একদিকে বিরোধীরা নির্বাচনি স্বচ্ছতা ও ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, অন্যদিকে বিজেপি অভিযোগ করছে, এসব ইস্যুকে ব্যবহার করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করা এবং নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা চলছে।
source: Rajneete







