যুক্তরাষ্ট্রে ৩০ বছর পর হামে শিশুর মৃত্যু, সংক্রমণ বাড়ছে বিশ্ব জুড়ে

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে হামে আক্রান্ত হয়ে সোমবার এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ৩০ বছরে অঙ্গরাজ্যটিতে হামজনিত মৃত্যুর এটিই প্রথম ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রে টিকাদানের হার কমে যাওয়া এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাম ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে এ ঘটনা রোগটি প্রতিরোধে টিকাদানের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
রয়টার্স ও এপির খবরে বলা হয়, নিউইয়র্কের গ্রামীণ এলাকা লুইস কাউন্টিতে শিশুটির মৃত্যু হয়। নিউইয়র্কের গভর্নর ক্যাথি হোকুল এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘লুইস কাউন্টিতে হামে আক্রান্ত হয়ে একটি শিশুর মৃত্যুর খবর শুনে আমি ভেঙে পড়েছি।’ এ মৃত্যুর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের টিকাদান নীতির অবস্থানকেও দায়ী করেন তিনি।
হোকুলের অভিযোগ, ওয়াশিংটন প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে মানুষকে সুরক্ষিত রাখতে কয়েক দশকের অর্জনকে ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। হোকুল বলেন, নিউইয়র্কে ৩০ বছর পর হামজনিত এই মৃত্যু মনে করিয়ে দিচ্ছে, টিকাদানের অগ্রগতি ধরে রাখা কতটা জরুরি।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাস থেকে অন্যরা সংক্রমিত হতে পারেন। জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি এ রোগের সাধারণ লক্ষণ। গুরুতর ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া ও মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। প্রতি এক হাজার আক্রান্তের মধ্যে সাধারণত এক থেকে তিনজনের মৃত্যু হতে পারে।
২০০০ সালে নিয়মিত টিকাদানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয়ভাবে হাম ছড়ানো বন্ধ হয়েছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশুদের টিকাদানের হার কমেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধে জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশের দুই ডোজ টিকা নেওয়া প্রয়োজন। এ হার কমে গেলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে এবং বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ছে সংক্রমণ
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২২ অক্টোবর পর্যন্ত দেশটিতে ৪ হাজার ৫৮৮ জনের হাম শনাক্ত হয়েছিল। ২৯ অক্টোবরের হালনাগাদ হিসাবে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৫২।
সিডিসির হিসাবে, চলতি বছর দেশটিতে হামজনিত তিনটি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। তবে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ আরও বেশি মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে। পেনসিলভানিয়ায় চলতি বছর ছয়জনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছে অঙ্গরাজ্যটির স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
নিউইয়র্কের আশপাশের অঙ্গরাজ্য ও গ্রামীণ এলাকায় হাম ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে গত অক্টোবরের শুরুতে জরুরি দুর্যোগ পরিস্থিতি ঘোষণা করেছিলেন গভর্নর হোকুল। এ সময় জারি করা নির্বাহী আদেশে হাম প্রতিরোধী টিকা দেওয়ার অনুমোদনপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিধি বাড়ানো হয়। এর আওতায় প্যারামেডিক ও ধাত্রীসহ আরও কয়েক ধরনের স্বাস্থ্যকর্মীকে টিকা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসকদের পাশাপাশি নার্সদেরও হাম পরীক্ষার নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশেও ভয়াবহ হাম পরিস্থিতি
যুক্তরাষ্ট্রে শিশুর মৃত্যুর ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাম বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি করেছে। বাংলাদেশে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত সংক্রমণ মিলিয়ে ১ হাজার ২৫৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হওয়ার পর মারা গেছে ১০৫ শিশু।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, গত ১৫ মার্চ থেকে ১ নভেম্বর পর্যন্ত সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ২ লাখ ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে। আর পরীক্ষায় সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে ২৩ হাজার ৯৩৫ জনের।
বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতির ব্যাপকতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়েই দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে হাম ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই সময় পর্যন্ত সন্দেহভাজন ১৯ হাজার ১৬১ রোগীর মধ্যে ২ হাজার ৯৭৩ জনের সংক্রমণ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছিল।
বিশ্বের অন্যান্য দেশেও হাম পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (ইসিডিসি) অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেক্সিকোতে চলতি বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২ হাজার ৯৩৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। মারা গেছে ২০ জন।
ইসরায়েলে সেপ্টেম্বরের শুরু পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৮০০ ছাড়িয়েছে, মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। ইংল্যান্ডে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ১ হাজার ৩ জনের সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। আফ্রিকার কঙ্গো, সোমালিয়া ও বুরকিনা ফাসোতেও ব্যাপক সংক্রমণ ও মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে টিকাদান নীতি নিয়ে বিতর্ক
যুক্তরাষ্ট্রে হাম ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় দেশটির স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের (এইচএইচএস) সচিব রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের টিকাদানসংক্রান্ত অবস্থান নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। বিভিন্ন টিকা নিয়ে তার বিতর্কিত মন্তব্য এবং টিকাদান নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তার নেতৃত্বাধীন বিভাগ শৈশবে দেওয়া টিকার সুপারিশের তালিকা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনার উদ্যোগও নিয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো নির্ধারিত সময়ে শিশুদের দুই ডোজ এমএমআর টিকা দেওয়া। এ টিকা হাম, মাম্পস ও রুবেলা থেকে সুরক্ষা দেয়। কোনো এলাকায় টিকাপ্রাপ্ত মানুষের হার ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
নিউইয়র্কের শিশুটির মৃত্যু তাই শুধু একটি অঙ্গরাজ্যের স্বাস্থ্য সংকট নয়, প্রতিরোধযোগ্য রোগ মোকাবিলায় টিকাদানের ধারাবাহিকতা ও কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতির প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে। বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে শিশুদের মৃত্যুর ঘটনা দেখাচ্ছে, টিকাদানে ঘাটতি তৈরি হলে তার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।
source: Rajneete






