News

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয়ে যেভাবে বদলাতে পারে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি

যুক্তরাষ্ট্রের ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদে জয় পাওয়ার ভালো সম্ভাবনা দেখছেন নির্দলীয় বিশ্লেষকেরা। সিনেটেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে তাদের। দুই বছর ধরে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেসের অন্তত একটি কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন ধরনের রাজনৈতিক বাধা তৈরি হতে পারে।

ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস ট্রাম্প প্রশাসনকে যুদ্ধ ঘোষণা এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত স্বাধীনতা দিয়েছে। অথচ মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ও অর্থ বরাদ্দের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে।

এ অবস্থায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে এক বা একাধিক কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের জয় মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতেও বড় পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে— কংগ্রেস বা সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য জয় ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে চারটি বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

ইরান যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করার আগে কংগ্রেসের অনুমোদন নেননি ট্রাম্প। এরপর ডেমোক্র্যাটরা একাধিকবার কংগ্রেসে প্রস্তাব এনে কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিরোধিতা করেছেন। এর মধ্যে একটি প্রস্তাব কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার সমর্থনও পেয়েছিল। তবে ট্রাম্প প্রশাসন সেই প্রস্তাব কার্যকর করেনি।

কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে তারা প্রতিরক্ষা ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নিয়ে ট্রাম্পকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে চাপ দিতে পারেন। একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধের পরিকল্পনা ও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য শুনানিতে হাজির করানোর ক্ষমতাও ব্যবহার করতে পারেন তারা।

অর্থাৎ, যুদ্ধ সরাসরি বন্ধ করার ক্ষমতা না থাকলেও কংগ্রেসের অর্থ বরাদ্দ ও নজরদারির ক্ষমতা ব্যবহার করে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়াতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা।

ইউক্রেনে ফের মার্কিন সহায়তা

রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধরত ইউক্রেনকে সরাসরি মার্কিন আর্থিক ও সামরিক সহায়তা অনেকটাই বন্ধ রেখেছেন ট্রাম্প। তবে কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রিপাবলিকানও ইউক্রেনকে সহায়তার পক্ষে।

রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি নিয়ে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে কংগ্রেসের অনেক সদস্য, এমনকি রিপাবলিকানরাও ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কয়েক সপ্তাহ আগে রুশ জ্বালানি খাতে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর ট্রাম্প প্রশাসন আবার রুশ ডিজেলকে বৈশ্বিক বাজারে ফেরানোর উদ্যোগ নেয় এবং রুশ জ্বালানির ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে।

নভেম্বরে দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসে কোন বিল কখন ভোটে যাবে, তা অনেকটাই নির্ধারণ করতে পারবেন। এর ফলে ইউক্রেনের জন্য নতুন সামরিক ও আর্থিক সহায়তার বিল আনা সম্ভব হতে পারে।

এ ধরনের কোনো বিল পাস হলে ট্রাম্প ভেটো দিলেও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তা অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে ইউক্রেনকে সমর্থন করা রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা পাশে থাকলে।

ট্রাম্পের রাশিয়া নীতির বিরুদ্ধেও কংগ্রেসে চাপ বাড়তে পারে। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা গ্রেগরি মিকস এরই মধ্যে রুশ ডিজেলকে বৈশ্বিক বাজারে ফিরিয়ে আনার ট্রাম্পের পরিকল্পনা ঠেকাতে দ্বিদলীয় একটি আইন প্রস্তাব করেছেন। ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতা পেলে এমন উদ্যোগ আরও গতি পেতে পারে। মিকস প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যানও হতে পারেন।

ইসরায়েলে সামরিক সহায়তায় লাগাম

গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে অসন্তোষ গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুদ্ধে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংসতা এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও এই বিরোধিতাকে বাড়িয়েছে।

ক্ষমতায় এলে ডেমোক্র্যাটরা ইসরায়েলকে দেওয়া মার্কিন সামরিক সহায়তা সীমিত বা বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে পারেন। সবশেষ অর্থবছরে ইসরায়েলকে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যা অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বেশি।

চলতি গ্রীষ্মে প্রতিনিধি পরিষদের প্রায় অর্ধেক ডেমোক্র্যাট ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা বন্ধের একটি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেন। এমনকি যারা ওই উদ্যোগের বিরোধিতা করেছিলেন, তাদের কয়েকজনও ইসরায়েলকে ভারী বোমার মতো অস্ত্র সরবরাহে বিধিনিষেধ আরোপের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। গ্রেগরি মিকসও এমন সীমাবদ্ধতার পক্ষে।

ফলে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের দ্বিদলীয় সমর্থনে বড় পরিবর্তনের চাপ তৈরি হতে পারে।

সামরিক ব্যয় কমিয়ে বৈদেশিক সহায়তা বাড়ানো

ট্রাম্পের রিপাবলিকানদের তুলনায় ডেমোক্র্যাটরা সামরিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে বেশি আগ্রহী। চলতি বছর ট্রাম্প সামরিক বাজেট ৬৭ শতাংশ বাড়িয়ে ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার করার প্রস্তাব দিয়েছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

তবে ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে সেই প্রস্তাব আটকে দিয়েছেন। তাদের আপত্তির অন্যতম কারণ ছিল ইরান যুদ্ধ নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে ট্রাম্পের পরামর্শ না করা এবং একই সময়ে সামাজিক কর্মসূচিতে বড় ধরনের কাটছাঁট।

এর পাশাপাশি কংগ্রেস অনুমোদিত কয়েক বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক সহায়তাও ট্রাম্প প্রশাসন আটকে দিয়েছে বা বাতিল করেছে। ডেমোক্র্যাটদের বড় একটি অংশ এসব কাটছাঁটে ক্ষুব্ধ এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে তারা সেই অর্থ ফেরত আনার চেষ্টা করতে পারেন।

ফলে নভেম্বরে ডেমোক্র্যাটদের জয় শুধু ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যই বদলাবে না, বরং ট্রাম্পের যুদ্ধনীতি, ইউক্রেন ও ইসরায়েল নীতি, সামরিক বাজেট এবং বৈদেশিক সহায়তার ওপরও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে।

তবে এর সবকিছুই নির্ভর করবে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেস নাকি সিনেট, নাকি দুটিই নিয়ন্ত্রণে নিতে পার তার ওপর। ইউক্রেন, ইসরায়েল ও ইরান প্রশ্নে ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের কতটা সমর্থন আদায় করতে পারবেন, তার ওপরও নির্ভর করবে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ।

প্রেসিডেন্ট হিসেবে অবশ্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভেটো ক্ষমতা বহাল থাকবে। তাই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলালেই তার পররাষ্ট্রনীতি রাতারাতি পালটে যাবে— এমন নয়। বরং হোয়াইট হাউজ ও কংগ্রেসের মধ্যে পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে নতুন ক্ষমতার লড়াই শুরু হবে— এমনটিই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

source: Rajneete

Back to top button