News

ময়মনসিংহে প্রাথমিকের হালচাল/ভারপ্রাপ্তে ভরসা, কমছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা

ময়মনসিংহ সদর উপজেলায় অবস্থিত পয়েস্তির চর তারাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে অনুমোদিত শিক্ষকের পদ ছয়টি। বাস্তবে সেখানে শিক্ষকতা করাচ্ছেন দুজন। তাদের মধ্যে একজনকে বিদ্যালয় প্রধানের দায়িত্বও সামলাতে হয়। অর্থাৎ বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে বিদ্যালয় প্রধানসহ চারটি পদ শূন্য রয়েছে।

পয়েস্তির চর তারাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে ২০১৮ সালে শিক্ষার্থী ছিল ২২৩ জন। চলতি বছর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ১১২ জনে। কাগজপত্রে ১১২ জন শিক্ষার্থী থাকলেও সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে বিদ্যালয়ে উপস্থিতি খুবই কম পাওয়া যায়।

দেখা গেছে, শিক্ষক সংকটের কারণে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে এবং তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে পাঠদান করানো হচ্ছে। বর্তমানে সহকারী শিক্ষক মাহবুবা আক্তার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।

মাহবুবা আক্তার এশিয়া পোস্টকে বলেন, মাত্র দুজন শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয়ের পাঠদান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। দরিদ্রপ্রবণ এলাকা হওয়ায় শিক্ষার হার কম। করোনার সময় বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী আশপাশের মাদ্রাসায় চলে যায়, পরে আর ফেরেনি।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ শুমারি (২০২৪ সালে করা) অনুযায়ী, ২০২০ সালে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার ছিল ১৭ শতাংশের বেশি। ২০২৩ সালে তা নেমে আসে ১৩ দশমিক ১৫ শতাংশে। ২০২৪ সালে ঝরে পড়ার হার বেড়ে হয় ১৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। এর মধ্যে ছেলেদের ঝরে পড়ার হার বেশি।

২০২৪ সালের শুমারির বিভাগভিত্তিক তথ্যানুযায়ী ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেট বিভাগে ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক বেশি। এর মধ্যে ময়মনসিংহ বিভাগের চারটি জেলায় ঝরে পড়ার হার ৩০ শতাংশের বেশি। শীর্ষে রয়েছে ময়মনসিংহের গফরগাঁও ও দ্বিতীয় তারাকান্দা উপজেলা।

চলতি বছর গফরগাঁও উপজেলায় ঝরে পড়ার হার প্রায় ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এই উপজেলায় ২০২০ সালে শিক্ষার্থী ছিল ৬০ হাজার ৮১৫ জন। এ বছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৫ হাজার ২৭। চলতি বছর তারাকান্দা উপজেলায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার ৪ শতাংশ।

প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যানুযায়ী, ২০২১ সালে ময়মনসিংহ জেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৫ লাখ ৪৮ হাজার। ২০২২ সালে তা কমে হয় ৪ লাখ ২৭ হাজার। ২০২৩ সালে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কিছুটা বেড়ে হয় ৪ লাখ ৬৯ হাজার, ২০২৪ সালে ৪ লাখ ৬৬ হাজার এবং ২০২৫ সালে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও বেড়ে হয় ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫৬৮। ২০২৬ সালে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে হয়েছে ৪ লাখ ২৫ হাজার ৮২২। এক বছরের ব্যবধানে শিক্ষার্থী কমেছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৪৬।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, করোনাকালে সরকারি বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থী কিন্ডারগার্টেন, মাদ্রাসা ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে চলে যায়। এরপর থেকেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমছে।

শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, ময়মনসিংহ জেলার দুই হাজার ১৪০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে এক হাজার ২৪২টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ জেলার প্রায় ৫৮ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়া। বর্তমানে জেলায় ৮৯৮টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন, যা মোট বিদ্যালয়ের প্রায় ৪১ দশমিক ৯৬ শতাংশ।

বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী শিক্ষকের পদও শূন্য রয়েছে। জেলায় সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ১১ হাজার ৯০২টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ১১ হাজার ৪৯ জন। সহকারী শিক্ষকের ৮৫৩টি পদ খালি। এর প্রভাব পড়ছে বিদ্যালয় পরিচালনা ও পাঠদানে।

অনেক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি নিয়মিত পাঠদান করাতে হচ্ছে। কোথাও আবার শিক্ষকসংখ্যা এতটাই কম যে একাধিক শ্রেণির শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে পাঠদান করাতে হচ্ছে।

সম্প্রতি এমন চিত্র সরেজমিনে দেখা গেছে, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার বোররচর মৃধাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৪ সালে। বিদ্যালয়টির অনুমোদিত শিক্ষক পদ ছয়টি হলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র তিনজন। প্রধান শিক্ষক ও দুজন সহকারী শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য।

২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য হওয়ার পর থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন শাকিলা আক্তার। কয়েক বছরে এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যাও কমেছে। ২০১৯ সালে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ২৩২ জন। বর্তমানে রয়েছে ১৬৫ জন।

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শাকিলা আক্তার বলেন, তিনজন শিক্ষক দিয়ে পুরো বিদ্যালয় চালাতে হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ১০টি করে ক্লাস নিতে গিয়ে শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে, যার প্রভাব পড়ছে পাঠদানের মান ও শিক্ষার্থীদের ওপর।

স্থানীয়রা বলছেন, অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে উপজেলায় মিটিংয়ে যেতে হয়। একইসঙ্গে রয়েছে সহকারী শিক্ষক সংকট। এতে এসব বিদ্যালয়গুলোতে ঠিকমতো পড়াশোনা হচ্ছে না। প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক সংকটে নির্ধারিত সময়ের আগেই অনেক বিদ্যালয় ছুটি হয়ে যায়। আগেই অনেক বিদ্যালয় ছুটি হওয়ার প্রধান কারণ, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক উপজেলায় মিটিংয়ে যাওয়ার পরই অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ছুটি দেওয়া হয়।

সম্প্রতি এক বিকেলে মুক্তাগাছা উপজেলায় ১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বিন্নাকুড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়েও শিক্ষক সংকটের চিত্র দেখা গেছে। দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের ছুটি দিয়ে বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন শিক্ষকরা। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোদ্দাছেরুল হক তখন উপজেলায় মিটিংয়ে ছিলেন। বিদ্যালয়টিতে সাতজন শিক্ষকের স্থলে কর্মরত আছেন মাত্র চারজন।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নুসরাত আহমেদ বলেন, প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয় পরিচালনায় নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের পাঠদানেও।

একই উপজেলার ১১৯ নম্বর গোলাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও শিক্ষক সংকট প্রকট। বিদ্যালয়টিতে অনুমোদিত শিক্ষকের পদ ছয়টি। বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন। ২০১৮ সালে প্রধান শিক্ষক বদলি হওয়ার পর থেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন আইয়ুব আলী।

বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আইয়ুব আলী বলেন, শিক্ষক সংকটের কারণে পাঠদানের পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজও সামলাতে হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ের কোনো সভায় অংশ নিতে গেলেই বিদ্যালয়ের পাঠদান চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, শুধু ময়মনসিংহ জেলা নয়, ময়মনসিংহ বিভাগের চার জেলা–ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা ও শেরপুরে রয়েছে পাঁচ হাজার ৩৫৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দুই হাজার ৭৫টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। এর মধ্যে ময়মনসিংহে ৬৭৩, জামালপুরে ৬৭৪, নেত্রকোনা ৪৮১ ও শেরপুরে ২৪৭টি প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ এই বিভাগে ৪০ শতাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছিল না প্রধান শিক্ষক।

শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার ক্ষেত্রেও দেখা যায়, ২০২৪ সালে ময়মনসিংহ বিভাগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১১ লাখ ২১ হাজার ৮৫৬ জন। কিন্তু ২০২৫ সালে তা ২০ হাজারেরও বেশি কমে যায়।

ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের উপপরিচালক মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, শিক্ষক সংকট নিরসনে সরকার কাজ করছে। দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি বন্ধ থাকায় সংকট বেড়েছে। আশা করি, দ্রুতই পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) অধ্যক্ষ মো. শাহাব উদ্দীন এশিয়া পোস্টকে বলেন, একদিকে শিক্ষক কম, অন্যদিকে শিক্ষার্থীও কমছে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এখন শুধু শূন্য পদ পূরণের চ্যালেঞ্জ নয়; একই সঙ্গে শিশু ও অভিভাবকদের আস্থা ফিরিয়ে আনার প্রশ্নও রয়েছে।

তিনি বলেন, শিক্ষকসংকট, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, অভিভাবকদের পছন্দের পরিবর্তন—সব মিলিয়ে ময়মনসিংহের সরকারি প্রাথমিক শিক্ষায় তৈরি হয়েছে একটি জটিল সংকট।

source: Asia Post

Back to top button