জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্স জুড়ে বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি সেবার মান কমে যাওয়ার প্রতিবাদে শনিবার ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ করেছেন হাজারো মানুষ। এ সময় কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। বিক্ষোভ ঘিরে সহিংসতার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, মন্ত্রণালয় বলছে, শনিবারের বিক্ষোভ ঘিরে এ দিন বিকেল পর্যন্ত ২৭২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্যারিস ছাড়াও দক্ষিণের মার্সেই, উত্তর-পশ্চিমের রেন, দক্ষিণ-পশ্চিমের তুলুজ এবং পশ্চিমের আঙ্গার্স শহরে এসব গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। এসব শহরে মুখোশধারীদের জড়িত থাকার অভিযোগে বিভিন্ন সহিংস ঘটনার কথা জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনার মধ্যে লুটপাটের চেষ্টা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, রাস্তার বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেওয়া এবং ক্ষমতার কেন্দ্র ও সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা রয়েছে। এসব অস্থিরতার জন্য ‘চরম বামপন্থিদের’ দায়ী করেছে মন্ত্রণালয়। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
গত মাসে প্যারিসের দরিদ্র উত্তর উপশহরগুলোর কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়। শিক্ষকসংকট ও বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ অবকাঠামো নিয়ে ক্ষোভ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন পরে বৈষম্য, সরকারি ব্যয় এবং জীবনযাত্রার মান নিয়ে বৃহত্তর প্রতিবাদে রূপ নেয়।
প্যারিসে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ১৯ বছর বয়সী লোলা বলেন, ‘জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে উঠেছে, জ্বালানির দাম অনেক বেশি— এসব কারণে আমরা লড়াই করছি। সারা দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শুধু বিক্ষোভ করার এবং আরও শিক্ষক ও ভালো পরিবেশে পড়াশোনার দাবি জানানোর কারণে সহিংস হামলার শিকার হচ্ছে, আহত হচ্ছে।’
শনিবার রাজধানী প্যারিসের কেন্দ্রীয় এলাকায় পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা যায়। বিশেষ করে শঁজেলিজে সড়ক ও আর্ক দ্য ত্রিয়ঁফের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। অনুমতি নিয়ে আয়োজিত দুটি বিক্ষোভের নির্ধারিত পথের বাইরে রাখা হয়েছিল এসব এলাকা।
রয়টার্স লিখেছে, উজ্জ্বল রঙের ভেস্ট পরা বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন সড়ক অবরোধ করেন। তাদের এ কর্মসূচি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর আগের মেয়াদে আলোচিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের কথা মনে করিয়ে দেয়।
দক্ষিণের শহর মার্সেইয়ের মেয়র জানিয়েছেন, নগর ভবনে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। এ ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে শহরটিতে অতিরিক্ত পুলিশ পাঠানো হচ্ছে। এক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০০ জন মিলে বিক্ষোভ শুরুর স্থানটির দিকে যাওয়ার সময় ‘সব পুলিশই জারজ’ বলে স্লোগান দেন।
আগের দিন শুক্রবার বিক্ষোভকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ। রাজনৈতিক বিভক্তি ও অর্থনীতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে তার মেয়াদের শেষ পর্যায়ে। এদিকে ফ্রান্সের সরকারি ঋণ কমানোর প্রচেষ্টা বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে পারেনি। ফলে দেশটির সরকারের ঋণ নেওয়ার ব্যয় দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের আহত হওয়ার একাধিক ঘটনার পর পুলিশের কৌশল নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। আহতদের মধ্যে এক কিশোরও রয়েছে, যে একটি স্টান গ্রেনেড হাতে তুলে নেওয়ার পর তার একটি হাত হারায়। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু জানিয়েছেন, আগের বিক্ষোভগুলোতে ৯০০ জনের বেশি পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছেন।
পুলিশের বিরুদ্ধে সহিংসতার অন্তত দুই ডজন অভিযোগের তদন্ত করছে দেশটির পুলিশবিষয়ক নজরদারি সংস্থা। শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সময় ফ্রান্সে স্টান গ্রেনেডের ব্যবহার স্থগিত করা হয়েছিল। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, শনিবারের বিক্ষোভে এসব গ্রেনেড ব্যবহার করা হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আগের আন্দোলনগুলোতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের নতুন বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এতে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে বিক্ষোভ আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
২০১৮ সালে ডিজেল জ্বালানির ওপর কর আরোপের প্রতিবাদে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল। পরে তা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ কয়েক শ কোটি ইউরোর করছাড় ঘোষণা করার পর আন্দোলনটি ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসে।
পশ্চিম ফ্রান্সের লা ক্রেশ শহরের শিক্ষক ইয়ানিক মাইয়ু ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি জানান, শনিবারের বিক্ষোভ ঘিরে স্থানীয়ভাবে একাধিক জমায়েতের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোও মানুষকে বিক্ষোভে অংশ নিতে উৎসাহিত করেছে।
source: Rajneete







