মণিপুরে নতুন সহিংসতায় নিহত ৯, পুড়ল ১৪টির বেশি বাড়ি

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে নতুন করে সহিংসতায় ২৪ ঘণ্টায় অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। কামজং, কাংপোকপি ও উখরুল জেলায় বেসামরিক নাগরিক ও গ্রামরক্ষীদের ওপর হামলা, গোলাগুলি ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কুকি ও নাগা সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনার জেরে এই সহিংসতার সূত্রপাত। এতে দুই সম্প্রদায়ের অন্তত ১৪টি বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার ও শনিবার (৯ ও ১০ অক্টোবর) মণিপুরের তিন জেলায় এ সব সহিংসতা ঘটে। এ সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করছিলেন। বৈঠকের সময় তিনি বলেন, মণিপুরে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় তার সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, কামজং ও কাংপোকপি জেলায় চারজন করে এবং উখরুলে একজন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ছয়জন নাগা, দুজন কুকি ও নেপালি বংশোদ্ভূত একজন ব্যক্তি রয়েছেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে খবর, শুক্রবার রাতে কামজং জেলার চাসাদ পুলিশ স্টেশনের কাছে সহিংসতার সূত্রপাত। সেখানে গোলাগুলির মধ্যে পড়ে ৪২ বছর বয়সী কুকি নারী ডমখোনেই তৌথাং নিহত হন। পাঁচ সন্তানের মা তৌথাংয়ের মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে অবশ্য ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে।
কিছু সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশ স্টেশনের কাছে কথিত অবৈধ বাংকার ভাঙার অভিযানে পুলিশ, ইন্ডিয়ান রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন (আইআরবি) ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের সদস্যদের সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির মধ্যে পড়ে তৌথাং নিহত হন। তবে ইস্ট মজোর সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, আইআরবির সদস্যদের হাতে কয়েকজন যুবক আটক হওয়ার প্রতিবাদে চাসাদের নারীরা বিক্ষোভ করেছিলেন। এ সময় ধস্তাধস্তির মধ্যে ওই নারী প্রাণঘাতী আঘাত পান।
তৌথাংয়ের মৃত্যুর পর পালটাপালটি গুলি ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। শনিবার চাসাদে সংঘর্ষে মাইকেল ঙাম্মিনলেন হাওকিপ (২৩) নিহত হন। একই দিন সকালে কামজংয়ের নিংচৌ গ্রামে নাগা সম্প্রদায়ের ঙাচানসো নিংশেন ও লেইশিসান লেইশাদাং নিহত হন।
কুকি গোষ্ঠীগুলো বেসামরিক কুকিদের ওপর হামলার জন্য নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছে। অন্যদিকে নাগাদের বসতিতে হামলার জন্য সন্দেহভাজন কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংশ্লিষ্টতার কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে।
উখরুলে ২০২ নম্বর জাতীয় মহাসড়কে অতর্কিত হামলায় নেপালি বংশোদ্ভূত বেসামরিক নাগরিক সন্দীপ রাই নিহত হন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমার থেকে তৎপরতা চালানো কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সদস্যরা এ হামলায় জড়িত থাকতে পারেন। তবে হামলার পরিস্থিতি ও হামলাকারীদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হয়নি।
কাংপোকপি জেলাতেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ইম্ফল-তামেংলং সড়কের আশপাশে মাকুই আশাং ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় নাগা গ্রামরক্ষীদের ওপর হামলা হয়। দ্য সাংগাই এক্সপ্রেস জানিয়েছে, মাকুই আশাং গ্রামে হামলায় তিনজন নাগা গ্রামরক্ষী নিহত হন। পৃথক এক অতর্কিত হামলায় তাপোন লিয়াংমাই গ্রামে এক বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং দুজন আহত হন। জেলাটিতে বেশ কয়েকটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের খবরও দিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
নতুন করে সহিংসতার জেরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে অবরোধের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কাংপোকপি জেলার মধ্য দিয়ে যাওয়া ইম্ফল-দিমাপুর সংযোগকারী ২ নম্বর জাতীয় মহাসড়কে শনিবার সন্ধ্যা থেকে রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার বন্ধ ঘোষণা করেছে কমিটি অন ট্রাইবাল ইউনিটি (কোটিইউ)। অন্যদিকে ইম্ফল-উখরুল সংযোগকারী ২০২ নম্বর জাতীয় মহাসড়কে শনিবার সকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধের ঘোষণা দিয়েছে ওয়ার্কিং কমিটি অব কুকি সিভিল সোসাইটি অরগানাইজেশনস, উখরুল।
মণিপুর সরকার হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে সবাইকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় জানায়, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী পাঠানো হয়েছে।
এদিকে কুকি উপজাতিগুলোর শীর্ষ সংগঠন কুকি ইনপি মণিপুর এক বিবৃতিতে চাসাদ, উখরুল জেলার ইয়াওলেন এবং কাংপোকপির আইটি রোড এলাকায় কুকি-জো বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ধারাবাহিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনটি হামলাগুলোকে ‘সমন্বিত, বিনা উসকানিতে চালানো এবং নৃশংস’ বলে বর্ণনা করেছে।
বিবৃতিতে সংগঠনটি অভিযোগ করে, এনএসসিএন-আইএম ও এনএসসিএন-ইস্টার্ন ফ্ল্যাঙ্কের সদস্যরা রাজ্যের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সক্রিয় যোগসাজশে এসব কাপুরুষোচিত হামলা চালিয়েছে। এ ক্ষেত্রে টাংখুল রাজ্য পুলিশ ও ইন্ডিয়ান রিজার্ভ ব্যাটালিয়নের সদস্যরাও জড়িত। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো।
২০২৩ সালের মে মাস থেকে মণিপুরে চলমান জাতিগত সহিংসতায় এরই মধ্যে শত শত মানুষ নিহত এবং হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। নতুন করে প্রাণহানি ও অগ্নিসংযোগ রাজ্যটির নাজুক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
source: Rajneete







