খুলনার এই ‘ডিম ঘোটা’ কেন এত জনপ্রিয়

গরম তাওয়ায় সরিষার তেল পড়তেই ছড়িয়ে পড়ে ঝাঁঝালো ঘ্রাণ। তাতে দেওয়া হয় পেঁয়াজ ও কাঁচামরিচ কুচি। একটু ভাজা হয়ে এলে মগে ফেটিয়ে রাখা ডিম ঢেলে দেওয়া হয় তাওয়ার ওপর। এরপর খুন্তি দিয়ে দ্রুত নেড়ে ডিমটি পুরোপুরি শক্ত হওয়ার আগেই নামিয়ে নেওয়া হয়। সবশেষে ছিটিয়ে দেওয়া হয় বিশেষ মশলার মিশ্রণ। এভাবেই তৈরি হয় খুলনার পরিচিত ‘ডিম ঘোটা’।
খুলনা মহানগরীর নিউ মার্কেটসংলগ্ন বায়তুন নূর মসজিদ কমপ্লেক্সের পাশের রাস্তায় প্রতিদিন বিকেল হলেই জমে ওঠে ডিম ঘোটার আসর। বিকেল পাঁচটা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত চলে বিক্রি। ক্রেতাদের মধ্যে তরুণ-তরুণীর পাশাপাশি রয়েছেন বিভিন্ন বয়সের ভোজনরসিক মানুষ।
সম্প্রতি সন্ধ্যায় ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ডিমের দোকানগুলো ঘিরে ক্রেতাদের ভিড়। কেউ মুরগির ডিম, কেউ হাঁসের ডিমের অর্ডার দিচ্ছেন। দোকানিরা ব্যস্ত একের পর এক ডিম ঘোটা তৈরিতে। অর্ডার দেওয়ার পর খাবার পেতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।
ডিম ঘোটার বিশেষত্ব এর রান্নার পদ্ধতিতেই। সাধারণ ডিমভাজির মতো ডিমকে পুরোপুরি শক্ত করা হয় না। সরিষার তেলে পেঁয়াজ ও কাঁচামরিচ ভাজার পর ফেটানো ডিম তাওয়ায় দেওয়া হয়। এরপর দ্রুত নেড়ে ডিমকে কিছুটা নরম ও মোলায়েম অবস্থায় নামিয়ে নেওয়া হয়।
এরপর দেওয়া হয় গোলমরিচ, এলাচ, লবঙ্গ, দারুচিনি, জিরা ও ধনাসহ বিভিন্ন মশলার মিশ্রণ। তাওয়ার গরমে মশলার সুবাস ডিমের সঙ্গে মিশে তৈরি করে আলাদা স্বাদ ও ঘ্রাণ।
ডিম ঘোটার সঙ্গে পরিবেশন করা হয় দেশি খিরা ও বিশেষ চাটনি। তেঁতুল, টমেটো, কাসুন্দি, সরিষার তেল, পেঁয়াজ কুচি ও বিভিন্ন মশলা দিয়ে তৈরি ওই চাটনিও খাবারটির স্বাদ বাড়িয়ে দেয়।
২৬ বছর ধরে একই জায়গায়
খুলনায় ডিম ঘোটাকে পরিচিত করে তোলার পেছনে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত নাম শহীদুল ইসলামের। ২০০০ সালে সামান্য পুঁজি নিয়ে তিনি এই ব্যবসা শুরু করেন। তখন তার বয়স ছিল ত্রিশের কোঠায়।
ডিগ্রি পাস করা শহীদুল চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর নতুন করে কী করা যায়, সেই চিন্তা থেকেই ডিমের ব্যবসার পরিকল্পনা করেন। তবে শুরু থেকেই চেয়েছিলেন সাধারণ ডিমভাজার চেয়ে আলাদা কিছু করতে।
শহীদুল বলেন, ডিম ভাজা তো ছোটবেলা থেইকাই খাইছি। কিন্তু তখন মনে হইল, ব্যবসা যখন শুরু করতেছিই, তখন একটু ব্যতিক্রম কিছু করা দরকার।
সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয় তার নিজস্ব পদ্ধতির ডিম ঘোটা। ধীরে ধীরে মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে এর পরিচিতি। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ২৬ বছর।
শহীদুল বলেন, আমার প্রথম যে কাস্টমার ছিলেন, তারা এখনো আসেন। সিটি ল কলেজের সামনের বড় বড় বাড়িগুলোর অনেক মানুষ আজও আমার কাছেই ডিম খেতে আসেন। এত বছর খাইতে খাইতে একটা আত্মীয়তার মতো সম্পর্ক হয়ে গেছে।

ব্যবসা শুরুর সময় এলাকার চেহারাও ছিল ভিন্ন। তার ভাষায়, তখন ওই এলাকায় আর কোনো ডিমের দোকান ছিল না। ফুটপাতেও ছিল না কোনো ফুডকার্ট। পুরো জায়গাটি ফাঁকা থাকত এবং সেখানে গরুর হাট বসত।
তখন একটি ডিমের দাম ছিল ১ টাকা ৭০ পয়সা। বর্তমানে একই ধরনের ডিম কিনতে খরচ করতে হয় ১৫ থেকে ২০ টাকা।
দীর্ঘদিনের ব্যবসায় নিজের কিছু নিয়মও তৈরি করেছেন শহীদুল। তার দাবি, খাবারে কোনো ভেজাল ব্যবহার করেন না এবং উপকরণের সতেজতার বিষয়ে গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, আমার ডিম ভাজায় কোনো ভেজাল নাই, সব ন্যাচারাল।
ডিমের পাশাপাশি সালাদ ও চাটনিতেও আলাদা গুরুত্ব দেন তিনি। সাধারণত ডিমের সঙ্গে শসা দেওয়া হলেও শহীদুল ব্যবহার করেন দেশি খিরা। তার মতে, শসা কেটে কিছুক্ষণ রাখলে পানি ছেড়ে দেয়। কিন্তু দেশি খিরা দীর্ঘ সময় টাটকা ও কড়মড়ে থাকে।
চাটনি সম্পর্কে শহীদুল বলেন, এই চাটনি প্রথমে ঢাকায় দেখছি। সেদ্ধ ডিমের সঙ্গে দেওয়া হইতো। খুলনায় প্রথম আমিই আনছি। খিরা, তেঁতুল, টমেটো সস, কাসুন্দি, সরিষার তেল, পেঁয়াজ কুচি আর কিছু মশলা দিয়ে বানাই।
বর্তমানে তার দোকানে মুরগির ডিমের ঘোটা ৩০ টাকা এবং হাঁসের ডিমের ঘোটা ৩৫ টাকা। গরমের সময় প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০টি ডিম ঘোটা বিক্রি হয়। শীতকালে বিক্রি বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০টিতে।
শহীদুলের হিসাবে, প্রতিদিনের বিক্রি থেকে তার আয় হয় প্রায় ৭ হাজার থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকা।
ডিম ঘোটার দোকানে মূল ব্যস্ততা দেখা যায় বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত। তবে এর প্রস্তুতি শুরু হয় সকালেই। ডিম পরিষ্কার করা, পেঁয়াজ-কাঁচামরিচ কাটা এবং বিশেষ মশলার মিশ্রণ তৈরি সবকিছু আগেই প্রস্তুত করে রাখতে হয়।
শহীদুলের ছেলে সামিউল ইসলাম সরকারি আযম খান কমার্স কলেজে হিসাববিজ্ঞানে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি সন্ধ্যার পর বাবার দোকানে কাজ করেন। ক্রেতাদের অর্ডার নেওয়া ও দোকানের বিভিন্ন কাজে বাবাকে সহযোগিতা করেন তিনি।
নিউ মার্কেট এলাকায় দোকান হওয়ায় শপিং শেষে ফেরার সময় অনেকেই এখানে থামেন। একজন ক্রেতা বলেন, অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি ডিম খাওয়ার জন্য।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই খাবারের দোকানও বেড়েছে। এখন একই এলাকায় আরও কয়েকজন ডিম বিক্রি করেন। কালাম ও ফারুক নামের দুই বিক্রেতা জানান, তাদের দোকানেও প্রতিদিন বিকেল পাঁচটা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ডিম বিক্রি হয়। সিদ্ধ, সাধারণ ভাজি ও ঘোটা ডিম বিভিন্নভাবে ডিম পরিবেশন করা হয়। তবে তাদের বিক্রির বড় অংশই ঘোটা ডিম।
কালাম জানান, প্রতিদিন প্রায় ৩০০টি ডিম বিক্রি করেন তিনি। এর মধ্যে ঘোটা ডিমের সংখ্যাই বেশি।
বায়তুন নূর মসজিদ কমপ্লেক্সের পাশের এই জায়গাটুকু এখন শুধু ডিমের দোকান নয়। সন্ধ্যার পর এটি হয়ে ওঠে ভোজনরসিকদের আড্ডাস্থল। ডিম ঘোটার পাশাপাশি রয়েছে ফাস্টফুড, বিরিয়ানি, কফি ও শরবতের দোকান। খোলা আকাশের নিচে বসে খাবারের স্বাদ নেন ক্রেতারা।
source: Asia Post







