হরমুজের বাইরে নতুন ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ ঘোষণা করবে ইরান

হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে প্রণালির বাইরেও নতুন একটি ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ ঘোষণা করতে যাচ্ছে ইরান। দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মোহসেন রেজায়ি জানিয়েছেন, পারস্য উপসাগরের কিছু অংশ নিয়ে এ নিয়ন্ত্রিত সামুদ্রিক অঞ্চল ঘোষণা করা হবে। সেখানে প্রবেশকারী জাহাজের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে।
বার্তা সংস্থা এপি ও রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ইরানের এ ঘোষণা এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমুদ্রপথে সরাসরি সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার পর। গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র তিনটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) হরমুজ ও এর আশপাশে কয়েকটি জাহাজে পালটা হামলা চালিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর ফলে কৌশলগত এই জলপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আরও কমে গেছে।
রেজায়ির ঘোষণায় বলা হয়েছে, নতুন অঞ্চলটি হরমুজ প্রণালির বাইরে থাকবে এবং ওই এলাকায় যেসব জাহাজ ইরানের অনুমতি বা সমন্বয় ছাড়া প্রবেশ করবে, সেগুলোকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় তোলা হতে পারে। অর্থাৎ হরমুজের জলপথ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এর আশপাশের সামুদ্রিক এলাকাতেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে চাইছে তেহরান।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ১০টি ট্যাংকার চলাচল করছে। যুদ্ধ শুরুর পর মে মাস থেকে এটি সর্বনিম্ন পর্যায়ের বাণিজ্যিক চলাচল। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়েছে। সোমবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯৭ ডলারের ওপরে উঠে যায়। গত সপ্তাহেই ব্রেন্টের দাম প্রায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছিল।
ওমানের সঙ্গে নতুন রুটের উদ্যোগ
তবে ইরানের নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণার পাশাপাশি হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়েও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ চলছে। তেহরান ও ওমান একটি নতুন সামুদ্রিক রুট নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে বলে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। প্রস্তাবিত এই রুটের একটি অংশ ইরানের জলসীমা এবং অন্য অংশ ওমানের জলসীমার মধ্য দিয়ে যাবে। দুই দেশ যৌথভাবে জাহাজের প্রবেশ ও বহির্গমন ব্যবস্থাপনা করবে।
এর আগে ইরান ও ওমান হরমুজে একটি অস্থায়ী যৌথ নেভিগেশন করিডর চালু ও প্রণালিতে মাইন অপসারণের জন্য যৌথ প্রকল্প নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছিল। তবে ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে, প্রণালির পূর্ণাঙ্গ ও স্বাভাবিক চলাচল পুনরুদ্ধারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধের অবসানের মতো বিষয়গুলোও জড়িত।
এ ছাড়া ইরান-ওমানের আলোচনায় সামরিক জাহাজকে হরমুজ দিয়ে চলাচলের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য নির্ধারিত রুট থাকলেও সামরিক জাহাজকে বাইরে রাখার অবস্থান নিয়েছে তেহরান।
হরমুজে চাপ বাড়াচ্ছে তেহরান
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। ফলে এই জলপথে সামান্য বিঘ্নও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের নতুন ‘নিষিদ্ধ অঞ্চল’ ঘোষণার পরিকল্পনা সেই চাপ আরও বাড়াতে পারে। কারণ এতে হরমুজের সরু জলপথের পাশাপাশি এর বাইরের সমুদ্রাঞ্চলেও জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বাড়বে। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানি তেল রপ্তানি ঠেকাতে নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখে এবং ইরান পালটা সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত করে, তাহলে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে বিকল্প রুট বা নির্ধারিত করিডরের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হতে পারে।
আনাদোলু এজেন্সির খবরে বলা হয়েছে, এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধের সামরিক ফ্রন্টের পাশাপাশি হরমুজ এখন ক্রমেই অর্থনৈতিক চাপ ও পালটা চাপের প্রধান অস্ত্র হয়ে উঠছে। একদিকে ওয়াশিংটন নৌবাহিনী দিয়ে ইরানের তেল রপ্তানি আটকে দিতে চাইছে, অন্যদিকে তেহরান হরমুজ ও এর আশপাশের সামুদ্রিক চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়ে সেই চাপের পালটা জবাব দেওয়ার চেষ্টা করছে।
নতুন নিষিদ্ধ অঞ্চল বাস্তবে কতটা বিস্তৃত হবে এবং কোন কোন জাহাজকে এর আওতায় আনা হবে— সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে— হরমুজ সংকট শুধু প্রণালির মুখে সীমাবদ্ধ থাকছে না, পারস্য উপসাগরের বিস্তৃত সমুদ্রাঞ্চলও এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের নতুন চাপের কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।
source: Rajneete







