News

পুতিন-জেলেনস্কির মাঝে ফের ট্রাম্প প্রশাসন, মিলবে কি যুদ্ধবিরতি?

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এবার সরাসরি বৈঠকে বসেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দুই দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার প্রথমে মস্কো গিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছেন, এরপর কিয়েভে গিয়ে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন।

চার বছরের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে এই কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন করে আশার আলো দেখিয়েছে। তবে এখনই যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা কতটা তৈরি হয়েছে— সেটিই বড় প্রশ্ন।

শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) মস্কোর ক্রেমলিনে পুতিনের সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক করেন উইটকফ ও কুশনার। বৈঠকের পর রুশ প্রেসিডেন্টের সহযোগী ইউরি উশাকভ আলোচনাটিকে ‘গঠনমূলক’ ও ‘বিশ্বাসের পরিবেশে’ অনুষ্ঠিত বলে বর্ণনা করেন। তবে বৈঠক থেকে কোনো যুদ্ধবিরতি, শান্তিচুক্তি কিংবা বড় ধরনের সমঝোতার ঘোষণা আসেনি।

এরপর রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) কিয়েভে যান দুই মার্কিন দূত। সেখানে তারা জেলেনস্কি ও তার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনাকে উইটকফ ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ও ‘উৎসাহব্যঞ্জক’ বলে বর্ণনা করেছেন। জেলেনস্কিও বলেছেন, আলোচনার লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি ‘ন্যায্য ও স্থায়ী শান্তি’, যেন ভবিষ্যতে রাশিয়ার পক্ষে আবার ইউক্রেনে হামলার সুযোগ না থাকে।

আরো পড়ুন

মার্কিন এই কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও মস্কো এখনো যুদ্ধের মূল কারণ হিসেবে যে বিষয়গুলো তুলে ধরে আসছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। রাশিয়া ইউক্রেনের দখল করা ভূখণ্ড নিয়ে নিজেদের দাবি, ইউক্রেনের সামরিক ও কৌশলগত অবস্থান এবং দেশটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

পুতিন মার্কিন দূতদের সঙ্গে বৈঠকেও যুদ্ধের ‘মূল কারণ’ সমাধানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে রুশ পক্ষ যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেছে। ফলে মস্কো যে দ্রুত যুদ্ধবিরতিতে যাওয়ার জন্য নিজেদের শর্ত অনেকটা শিথিল করেছে— এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ এখনো নেই।

শনিবার রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ছবি: সংগৃহীত

শনিবার রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে কিয়েভের প্রধান উদ্বেগ যুদ্ধবিরতির পরের সময়কে ঘিরে। জেলেনস্কি স্পষ্ট করে বলেছেন, শুধু যুদ্ধ বন্ধ করলেই হবে না, ইউক্রেনের জন্য শক্তিশালী পশ্চিমা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রয়োজন। অর্থাৎ যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর রাশিয়া আবার হামলা চালালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ কীভাবে ইউক্রেনকে রক্ষা করবে, তার একটি বিশ্বাসযোগ্য কাঠামো চায় কিয়েভ।

এ কারণেই আলোচনায় শুধু রাশিয়া ও ইউক্রেন নয়, ইউরোপীয় দেশগুলোকেও যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। কিয়েভে ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও মার্কিন দূতদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। জেলেনস্কি বলেছেন, পরবর্তী পর্যায়ে ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে আরও আলোচনা হতে পারে।

এদিকে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে একটি সীমিত সামরিক বিরতিও দেখা গেছে। মার্কিন দূতদের সফর ঘিরে মস্কো ও কিয়েভে হামলা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পুতিন কিয়েভে তিন দিনের জন্য হামলা স্থগিতের নির্দেশ দেন। এর জবাবে জেলেনস্কিও মস্কোর বিরুদ্ধে হামলা না চালানোর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছেন।

তবে এটি কোনো সর্বাত্মক যুদ্ধবিরতি নয়। ইউক্রেনের অন্যান্য অঞ্চলে রুশ হামলা ও রাশিয়ার অভ্যন্তরে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে রাশিয়া বিপুলসংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইউক্রেনের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে ইউক্রেনও রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো ও সামরিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

রোববার বৈঠকের পর গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ছবি: সংগৃহীত

রোববার বৈঠকের পর গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ছবি: সংগৃহীত

সামনে কী?

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— ওয়াশিংটন আবারও দুপক্ষের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের সেতু হিসেবে কাজ করছে। উইটকফ ও কুশনার পুতিনের বক্তব্য কিয়েভে এবং জেলেনস্কির অবস্থান ওয়াশিংটন ও মস্কোর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ভূমিকা নিচ্ছেন। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আরও ঘোষণা আসতে পারে। কুশনার ভবিষ্যতে রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় ফেরার আশার কথাও বলেছেন।

তবে এবারও মূল বাধা দুটি— ভূখণ্ড ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। রাশিয়া যদি দখল করা ভূখণ্ড নিয়ে বড় ছাড় দিতে না চায় এবং ইউক্রেন যদি পশ্চিমা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো সমঝোতায় রাজি না হয়, তাহলে কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও যুদ্ধবিরতি কঠিন হয়ে থাকবে।

তাই মস্কো ও কিয়েভে মার্কিন দূতদের ধারাবাহিক বৈঠককে যুদ্ধ শেষের ঘোষণা নয়, বরং আলোচনার টেবিলে ফেরার একটি নতুন প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। চার বছরের বেশি সময়ের যুদ্ধের পর এই উদ্যোগ কতটা এগোয়, তা নির্ভর করবে পুতিন ও জেলেনস্কির অবস্থানের মধ্যে ওয়াশিংটন কতটা বাস্তবসম্মত সমঝোতা তৈরি করতে পারে তার ওপর।

এই মুহূর্তে তাই সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত উত্তর— রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে যুদ্ধবিরতির দরজা আবার খুলেছে, কিন্তু দরজার ওপারে পৌঁছানোর পথ এখনো অনেকটাই বন্ধুর।

সূত্র: রয়টার্স, এপি, গার্ডিয়ান, আল-জাজিরা

source: Rajneete

Back to top button