News

ইরান যুদ্ধ ঘিরে ফের উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য, বেসামরিক প্রাণহানিতে বাড়ছে উদ্বেগ

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে হামলা-পালটা হামলা শুরু হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আবারও বেড়েছে। একই সঙ্গে ইরানে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। সর্বশেষ মার্কিন হামলায় দেশটিতে ১৮ জন নিহত ও ১০৮ জন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে ইরান।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) রয়টার্সের খবরে বলা হয়, মঙ্গলবার রাতে ইরানজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো হামলায় এই হতাহতের ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির উপকূলের কাছে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে চারজন নিহত ও ৬৭ জন আহত হয়েছেন।

নতুন দফার পালটাপালটি হামলা ঘিরে পুরো অঞ্চলের দেশগুলোতেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান বাহরাইন, জর্ডান, কুয়েত ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ বলে দাবি করা লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কুয়েতের সেনাবাহিনী বৃহস্পতিবার ভোরে আরও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কথা জানিয়েছে। তাদের দাবি, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে এসব হামলা প্রতিহত করা হয়েছে।

হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় এলাকা সিরিকের কাছে বিয়ের অনুষ্ঠানের পাশে হামলায় আহত একটি শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ইরানের হরমোজগান প্রদেশ, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ছবি: সংগৃহীত

হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় এলাকা সিরিকের কাছে বিয়ের অনুষ্ঠানের পাশে হামলায় আহত একটি শিশু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ইরানের হরমোজগান প্রদেশ, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ছবি: সংগৃহীত

জুলাইয়ে আগের দফার পালটাপালটি হামলার পর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গোলাগুলি বন্ধ ছিল। তবে এর মধ্যে শান্তি আলোচনা আর এগোয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরও সামরিক শক্তি প্রয়োগের হুমকি দিয়েছেন। তবে খোদ যুক্তরাষ্ট্রই জনপ্রিয় নয় এই যুদ্ধ। এর প্রভাবে পেট্রোলের দামও বেড়েছে।

নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুদ্ধ যাতে আরও ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য ট্রাম্পের শীর্ষ সহযোগীরা চাপ দিচ্ছেন। তাদের লক্ষ্য, রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য নির্বাচনি ক্ষতি ঠেকানো। এ বিষয়ে আলোচনার সঙ্গে পরিচিত চারজন ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ৩ নভেম্বর ভোটের পর সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার বিষয়টি হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা বিবেচনা করবেন।

হামলায় আহত এক ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ছবি: সংগৃহীত

হামলায় আহত এক ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে ইরানও তার অবস্থানে অনড় রয়েছে। দেশটি সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লেও অবস্থান থেকে সরে আসেনি।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইরানে বেসামরিক মানুষের হতাহতের খবরে ‘গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’ বলে জানিয়েছেন। বিশেষ করে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার খবর তাকে উদ্বিগ্ন করেছে। তার মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক এ কথা জানান। তিনি সামরিক অভিযান অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।

দুজারিক বলেন, ‘মহাসচিব বেসামরিক মানুষের ওপর সব ধরনের হামলার নিন্দা করেন। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। এর মধ্যে হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে পার্থক্য করা, আনুপাতিকতা বজায় রাখা এবং সতর্কতা অবলম্বনের নীতিও রয়েছে।’

হামলার পর ইরানের সিরিকের কুহিস্তিক এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ। ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ছবি: সংগৃহীত

হামলার পর ইরানের সিরিকের কুহিস্তিক এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘরের চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ। ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬। ছবি: সংগৃহীত

ইরানে এসব হামলায় নিহতের সংখ্যা ৭ এপ্রিল পর্যন্ত নথিভুক্ত ৩ হাজার ৬৩৬ জনের সঙ্গে যোগ হবে। মানবাধিকারকর্মীদের স্বাধীন ইরানি সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, ওই নিহতদের মধ্যে ১ হাজার ৭০১ জন বেসামরিক নাগরিক।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তাদের ১৮ জন সামরিক সদস্য নিহত এবং ৭৫০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র মার্কিন নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স এক ই-মেইলে বলেন, ‘ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম থেকে পাওয়া প্রতিবেদন সম্পর্কে আমরা অবগত। ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) মতো মার্কিন সামরিক বাহিনী কখনো বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় না।’

ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি প্রকাশিত একটি ভিডিওতে একটি ভবনের পাশে মাটিতে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। ভবনটির ছাদে ছিল বড় একটি গর্ত। প্রকাশিত স্থিরচিত্রে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে কয়েকজন মানুষকে দেখা যায়। তাদের কয়েকজনের গায়ে রেড ক্রিসেন্টের পোশাক ছিল। সেখানে মাটিতে পড়ে থাকা একটি বিদ্যুৎ বা ইউটিলিটি টাওয়ারও দেখা গেছে।

স্যাটেলাইট ছবি ব্যবহার করে রয়টার্স ঘটনাস্থলের অবস্থান যাচাই করেছে। এতে দেখা গেছে, পড়ে যাওয়া টাওয়ারটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন থেকে ১৩৬ মিটার বা ১৪৯ গজ দূরে ছিল।

বিয়ের অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনাটি যুদ্ধের প্রথম দিনে মিনাবে একটি স্কুলে বিস্ফোরণের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। ওই হামলায় একটি মেয়েদের স্কুলে ১৬০ জন নিহত হয়েছিলেন।

মিনাবের ওই হামলা নিয়ে পেন্টাগন এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল প্রকাশ করেনি। সেটি সত্যি হলে কয়েক দশকের মধ্যে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির দিক থেকে এটি মার্কিন সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে বড় ঘটনা হতে পারে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, পুরোনো লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণের তথ্য ব্যবহারের কারণে ওই হামলা হয়ে থাকতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাট সদস্যরা ওই ঘটনার তদন্তের ফল প্রকাশের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তবে প্রতিবেদনটি এখনো আইনপ্রণেতাদের কাছে পাঠানো হয়নি।

ইরান যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থকরা দেশটির বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনাগুলোর কথাও তুলে ধরছেন। তাদের বক্তব্য, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে ইরানে ছড়িয়ে পড়া রাজপথের বিক্ষোভ দমনের সময় ইরানি সরকারের অভিযানে এসব প্রাণহানি ঘটে। এইচআরএএনএ জানিয়েছে, ওই সময়ের বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা ৭ হাজারের বেশি। তবে ইরানের নির্বাসিত বিরোধী গোষ্ঠীগুলো দাবি করেছে, প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

ইরানের সরকার উৎখাতের জন্য দেশটির জনগণকে উৎসাহিত করা যুদ্ধের অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেছেন ট্রাম্প। এর পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা এবং হামাস, হিজবুল্লাহ ও হুতিদের মতো বিদেশে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ইরানের সমর্থন বন্ধ করাও যুদ্ধের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাব হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী ট্যাংকারগুলোকে ইরানের অনুমতি ছাড়া চলাচল করলে হামলার হুমকি দিয়েছে। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে গেছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।

source: Rajneete

আরো দেখুন
Close
Back to top button