নিউইয়র্কে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ আলোচনা, চুক্তির পথে অগ্রগতির আশা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অবসান এবং ইরানের ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে কিছুটা অগ্রগতির আশা তৈরি হয়েছে। আজ বুধবার কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা হয়েছে। তবে নিজেদের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, তা এখনো স্পষ্ট করেনি কোনো পক্ষ।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের মধ্যে যোগাযোগ হয়। জুলাইয়ে একটি অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর এটিই দুই পক্ষের মধ্যে এ ধরনের প্রথম যোগাযোগ।
আলচনার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘স্টিভ ও জ্যারেড আজ ইরানের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে খুবই ফলপ্রসূ বৈঠক করেছে, শুধু মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে। দেখা যাক কী হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা কিছুদিন ধরে মধ্যস্থতার মাধ্যমে আলোচনা করছে। তবে আমার মনে হয়, তাদের মধ্যে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য অনেক গতি তৈরি হয়েছে। সবাই আমাদের এমনটাই বলছে।’
এর আগে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি করবেন, নাকি দেশটিকে ‘ধ্বংস’ করবেন— সে সিদ্ধান্ত তাকে নিতে হবে। এদিকে বুধবার সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, নিউইয়র্কে কাতারের একজন মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তেহরানের যোগাযোগ হয়েছে। আলোচনায় ইরান কিছু শর্ত জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সব ফ্রন্টে যুদ্ধের অবসান এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসনমূলক কর্মকাণ্ড’ বন্ধ করা। তেহরান আরও বলেছে, মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়া এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়টিও আলোচনার অংশ হতে হবে।
এর আগে ইরানের কয়েকটি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছিল, আরাগচি ও উইটকফের মধ্যে সরাসরি বৈঠক হয়েছে। তবে ইরানের কর্মকর্তারা রয়টার্সকে নিশ্চিত করেছেন, তাদের মধ্যে মুখোমুখি বৈঠক হয়নি। মার্কিন দূত উইটকফও বলেছেন, মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষের প্রতিনিধিদের মধ্যে যাতায়াত করে আলোচনা চালিয়েছেন। আরাগচি কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান আল থানির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আগের আলোচনাগুলোতেও তিনি অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী ছিলেন।
দুই সপ্তাহের সর্বনিম্ন দামে তেলের বাজার স্থির
কূটনৈতিক যোগাযোগের উদ্যোগের মধ্যে তেলের দাম দুই সপ্তাহের সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি রয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের সামান্য নিচে রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় বাজারে চাপ কমেছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ অভিযানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা ইরান যুদ্ধ প্রায় সাত মাস ধরে চলছে। এতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে এবং সংঘাতটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রথমে লেবানন এবং সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেনও এতে জড়িয়ে পড়েছে।
ট্রাম্প আগের বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে বলেছেন, নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময়ের কাছাকাছি যুদ্ধটি শেষ হতে পারে। তবে কেন তিনি এমনটা মনে করছেন, তা ব্যাখ্যা করেননি। এর আগে তিনি বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতা হতে পারে নির্বাচনের পর।
জুলাইয়ে কূটনৈতিক আলোচনা ভেঙে যাওয়ার পর থেকে দুই পক্ষ বারবার পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছে। তবে সামরিক কমান্ডারদের কাছ থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত কমে আসার পরামর্শ পাওয়ার পর ট্রাম্প বড় আকারে আবারও হামলা শুরুর সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রয়েছেন।
জুনে হওয়া এবং ট্রাম্প ও পেজেশকিয়ানের স্বাক্ষর করা একটি অন্তর্বর্তী চুক্তিতে ইরানের প্রধান দাবিগুলো পূরণের কথা ছিল। এর মধ্যে ছিল আর্থিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং জব্দ করা সম্পদ অবমুক্ত করা। এর বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা ছিল।
তবে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই চুক্তি ভেঙে পড়ে। এর পেছনে ছিল হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিয়ম নিয়ে বিরোধ। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। ইরান এই প্রণালির ওপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে এবং এটি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে ফি আদায় করতে চায়। ওয়াশিংটন এতে রাজি নয়।
প্রায় প্রতিদিনই তেলবাহী জাহাজে হামলা হলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ধীরে ধীরে বেড়েছে। তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো জাহাজ চলাচলকারী কোম্পানিগুলোকে একটি চালানের মূল্যের সর্বোচ্চ এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত ফি দিয়েছে। এর বিনিময়ে এসব কোম্পানি জাহাজের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে প্রণালিটি পার করছে এবং প্রণালির বাইরে অন্য জাহাজে অপরিশোধিত তেল স্থানান্তর করছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল রপ্তানি ইতিমধ্যে যুদ্ধ শুরুর আগের পর্যায়ে ফিরে এসেছে। আর সৌদি আরব চলতি মাস ও আগামী মাসের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রায় ৬ কোটি ব্যারেল তেল বিক্রি করেছে। এসব তেল হরমুজ প্রণালির বাইরে ওমানের উপকূলের কাছে সরবরাহ করা হবে। আগস্টের তুলনায় এটি বড় ধরনের বৃদ্ধি।
তবুও সরবরাহে বিঘ্ন বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ অব্যাহত রেখেছে। ধারণা করা হচ্ছে, উপসাগরীয় অঞ্চলের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছাচ্ছে না। বিশেষ করে ডিজেলের মতো পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, সুদের হার ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে এবং নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি চাপের মুখে পড়ছে।
চলতি মাসে ইরান-সমর্থিত হুতিরা ইয়েমেনে অগ্রসর হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে আরও বিঘ্নের ঝুঁকি বেড়েছে। এর ফলে লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশমুখে বাব এল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়েছে। সৌদি আরবের জন্য এটি একটি বিকল্প রপ্তানি পথ।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করেছে, যার ফলে দেশটির অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। ইরানের কর্মকর্তারা বলছেন, নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা এই অবরোধ মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। অবরোধ তুলে না নেওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া হবে না বলেও জানিয়েছেন তারা।
source: Rajneete






