২ রাজ্য নির্বাচনে বড় ধাক্কা, তবু পদ ছাড়ছেন না মের্ৎস

জার্মানির দুটি রাজ্যের নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের দল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ)। ওই রাজ্যের মধ্যে একটিতে উগ্র ডানপন্থি দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে, অন্যটিতে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে বামপন্থি ডি লিংকে। মের্ৎসের সিডিইউ মেকলেনবুর্গ-ভোরপোমার্নে ৫ শতাংশের নির্বাচনি বাধা পার হতে না পারায় রাজ্য পার্লামেন্টে আসন পাওয়ার সুযোগও হারিয়েছে।
গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, রোববার অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রাথমিক ফল অনুযায়ী, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মেকলেনবুর্গ-ভোরপোমার্নে এএফডি পেয়েছে প্রায় ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ ভোট। ক্ষমতাসীন সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এসপিডি) পেয়েছে ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ। আর সিডিইউ পেয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৯ শতাংশ ভোট, যা দলটির ইতিহাসে কোনো রাজ্য নির্বাচনে সবচেয়ে খারাপ ফল।
জার্মানির নির্বাচনি ব্যবস্থায় সাধারণত ৫ শতাংশ ভোট না পেলে কোনো দল রাজ্য সংসদে আসন পায় না। ফলে মেকলেনবুর্গ-ভোরপোমার্নে চূড়ান্ত ফলেও সিডিইউ ৫ শতাংশের নিচে থাকলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো কোনো রাজ্য পার্লামেন্টে দলটির প্রতিনিধিত্ব থাকবে না। মের্ৎস নিজেই ফলটিকে ‘বিপর্যয়’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
অন্যদিকে রাজধানী বার্লিনে সর্বোচ্চ ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে ডি লিংকে। সিডিইউ পেয়েছে ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট। এ ছাড়া এএফডি ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ, গ্রিনস ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ ও এসপিডি ১২ দশমিক ১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। ফলে বার্লিনের আগের সিডিইউ-এসপিডি জোটও সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। এখন ডি লিংকেকে সরকার গঠনের জন্য অন্য দলের সঙ্গে জোট করতে হবে।
পূর্ব জার্মানিতে এএফডির উত্থান
মেকলেনবুর্গ-ভোরপোমার্নের ফলটি মের্ৎসের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সাবেক পূর্ব-জার্মানির এই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে এসপিডি শক্তিশালী হলেও এবার এএফডি প্রথমবারের মতো সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে। দুই সপ্তাহ আগে আরেক পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টেও ৪৪ শতাংশ ভোট পেয়ে সিডিইউকে বড় ব্যবধানে হারিয়েছিল দলটি।
মেকলেনবুর্গ-ভোরপোমার্নে এএফডি সবচেয়ে বেশি ভোট পেলেও সরকার গঠনের পথ সহজ নয়। রাজ্যের অন্য প্রধান দলগুলো দলটির সঙ্গে জোট বা সহযোগিতা না করার অবস্থান ধরে রেখেছে। ফলে সবচেয়ে বেশি ভোট পাওয়া দল হয়েও এএফডি সরকারে যেতে পারবে কি না, তা নির্ভর করছে পরবর্তী জোট আলোচনার ওপর।
এই ফলকে জাতীয় রাজনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। এএফডি বর্তমানে জার্মান পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় বিরোধী শক্তি। দলটি অভিবাসন কঠোর করা, অনিয়মিত অভিবাসীদের ব্যাপকভাবে ফেরত পাঠানো, ইউক্রেনকে জার্মানির সহায়তা বন্ধ করা এবং ইউরো ত্যাগের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ২০২৯ সালের পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজ্য পর্যায়ের এই ফলগুলো দলটির জাতীয় রাজনৈতিক শক্তি নিয়ে আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে।
মের্ৎসের নেতৃত্ব নিয়ে চাপ
মের্ৎস ২০২৫ সালের মে মাসে এসপিডির সঙ্গে জোট সরকার গঠন করে চ্যান্সেলরের দায়িত্ব নেন। তার প্রধান প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল দীর্ঘদিনের দুর্বল অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং এএফডির জনসমর্থন কমানো। কিন্তু শিল্প খাতে সংকোচন, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উচ্চ জ্বালানি ব্যয় এবং অভিবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ তার সরকারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে।
বিশেষ করে তার সরকারের পেনশন সংস্কার নিয়ে এসপিডির মধ্যেও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। মেকলেনবুর্গ-ভোরপোমার্নের এসপিডি মুখ্যমন্ত্রী মানুয়েলা শভেসিগও নির্বাচনি প্রচারে মের্ৎসের জোট সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পেনশন পরিবর্তন প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন। ফলে রাজ্য নির্বাচনের ফল শুধু ভোটের হিসাব নয়, মের্জের জোট সরকারের অভ্যন্তরীণ চাপেরও প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মের্ৎস অবশ্য পদ ছাড়ার সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। নির্বাচনের পর সিডিইউ নেতৃত্বের বৈঠকে তিনি বলেন, তিনি চ্যান্সেলর ও দলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাবেন এবং কর, স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর মতো সংস্কার এগিয়ে নেবেন। তার ভাষায়, জার্মান অর্থনীতি ‘গভীর পরিবর্তনের’ মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এ অবস্থায় সংস্কারের প্রয়োজন আরও বেড়েছে।
এএফডি নেতা টিনো ক্রুপালা অবশ্য ফলের পর মের্ৎসের পদত্যাগ দাবি করেছেন। তবে মের্ৎসকে সরিয়ে নতুন চ্যান্সেলর বসানো জার্মানির সাংবিধানিক ব্যবস্থায় সহজ নয়, বিকল্প প্রার্থীকে বুন্ডেসট্যাগে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে।
মের্ৎসের জন্য ফলটির আরেকটি প্রতীকী দিকও আছে। মেকলেনবুর্গ-ভোরপোমার্ন ছিল তার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মের্কেলের নির্বাচনি এলাকা। ১৬ বছর জার্মানি শাসন করা মের্কেলের সিডিইউ সেখানে একসময় শক্তিশালী ছিল। মের্ৎস দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১৬ মাসের মধ্যে সেই রাজ্যেই দলটির ভোট ৫ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ায় সিডিইউয়ের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে বার্লিনে ডি লিংকের জয় দেখিয়েছে, মের্ৎসের সিডিইউয়ের ওপর চাপ শুধু ডান দিক থেকেই আসছে না। ফলে দুই রাজ্যের নির্বাচন জার্মান রাজনীতিতে একই সঙ্গে এএফডির উত্থান, সিডিইউয়ের সংকট ও বামপন্থিদের পুনরুত্থান— তিনটি প্রবণতাকেই সামনে এনেছে।
source: Rajneete







