দেশে কোনো জল্লাদ-কসাই বাহিনী থাকতে পারে না: শহীদুল্লাহ ফরায়জী

রক্তের সাগরে ভাসমান এ প্রজাতন্ত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকবে, প্রতিরক্ষা বাহিনী থাকবে, গোয়েন্দা সংস্থা থাকবে। কিন্তু কোনো জল্লাদ, ঘাতক বা কসাই বাহিনী থাকতে পারে না। এমন মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শহীদুল্লাহ ফরায়জী।
তিনি বলেছেন, “এখানে ‘কসাই বাহিনী’ বলতে কোনো বাহিনীর প্রতিটি সদস্যকে বোঝানো হচ্ছে না; বোঝানো হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এমন এক অবক্ষয়িত ও অমানবিক রূপকে। যেখানে আইন তার নৈতিক ভিত্তি হারায়, ক্ষমতা জবাবদিহির ঊর্ধ্বে উঠে যায় এবং নাগরিকের জীবন ও স্বাধীনতার ওপর সহিংসতা প্রয়োগ স্বাভাবিক পদ্ধতিতে পরিণত হয়। নিরাপত্তা-ক্ষমতা যখন নাগরিকের আতঙ্কের উৎসে পরিণত হয়, তখনই তা ‘কসাই বাহিনী’-তে রূপ নেয়।”
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীতে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) ও বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের যৌথ উদ্যোগে ‘র্যাব থেকে এসআরবি : কসাই বাহিনীর পুনর্বিন্যাস, গুম-খুনের নতুন বন্দোবস্ত’ শীর্ষক এক বিশেষ আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে তিনি এসব কথা বলেন।
সভায় সভাপতিত্ব করেন জেএসডির সিনিয়র সহসভাপতি মিসেস তানিয়া রব। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক শহীদুল্লাহ ফরায়জী।
এ ছাড়া বিশেষ আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম, ডা. হেলালুজ্জামান, জেএসডি স্থায়ী কমিটির সদস্য মোহাম্মদ তৌহিদ হোসেন, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সহসভাপতি হাবিবুর রহমান রাজা, নির্বাহী কমিটির সদস্য শেখ নাসির প্রমুখ।
সভা থেকে যৌথভাবে ৭ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়।
১. র্যাবের ক্ষমতা, জনবল, কর্তৃত্ব, সম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার এসআরবি (স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন) নামে পুনঃপ্রতিষ্ঠা বন্ধ করতে হবে। একই ক্ষমতা ও বলপ্রয়োগের সংস্কৃতি এসআরবির মাধ্যমে বহাল রাখা যাবে না।
২. এসআরবির নামে জবাবদিহিহীন বিশেষ বাহিনী গঠন করা যাবে না। প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত আইনশৃঙ্খলা সক্ষমতা পুলিশের বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই গড়ে তুলতে হবে।
৩. প্রতিরক্ষা বাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে বিতর্কিত বিশেষ বাহিনীর কাঠামোতে ব্যবহার বন্ধ করতে হবে।
৪. গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন ও বেআইনি আটকের প্রতিটি অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
৫. ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬’ সংশোধন করে গুমের অভিযোগের স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের হাতে দিতে হবে।
৬. প্রতিটি গ্রেপ্তার, আটক ও জিজ্ঞাসাবাদ সম্পূর্ণভাবে নথিবদ্ধ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। কোনো নাগরিককে গোপন স্থানে আটক রাখা বা আইনের বাইরে জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ রাখা যাবে না।
৭. সব আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ওপর কার্যকর বিচারিক, সংসদীয় ও বেসামরিক নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। কোনো বাহিনী বা প্রতিষ্ঠান যেন আইনের ঊর্ধ্বে না থাকে।
প্রধান আলোচকের বক্তব্যে রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ূম বলেন, ‘সেনাবাহিনীর কোনো সদস্যের অন্য কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অধীনে কাজ করার কথা নয়। ক্ষমতা কাঠামোর কারণে এসব বাহিনী ক্রমাগত ভয়ংকর হয়ে ওঠে। অভ্যুত্থানের পর জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে উপেক্ষা করে নতুন করে জিজ্ঞাসাবাদের নামে বন্দিশালা স্থাপন করা হচ্ছে। সরকার প্রতিনিয়ত জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে; আমাদের লড়াইয়ের আসল শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করতে হবে।’
জেএসডির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন বলেন, ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কারণে র্যাব আন্তর্জাতিকভাবে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত। অথচ সেই বাহিনীকে এখন এসআরবি নামে পুনর্গঠন করা হচ্ছে। বিদ্যমান বাস্তবতায় সরকার নতুন করে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য এই নতুন বাহিনী তৈরি করছে। রাষ্ট্রীয় সব নিপীড়নমূলক বাহিনীর বিলোপ ঘটিয়ে ক্ষমতার মূল কাঠামোর পরিবর্তন আনতে হবে।’
সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, ‘সেনাবাহিনীর সদস্যদের পুলিশের কর্মকাণ্ডে সংযুক্ত করা হলে তা রাষ্ট্রে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। র্যাবের চেয়ে এসআরবিকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরও বেশি শক্তিশালী করা হয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন করে এমন কোনো আইন প্রণয়ন করা যাবে না।’
সভাপতির বক্তব্যে মিসেস তানিয়া রব বলেন, ‘রাষ্ট্রের নিয়মিত বাহিনী থাকার পরও যখন বিশেষ বাহিনী গঠন করা হয়। তখনই তার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ভয়ের সংস্কৃতি উপেক্ষা করে গণতন্ত্র ও অধিকার প্রতিষ্ঠার নতুন লড়াই শুরু করতে হবে।’
source: Asia Post







