News

গোসলের সময় সবার আগে শরীরের যে স্থানে পানি ঢালবেন

গোসলের সময় শরীরের কোন অংশে আগে পানি ঢালছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে গরমের দিনে শরীর ঘেমে গেলে অনেকে হঠাৎ ঠান্ডা পানিতে গোসল শুরু করেন। তবে শরীরের তাপমাত্রা ও আরামের কথা বিবেচনা করে গোসলের শুরুতে পানির ব্যবহার নিয়ে কিছু সহজ নিয়ম মেনে চলা ভালো।

একই সঙ্গে খুব গরম পানি, দীর্ঘ সময় ধরে গোসল করা, শরীর জোরে ঘষা বা অতিরিক্ত সাবান ব্যবহার করলে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা নষ্ট হয়ে শুষ্কতা ও চুলকানি দেখা দিতে পারে। তাই শুধু শরীর পরিষ্কার করাই নয়, গোসলের সঠিক পদ্ধতি জানা ত্বক ও শরীরের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, গোসলের শুরুতে শরীরের কোন অংশে পানি ঢালা ভালো এবং কীভাবে গোসল করলে ত্বক সুস্থ রাখা যায়, তা জানা দরকার। তবে, তার আগে চলুন জেনে নিই আরও কিছু জরুরি তথ্য।

গোসলের পানির তাপমাত্রা কেমন হওয়া উচিত?

অনেকে গরম পানিতে গোসল করতে বেশ স্বস্তি বোধ করেন। বিশেষ করে শীতের সকালে গরম পানির গোসল আরামদায়ক লাগতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত গরম পানি ত্বকের জন্য ভালো নয়।

আরো পড়ুন

চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, গোসলের পানি কুসুম গরম বা সামান্য উষ্ণ রাখা। খুব গরম পানি ত্বকের স্বাভাবিক তেল কমিয়ে দিতে পারে। ফলে গোসলের পর ত্বক টানটান, শুষ্ক ও চুলকানিযুক্ত লাগতে পারে।

পানি এতটাই গরম হওয়া উচিত নয় যে ত্বকে অস্বস্তি বা জ্বালাপোড়া শুরু হয়।

কতক্ষণ গোসল করা ভালো?

গোসলের সময় দীর্ঘ করার কোনো প্রয়োজন নেই। সাধারণভাবে ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে গোসল শেষ করা ত্বকের জন্য ভালো। বিশেষ করে যাদের ত্বক শুষ্ক বা সংবেদনশীল, তাদের জন্য দীর্ঘ সময় পানিতে থাকা সমস্যা বাড়াতে পারে।

অনেকক্ষণ পানির নিচে দাঁড়িয়ে থাকা আরামদায়ক মনে হলেও এতে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে যেতে পারে।

তাই গোসলকে দীর্ঘ সময়ের আরামের অভ্যাস না বানিয়ে প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্নতার কাজগুলো দ্রুত শেষ করাই ভালো।

গোসলের সময় প্রথমে কী করবেন?

গোসল শুরু করার সময় প্রথমে কুসুম গরম পানিতে শরীর ভিজিয়ে নিন। এরপর সাবান বা শরীর পরিষ্কারের উপযোগী মৃদু পরিষ্কারক ব্যবহার করতে পারেন।

ঘাড়, বগল, কুঁচকি, পা এবং শরীরের যেসব জায়গায় ঘাম ও ময়লা বেশি জমে, সেগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করা জরুরি।

তবে শরীরের প্রতিটি অংশে প্রচুর সাবান মাখিয়ে ঘষার প্রয়োজন নেই। অতিরিক্ত সাবান ত্বকের স্বাভাবিক তেল কমিয়ে দিতে পারে।

শরীর জোরে ঘষবেন না

অনেকে মনে করেন, ত্বক যত বেশি ঘষা হবে, তত ভালোভাবে পরিষ্কার হবে। এই ধারণা ঠিক নয়।

জোরে ঘষাঘষি করলে ত্বকে জ্বালা, শুষ্কতা ও ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে সংবেদনশীল ত্বক বা ত্বকের রোগ থাকলে অতিরিক্ত ঘষাঘষি সমস্যা বাড়াতে পারে।

তাই সাবান লাগানোর সময় হাত বা নরম কাপড় দিয়ে আলতোভাবে পরিষ্কার করাই যথেষ্ট।

প্রতিদিন কি পুরো শরীরে সাবান লাগাতে হবে?

সব সময় নয়।

প্রতিদিন গোসল করলেও শরীরের প্রতিটি অংশে সাবান ব্যবহার করা জরুরি নয়। বিশেষ করে শুষ্ক বা সংবেদনশীল ত্বকের মানুষের ক্ষেত্রে মুখ, বগল ও কুঁচকির মতো জায়গায় পরিষ্কারক ব্যবহার করাই অনেক সময় যথেষ্ট হতে পারে।

অবশ্য খুব বেশি ঘাম হলে, শরীরে ময়লা লাগলে বা ব্যায়াম করার পর প্রয়োজন অনুযায়ী শরীরের অন্যান্য অংশও পরিষ্কার করতে হবে।

চুল প্রতিদিন ধুতে হবে?

না, প্রতিবার গোসলের সময় চুলে শ্যাম্পু করা জরুরি নয়।

চুল কত ঘন ঘন ধুতে হবে, তা চুলের ধরন, মাথার ত্বকে তেল জমার পরিমাণ এবং জীবনযাপনের ওপর নির্ভর করে। কারও মাথার ত্বক বেশি তৈলাক্ত হলে ঘন ঘন চুল ধোয়ার প্রয়োজন হতে পারে। আবার শুষ্ক চুলের ক্ষেত্রে প্রতিদিন শ্যাম্পু করার প্রয়োজন নাও হতে পারে।

শ্যাম্পু ব্যবহার করলে মূলত মাথার ত্বক ও চুলের গোড়ায় বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত। এরপর ভালোভাবে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

চুলে কন্ডিশনার কীভাবে ব্যবহার করবেন?

চুল ধোয়ার পর কন্ডিশনার ব্যবহার করলে চুল নরম রাখতে সাহায্য করতে পারে। এটি সাধারণত চুলের মাঝামাঝি অংশ থেকে ডগার দিকে লাগানো ভালো।

মাথার ত্বকে অতিরিক্ত কন্ডিশনার লাগানোর প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে যাদের চুল দ্রুত তেলতেলে হয়ে যায়, তাদের ক্ষেত্রে এটি চুল ভারী বা চিটচিটে করে দিতে পারে।

মুখের জন্য আলাদা পরিষ্কারক ব্যবহার করুন

শরীরের সাবান দিয়ে মুখ পরিষ্কার করা ঠিক নয়, বিশেষ করে ত্বক যদি সংবেদনশীল হয়।

মুখের ত্বক তুলনামূলক কোমল। তাই অ্যালকোহলমুক্ত ও মৃদু পরিষ্কারক ব্যবহার করা ভালো। মুখ ধোয়ার সময় জোরে ঘষাঘষি না করে আঙুলের ডগা দিয়ে আলতোভাবে পরিষ্কার করতে বলা হয়।

মুখ ধোয়ার পর নরম তোয়ালে দিয়ে আলতোভাবে পানি মুছে নিন।

গোসলের পর ত্বক মুছবেন কীভাবে?

গোসলের পর অনেকেই তোয়ালে দিয়ে শরীর জোরে ঘষে পানি শুকান। এটিও ত্বকের জন্য ভালো অভ্যাস নয়।

তোয়ালে দিয়ে শরীর আলতোভাবে চাপ দিয়ে পানি শুষে নেওয়া ভালো। বিশেষ করে শুষ্ক বা সংবেদনশীল ত্বক হলে ঘষাঘষি করলে জ্বালা ও শুষ্কতা বাড়তে পারে।

গোসলের পর ময়েশ্চারাইজার লাগানো কেন জরুরি?

গোসলের পর ত্বক পরিষ্কার হলেও কিছুটা আর্দ্রতা হারাতে পারে। তাই শরীর মুছে নেওয়ার পর ত্বক পুরোপুরি শুকিয়ে যাওয়ার আগেই ময়েশ্চারাইজার লাগানো ভালো।

বিশেষ করে যাদের ত্বক শুষ্ক, তাদের ক্ষেত্রে গোসলের পরপরই ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করলে ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।

মৃদু ও সুগন্ধিবিহীন ময়েশ্চারাইজার সংবেদনশীল ত্বকের জন্য তুলনামূলক ভালো পছন্দ হতে পারে।

দিনে দুবার গোসল করা কি খারাপ?

সব মানুষের জন্য একই নিয়ম নেই।

গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় বেশি ঘাম হলে, ব্যায়াম করলে বা বাইরে অনেক সময় কাটালে দিনে একাধিকবার গোসলের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু যাদের তেমন ঘাম হয় না, তাদের জন্য দিনে দুবার গোসল করা সব সময় প্রয়োজনীয় নয়। অতিরিক্ত গোসল, বিশেষ করে গরম পানি ও শক্তিশালী পরিষ্কারক ব্যবহার করলে ত্বক শুষ্ক হয়ে যেতে পারে।

বাংলাদেশের মতো গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় ঘামের পর শরীর ধুয়ে নেওয়া স্বাভাবিকভাবেই প্রয়োজন হতে পারে। তবে প্রতিবার দীর্ঘ সময় ধরে সাবান দিয়ে শরীর ঘষে পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই।

গোসলের সময় যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন

ত্বক ভালো রাখতে কয়েকটি সাধারণ ভুল থেকে দূরে থাকা দরকার।

  • খুব গরম পানি ব্যবহার করবেন না। এতে ত্বক শুষ্ক হতে পারে।
  • অনেকক্ষণ গোসল করবেন না। পাঁচ থেকে দশ মিনিট যথেষ্ট হতে পারে।
  • শরীর জোরে ঘষবেন না। অতিরিক্ত ঘষাঘষি ত্বকের ক্ষতি করতে পারে।
  • অতিরিক্ত সাবান ব্যবহার করবেন না। প্রয়োজন অনুযায়ী মৃদু পরিষ্কারক ব্যবহার করুন।
  • গোসলের পর ত্বক একেবারে শুকিয়ে যাওয়ার অপেক্ষা করবেন না। ত্বক কিছুটা ভেজা থাকতেই ময়েশ্চারাইজার লাগানো ভালো।
  • একই কাপড় বা অপরিষ্কার গোসলের সামগ্রী দীর্ঘদিন ব্যবহার করবেন না। শরীর ঘষার কাপড় বা স্পঞ্জ ভেজা অবস্থায় ফেলে রাখলে সেখানে জীবাণু বাড়তে পারে।

গোসলের সঠিক অভ্যাস কেমন হতে পারে?

সহজভাবে বললে, ভালো গোসলের জন্য খুব বেশি কিছু করার প্রয়োজন নেই।

প্রথমে কুসুম গরম পানি দিয়ে শরীর ভিজিয়ে নিন। প্রয়োজনীয় জায়গায় মৃদু পরিষ্কারক ব্যবহার করুন। চুল ধোয়ার প্রয়োজন থাকলে মাথার ত্বক ভালোভাবে পরিষ্কার করুন। এরপর সব সাবান ও শ্যাম্পু পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

গোসল শেষ হলে নরম তোয়ালে দিয়ে শরীর আলতোভাবে মুছে নিন। ত্বক সামান্য ভেজা থাকতেই ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে নিন। এই সহজ নিয়মগুলোই ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করতে পারে।

তাহলে প্রতিদিন গোসল করা উচিত কি না?

এটির উত্তর সবার জন্য এক নয়।

গোসলের প্রয়োজন নির্ভর করে আবহাওয়া, শরীরচর্চা, ঘাম, কাজের ধরন, ত্বকের ধরন এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভ্যাসের ওপর। নিয়মিত গোসল পরিচ্ছন্ন থাকতে সাহায্য করে, কিন্তু প্রতিদিন অনেকক্ষণ ধরে গরম পানিতে গোসল করা ত্বকের জন্য ভালো নয়।

বিশেষ করে যাদের ত্বক শুষ্ক বা চর্মরোগপ্রবণ, তাদের ক্ষেত্রে গোসলের সময় ও পদ্ধতির দিকে আরও বেশি নজর দেওয়া দরকার।

গোসল শুধু শরীর পরিষ্কার করার বিষয় নয়, এটি ত্বকের যত্নেরও একটি অংশ। তাই বেশি সময় ধরে গোসল করা বা শরীর জোরে ঘষে পরিষ্কার করাই যে ভালো, এমন নয়।

কুসুম গরম পানি, অল্প সময়ের গোসল, মৃদু পরিষ্কারক, অতিরিক্ত ঘষাঘষি এড়িয়ে চলা এবং গোসলের পর ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার, এই কয়েকটি অভ্যাস ত্বককে সুস্থ রাখতে সাহায্য করতে পারে।

সূত্র: হেলথলাইন

source: Asia Post

Back to top button