গ্যাস-সংকটে বন্ধ দেশের শত শত কারখানা

সারা দেশে তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে গ্যাসের সংকট চলছে। এই সংকট ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। এ ছাড়া গত বুধবার থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় দেশের শত শত শিল্প-কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে লাখ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। বিপাকে পড়েছেন শিল্পমালিকরাও। কারণ রপ্তানিমুখী এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিদেশি ক্রেতাদের (বায়ার) অর্ডার বাতিল হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
শিল্প-কলকারখানার জন্য বরাদ্দ করা গ্যাসের বেশির ভাগ বুধবার থেকে পাওয়ার প্ল্যান্টে সরবরাহ করায় এই মহাসংকটে পড়েছে দেশের পুরো শিল্প খাত। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন কয়েক কোটি মানুষ।
দেশের শিল্পাঞ্চলগুলোর মধ্যে হবিগঞ্জ এখন অন্যতম হাব। আর গ্যাস-সংকটের কারণে এই জেলার ১৭১টি শিল্পকারখানার উৎপাদন বুধবার থেকে বন্ধ। এতে প্রায় দুই লাখ শ্রমিক-কর্মচারী এখন কর্মহীন। প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে শত শত কোটি টাকা।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জে ৪৫০ ডায়িং কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণে বন্ধের পথে রয়েছে শতাধিক পোশক শিল্প। ইতোমধ্যে সাভার-আশুলিয়ায় প্রায় চার হাজার শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। এ ছাড়া শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত গাজীপুরে কয়েক শ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। রপ্তানি অর্ডার ও শিপমেন্ট বাতিলের আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এভাবে হঠাৎ কারখানা বন্ধ হওয়ায় চরম অনিশ্চয়তায় উদ্যোক্তারা। শিগগির এই সংকটের সমাধান না হলে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়বে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ পুরো অর্থনীতি। ফলে কমবেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সমাজের সব ক্ষেত্রে।
বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ চান উদ্যোক্তরা
উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস-সংকট চলতে থাকলে শুধু কারখানার চাকা নয়, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির চাকাও থমকে যাবে। বেকার হতে পারে অনেকে। মালিকদের পক্ষে ব্যাংকের দায়-দেনা পরিশোধও কঠিন হবে। সরকারকে এ ব্যাপারে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেন তারা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘আমরা কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে আছি। তিতাস গ্যাস স্বাভাবিক করতে এক সপ্তাহ ধরে চেষ্টা করছি। মন্ত্রী বলেছেন ১০ আগস্টের পর গ্যাস স্বাভাবিক হবে। এখন গ্যাস একদমই নেই। এ নিয়ে আগামী রোববার মন্ত্রীর সঙ্গে বসার চেষ্টা করছি। যদি মন্ত্রীর সঙ্গে বসতে পারি এবং সমাধান হয়, তাহলে ভালো। নয়তো সোমবার সংবাদ সম্মেলন করব।’
এদিকে সংকট নিরসনের কোনো আভাস মিলছে না। এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত হওয়ার মতো তেমন কোনো প্রতিশ্রুতি আসেনি। যদিও গ্যাসের এই সংকটের জন্য বর্তমান সরকার দায়ী নয় বলছেন দায়িত্বশীলরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বিগত সরকারগুলোর ভুল সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হচ্ছে পুরো জাতিকে। তবে এ সংকট সমাধানের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাত-দিন কাজ করছেন। জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কীভাবে, কত দ্রুত এ সমস্যার টেকসই সমাধান করা যায়, সে জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছেন। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছেন। কিন্তু সব সমস্যার সমাধান রাতারাতি করা সম্ভবও হচ্ছে না।
নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, গ্যাস-সংকটের কারণে ডায়িং থেকে কোনো ফ্যাব্রিক্স (কাপড়) পাচ্ছি না। বর্তমানে গ্যাসের প্রেশার একেবারে শূন্যে নেমে এসেছে। ফ্যাব্রিক্সের অভাবে অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ। পুরো নারায়ণগঞ্জে শতাধিক গার্মেন্ট কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
নিজের কারখানার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ডায়িং থেকে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ফ্যাব্রিক্স না পাওয়ায় টানা সাত দিন গার্মেন্টস বন্ধ ছিল। এরপর গত বুধবার কারখানা খুলেছিলাম। কিন্তু ফ্যাব্রিক্স না থাকায় বৃহস্পতিবার থেকে আবার কারখানা বন্ধ করে দিয়েছি। শনিবার কারখানা খুলব। এরপর ডায়িং থেকে ফ্যাব্রিক্স পাওয়া গেলে কারখানা চলবে, না হলে বন্ধ রাখতে হবে। গ্যাসের যে পরিস্থিতি, তাতে মনে হচ্ছে আগামী দু-তিন দিনের মধ্যে উন্নতি হবে না।
হবিগঞ্জে বন্ধ ১৭১ কারখানা
গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে গ্যাস সরবরাহ কমতে শুরু করে। তবে বুধবার থেকে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে জেলার ছোট-বড় ১৭১টি কারখানার প্রায় সব কটির উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়েছে। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন দুই লাখ শ্রমিক-কর্মচারী।
গাজীপুরেও বন্ধ অনেক কারখানা
শিল্পাঞ্চল-খ্যাত গাজীপুরে বিভিন্ন ধরনের কয়েক হাজার কলকারখানা রয়েছে। সবই গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। এমনিতে বছরজুড়ে সময়ে সময়ে গ্যাসের চাপ কম থাকে। এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। কিন্তু এবার গ্যাস-সংকট তীব্র হওয়ায় এখানকার কলকারখানা বিপাকে পড়েছে। গ্যাসের অভাবে ইতোমধ্যে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এতে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সাভার-আশুলিয়ায় হাজারো কর্মী ছাঁটাই, শিপমেন্ট নিয়ে শঙ্কা
গ্যাস-সংকটে সাভার-আশুলিয়ায় উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শিল্পাঞ্চলটিতে প্রায় দেড় হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাসনির্ভর কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। পোশাক কারখানার বয়লার, ডায়িং, ওয়াশিং, ফিনিশিং ও আয়রনিং বিভাগ স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না।
চলতি মাসে সাভার-আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানায় তিন থেকে চার হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারায়ণগঞ্জে বন্ধ ৪৫০ ডায়িং, ঝুঁকিতে গার্মেন্টস
নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের চাপ শূন্যের কাছাকাছি নেমেছে। এতে প্রায় ৪৫০টি ডায়িং কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। ডায়িং কারখানা থেকে ফ্যাব্রিক্স না পাওয়ায় শতাধিক গার্মেন্টসও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
শিল্পোদ্যোক্তারা জানান, কোনো কোনো গার্মেন্টস একদিন উৎপাদনে গেলে পরের দুদিন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। আবার ডায়িং থেকে কাপড় পাওয়া গেলে কয়েক দিন উৎপাদন চালানো হচ্ছে। এতে রপ্তানির নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পাঠানো নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। শহরের একটি গার্মেন্টসে প্রায় এক হাজার ৫০০ শ্রমিক অলস বসে আছেন।
তারা জানান, নরসিংদীর একটি স্পিনিং মিলে গ্যাসনির্ভর জেনারেটর বন্ধ থাকায় এক হাজার ২০০ শ্রমিকের কাজ বন্ধ। গ্যাস সংকটে সিএনজি স্টেশনও বিপাকে। নারায়ণগঞ্জে ৩৩টি সিএনজি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় প্রায় সবই বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ফলে দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন চালকরা। বাসাবাড়িতেও সংকট তীব্র।
আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান টার্মিনাল আছে। এর মধ্যে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের সক্ষমতা ৬০ কোটি ঘনফুট ও দেশীয় কোম্পানি সামিটের টার্মিনালের সক্ষমতা ৫০ কোটি ঘনফুট। গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। এতে গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়, বেড়ে যায় সংকট। রান্নার চুলা থেকে শুরু করে শিল্পকারখানা ও বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যাহত হয়। যানবাহনেও সিএনজি পেতে দীর্ঘ সারি পড়ে যায় ফিলিং স্টেশনে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র বলছে, এক্সিলারেটের টার্মিনালে দুটি বয়লার আছে। প্রতিটি বয়লারের সক্ষমতা ৩০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে একটি আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অক্ষত বয়লারটি থেকে ৬ আগস্ট গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। আর ক্ষতিগ্রস্ত বয়লারটি চালু করতে কাজ চলছে। এটি চালু করার আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করতে হবে। এতে ৭২ ঘণ্টা পুরোপুরি সরবরাহ বন্ধ থাকবে এক্সিলারেটের। এটি কবে করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। এখনো নির্দিষ্ট করে কোনো সময় ঠিক করা হয়নি।
তবে শিল্পোদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে অর্ডার বাতিল। এতে কর্মসংস্থান সংকোচন এবং রপ্তানি আয় কমে যাবে।
সূত্র: যুগান্তর
source: Asia Post







