News

লোহিত সাগরে জাহাজে হুতিদের হামলা, ৩ পাকিস্তানিসহ নিহত ৬

লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দব প্রণালিতে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় একটি পণ্যবাহী জাহাজের চার নাবিক নিহত হয়েছেন। পরে উদ্ধারকাজে গিয়ে হুতিবিরোধী দুই ইয়েমেনি উদ্ধারকর্মীও নিহত হন। সব মিলিয়ে এ ঘটনায় ৩ পাকিস্তানিসহ ছয়জন নিহত এবং অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন।

রয়টার্সের খবরে বলা হয়, মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) এ হামলার ঘটনা ঘটে। ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় ও কোস্ট গার্ড সূত্র জানায়, হামলার শিকার ‘তিহামাহ’ নামের বাণিজ্যিক জাহাজটি মিসরের মালিকানাধীন। নিহত চার নাবিকের মধ্যে তিনজন পাকিস্তানি ও একজন ইন্দোনেশিয়ার নাগরিক।

হামলার সময় জাহাজটি ইয়েমেনের পেরিম দ্বীপের উত্তর-পূর্বে নোঙর করা ছিল বলে জানিয়েছে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রি। হামলার পর জাহাজটির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর হুতিরা আবার হামলা চালালে হুতিবিরোধী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সেসের (এনআরএফ) দুই উদ্ধারকর্মী নিহত হন।

রয়টার্স বলছে, এই হতাহতের বিষয়টি নিশ্চিত হলে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জাহাজ চলাচলের ওপর হুতিদের হামলায় এটিই হবে প্রথম প্রাণহানির ঘটনা।

এদিকে মঙ্গলবার হুতিরাও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে একটি জাহাজে হামলার কথা নিশ্চিত করেছে। তবে তারা জাহাজটির নাম উল্লেখ করেনি। হুতিদের দাবি, জাহাজটিতে সৌদি আরবের সামরিক সরঞ্জাম বহন করা হচ্ছিল। তবে এ বিষয়ে সৌদি সরকারের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কেন্দ্র তাৎক্ষণিকভাবে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

রয়টার্স জানিয়েছে, মঙ্গলবার ইয়েমেনের মুরাদ এলাকার কাছে ছিল ‘তিহামাহ’। ইয়েমেনের কোস্ট গার্ডের দুই কর্মকর্তা এবং দেশটির সরকারের দুই সামরিক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তারা জানিয়েছেন, একটি ছোট পণ্যবাহী জাহাজে হুতিরা হামলা চালিয়েছে। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রিও জাহাজটিতে হামলার কথা জানিয়েছে।

এ হামলায় তিন পাকিস্তানি নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুহাম্মদ ইসহাক দার। ইয়েমেনের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে একজন ইন্দোনেশিয়ার নাগরিকও রয়েছেন।

ইয়েমেনের কোস্ট গার্ড জানায়, উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর হুতিরা আবার হামলা চালায়। এতে এনআরএফের দুই উদ্ধারকর্মী নিহত হন। হামলায় মোট ১০ জন আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে জাহাজটির সাত নাবিক, কোস্ট গার্ডের দুই সদস্য এবং এনআরএফের একজন সদস্য রয়েছেন।

হুতিরা গত ২০ জুলাই লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সামুদ্রিক অবরোধ ঘোষণা করে। তারা একে সৌদি আরবের ‘অবরোধে’র জবাব হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে সৌদি আরব ইয়েমেনে কোনো ধরনের অবরোধ আরোপের কথা অস্বীকার করেছে।

পাকিস্তানের উপকূলের কাছে হামলা

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের একটি বন্দরের দিকে যাওয়ার সময় পানামার পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ ‘ভেলা নোভা’র ওপর দুটি হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এতে জাহাজটির স্টিয়ারিং ব্যবস্থা অচল হয়ে যায়। ওই সময় জাহাজটি ওমান উপসাগর দিয়ে যাচ্ছিল।

সেন্ট্রাল কমান্ড আরও জানিয়েছে, ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ লঙ্ঘন না করতে জাহাজটিকে বারবার সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু সতর্কতা উপেক্ষা করে জাহাজটি চলতে থাকায় এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

এপ্রিল মাসে নৌ অবরোধ ঘোষণা করার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর হামলার শিকার হওয়া এটি ১২তম জাহাজ। আর ১৪ জুলাই অবরোধটি আবার কার্যকর করার পর এটি তৃতীয় জাহাজে হামলার ঘটনা।

ইরান-সম্পর্কিত ট্যাংকার চলাচল জাহাজ ও স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করে পর্যবেক্ষণ করা মার্কিন সংগঠন ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট নিউক্লিয়ার ইরানের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা চার্লি ব্রাউন বলেন, জাহাজটি সম্প্রতি মুম্বাই ও মালয়েশিয়ার পোর্ট ক্লাংয়ে গিয়েছিল। এসব বন্দরে ইরান-সংশ্লিষ্ট জাহাজও দেখা গেছে।

তিনি বলেন, অবরোধের আওতাধীন এলাকার কাছে পানামার পতাকাবাহী ‘ভেলা নোভা’কে যুক্তরাষ্ট্র অচল করে থামিয়ে দেওয়ার ঘটনা এবং এর আগে মুম্বাই বন্দরে জাহাজটির অবস্থান— ইরান-সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচলের ওপর বর্তমানে বাড়তি নজরদারির বিষয়টি তুলে ধরে।

ব্রিটিশ সামুদ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ভ্যানগার্ড জানিয়েছে, পাকিস্তানের উপকূল থেকে প্রায় ৭১ নটিক্যাল মাইল বা ১৩১ কিলোমিটার দূরে জাহাজটিতে হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কমেছে জাহাজ চলাচল

২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হুতিদের জাহাজে হামলার আগের দফার পর থেকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও লোহিত সাগর দিয়ে জাহাজ চলাচল ৫০ শতাংশের বেশি কমে গেছে।

গত মাসে হুতিরা অবরোধ ঘোষণা করার পর এই চলাচল আরও কমেছে। জাহাজ চলাচলের তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে প্রতিদিন গড়ে ৩২টি জাহাজ প্রণালিটি দিয়ে চলাচল করেছে। অবরোধের আগে প্রতিদিন গড়ে ৫০টি জাহাজ চলাচল করত।

অ্যামব্রি জানিয়েছে, বিভিন্ন সূত্র যে পণ্যবাহী জাহাজটিকে ‘তিহামাহ’ হিসেবে শনাক্ত করেছে, সেটির মালিকানা বা পরিচালনার সঙ্গে সৌদি আরবের কোনো সম্পর্ক নেই। জাহাজটি শনিবার ইয়েমেন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন আল-মোখা বন্দর থেকে ছেড়ে যায়।

জাহাজটির মালিক ও ব্যবস্থাপক হিসেবে মিসরের কয়েকটি কোম্পানির নাম উল্লেখ করেছে এলএসইজি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ই-মেইল ও ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।

এদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আরও বেশি ব্যাহত হয়েছে। সোমবার মাত্র ছয়টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে। এর আগের ১০ দিনের গড় ছিল প্রায় ১১টি জাহাজ। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতিদিন প্রায় ১৩০ থেকে ১৪০টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করত।

source: Rajneete

Back to top button