নয়জনের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে হয়েছে, কান্নাকণ্ঠে বেঁচে ফেরা বাংলাদেশি

‘আমাদের কাছে খাবার বা পানি কিছুই ছিল না। চোখের সামনে একে একে মারা গেলেন নয়জন সহযাত্রী। তাদের নিথর দেহগুলো সাগরে ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছি আমরা। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে ভেসে থাকার কারণে আমাদের শরীরেরও বিভিন্ন স্থানে পচন ধরেছে, দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। দয়া করে আমাদের বাঁচান, আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই।’
মিশরের মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এভাবেই সেদিনের বর্ণনা দিয়েছেন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ থানার পাথারিয়া গ্রামের আব্দুল হেকিমের ছেলে আব্দুল করিম।
কায়রোর বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্যমতে, মানবপাচার চক্রের সহায়তায় গত ৩ আগস্ট ৩৮ জন বাংলাদেশি ও চারজন সুদানিসহ মোট ৪২ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী লিবিয়ার তবরুক উপকূল থেকে একটি রাবারের নৌকায় গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ইঞ্জিনচালিত নৌকাটিতে উপযুক্ত কোনো নেভিগেশন ব্যবস্থা ছিল না। যাত্রীদের ৩৬ ঘণ্টার গন্তব্যের কথা বলা হলেও মাঝপথে নেভিগেশন গোলযোগ ও জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ায় নৌকাটি দিকভ্রষ্ট হয়ে পড়ে এবং টানা ১০ দিন ভূমধ্যসাগরে ভাসতে থাকে।
টানা ১০ দিন সমুদ্রে ভেসে থাকার সময় তীব্র গরম, প্রখর সূর্যতাপ এবং খাদ্য ও পানির অভাবে ১০ জন যাত্রী অসুস্থ হয়ে মারা যান। মৃতদের মধ্যে ৯ জন বাংলাদেশি এবং একজন সুদানি নাগরিক। দীর্ঘদিন সমুদ্রে অবস্থানের কারণে মৃতদেহে পচন ধরায় জীবিত যাত্রীরা বাধ্য হয়ে লাশগুলো সমুদ্রে ভাসিয়ে দেন বলে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশি নাগরিক আব্দুল করিমের দেওয়া তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাসপাতালের চিকিৎসাধীন আব্দুল করিম বলেন, আমরা ৪২ জন গ্রিসের উদ্দেশে রওয়ানা হয়েছিলাম। গ্রিসের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর আমাদের নৌকার ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যায়। ফলে আর সামনে এগোতে পারিনি। এ সময় আমাদের উদ্ধার করতে দালালের লোকজন কিংবা অন্য কোনো সংস্থা এগিয়ে আসেনি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে খাবার বা পানি কিছুই ছিল না। খাবার ও পানির অভাবে চোখের সামনেই ৯ জন বাংলাদেশি মারা গেছেন। তাদের মরদেহ সাগরে ফেলে দিতে হয়েছে। পরে আরও দুজন মারা যান। দীর্ঘ সময় লবণাক্ত পানিতে থাকার কারণে আমাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে পচন ধরেছে এবং দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। আমরা এখন মারসা মাতরুহ হাসপাতালে ভর্তি আছি। এখানকার চিকিৎসকরা আমাদের চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং ভালো খাবারেরও ব্যবস্থা করছেন। আমাদের বাঁচান। আমরা দেশে ফিরে যেতে চাই।
দূতাবাসের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত ১৩ আগস্ট দিকভ্রষ্ট নৌকাটি মিশরের মারসা মাতরুহ উপকূলে পৌঁছালে স্থানীয় পুলিশ ২৯ জনকে উদ্ধার করে। তাদের মধ্যে ১৮ জন গুরুতর অসুস্থ ও অচেতন থাকায় তাদের তাৎক্ষণিকভাবে মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
source: Asia Post







