হরমুজ নিয়ে ওমানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্তের পথে, তবে নৌপথ খুলছে না: ইরান

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ওমানের সঙ্গে ইরানের একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে এই চুক্তি হলেই গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে তেহরান। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরান আরও একটি জাহাজে হামলা চালিয়েছে।
শনিবার (৮ আগস্ট) রয়টার্সের খবরে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে সমঝোতাকে যুদ্ধ বন্ধে বৃহত্তর একটি চুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। এর পর বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রপ্তানি পথ হরমুজ প্রণালিতে ইরান কার্যত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
শুক্রবার পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, প্রণালির দুই পাশে থাকা ইরান ও ওমানের মধ্যে শিগগিরই একটি সমঝোতা হতে পারে বলে ওয়াশিংটন আশা করছে। এর ফলে স্বাভাবিকভাবে তেল পরিবহন আবার শুরু হতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শনিবার বলেন, হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে নতুন একটি নৌপথ চালুর বিষয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে সমঝোতা প্রায় হয়ে গেছে। তবে প্রণালিটি আবার খুলে দেওয়া হবে কি না, তা আরও কিছু শর্তের ওপর নির্ভর করছে। এর মধ্যে ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।
ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার সচিব মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর আরও কয়েকটি শর্তের কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি বন্ধ করা, ইরান ও তার লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও ইরাকের মিত্রদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন বন্ধ করা, ইরানের ওপর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করে দেওয়া।
ওমানের সঙ্গে আলোচনা ইতিবাচক, জাহাজে হামলার নিন্দা
হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সময় জাহাজে বারবার হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে ওমান। তবে এসব হামলার জন্য কাউকে দায়ী করেনি দেশটি। একই সঙ্গে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা নিয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা ‘ইতিবাচক ও গঠনমূলক’ বলে জানিয়েছে ওমান।
দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘সব পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে এই আলোচনা ও অর্জিত অগ্রগতিকে প্রভাবিত করতে পারে— এমন যেকোনো পদক্ষেপ এড়িয়ে চলার গুরুত্বের ওপর ওমান জোর দিচ্ছে।’
আরাগচি বলেন, হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য আগে যে পৃথক নৌপথ নির্ধারণ করা ছিল, তা এখন আর তেহরানের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। স্থায়ী নৌপথের বিষয়ে কারিগরি ও আইনি বিষয়গুলো সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ওমানের সঙ্গে একটি অস্থায়ী নৌপথ নিয়ে আলোচনা করছে ইরান।
ইরানের তুলনামূলক মধ্যপন্থি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য এখনই সবচেয়ে ভালো সময় বলে তিনি মনে করেন।
ইরানের সংবাদ সংস্থাগুলো তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেছে, ‘দেশে ঐক্য, শক্তি ও সংহতি রয়েছে। আর যতদূর আমি জানি, এই যুদ্ধে ইরানকে বিজয়ী ও শক্তিশালী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।’
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে উপসাগরীয় দেশগুলো ও জর্ডানে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে তেহরান। পাশাপাশি সংকীর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজেও হামলা চালিয়েছে তারা। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে চলাচল করত।
শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়ার সময় দেশটির রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে কেউ আহত হয়নি। প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর হামলার সর্বশেষ ঘটনা এটি।
যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণ সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, একটি জাহাজ অজ্ঞাত কোনো বস্তুর আঘাতে আগুন ধরে যায়। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। এতে পরিবেশের ওপর কোনো প্রভাব পড়ার খবর পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে ইরানের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত কয়েক সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বারবার ইঙ্গিত দিয়েছে যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি চুক্তি হতে পারে। তবে প্রতিবারই ইরান আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে। সর্বশেষ দফার এই আলোচনা দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমঝোতায় পৌঁছাবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
শুক্রবার রয়টার্সকে ওই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল কোনো বাধা ছাড়াই পুনরায় চালুর চুক্তি ঘোষণা হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নেবে।’ তিনি বলেন, ইরান তার প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করছে কি না, তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ নির্ভর করবে।
ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীও (আইআরজিসি) শনিবার জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ইরানের শর্ত মেনে নিলে তবেই হরমুজ প্রণালি আবার খুলবে। তাদের দাবি, বিষয়টি ইরান ও ওমানের আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
ইরানের সংবাদ সংস্থা তাসনিমকে দেওয়া বক্তব্যে আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যখনই ইরানের শর্ত মেনে নেবে, তখনই নিশ্চিতভাবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে।’
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাঁচ মাস ধরে চলা যুদ্ধ বন্ধে সহায়তার জন্য ইরান ও ওমানের মধ্যে যে চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর তেহরানকে নিয়ন্ত্রণ দেওয়ার কথা রয়েছে। বুধবার রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা ও অঞ্চলটির দুই কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছিলেন। ইরানের জন্য এটিকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ছাড়গুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যপথে প্রবেশাধিকারের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া হবে না বলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বারবার জানিয়েছেন। চুক্তির শর্ত পরিবর্তনের জন্য তারা কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে তেলবাহী ট্যাংকার থেকে শুল্ক নেওয়ার যৌক্তিকতা দেখিয়েছে ইরান। পাশাপাশি অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করা জাহাজে গুলি চালানো হয়েছে। এসব কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটেছে। এর ফলে জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং মূল্যস্ফীতিও আরও বেড়েছে।
source: Rajneete







