আর্ন্তজাতিক

যুক্তরাজ্যে করোনার ভ্যাকসিন পরীক্ষায় প্রথম ইনজেকশন পুশ

ইউরোপে মানবদেহে করোনাভাইরাস ভ্যাকসিনের প্রয়োগের প্রথম পরীক্ষা যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে শুরু হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার গবেষক দলের উদ্ভাবিত টিকা প্রথমে দুজন স্বেচ্ছাসেবীর শরীরে দেওয়া হয়েছে। এ পরীক্ষায় ৮০০ জনের শরীরে ভ্যাকসিন দেওয়া হবে। তাঁদের মধ্যে অর্ধেক ব্যক্তির শরীরে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন ও বাকি অর্ধেকের শরীরে নিয়ন্ত্রিত মেনিনজাইটিস প্রতিরোধী ভ্যাকসিন দেওয়া হবে।

বিবিসি অনলাইনের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, অক্সফোর্ডের পরীক্ষা এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে স্বেচ্ছাসেবীরা কোন ভ্যাকসিন পেয়েছেন, তা জানবেন না, তবে চিকিৎসকেরা জানবেন।

অক্সফোর্ডের পরীক্ষায় অংশ নেওয়া এলসা গ্রানাটো বলেন, ‘আমি একজন বিজ্ঞানী। আমি যতটুকু পারি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার অংশ হয়ে সহযোগিতা করতে চেয়েছি।’

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির তিন মাসের প্রচেষ্টায় এ ভ্যাকসিন তৈরি করা হয়েছে। জেনার ইনস্টিটিউটের ভ্যাকসিনোলজির অধ্যাপক সারাহ গিলবার্ট প্রি-ক্লিনিক্যাল গবেষণার নেতৃত্ব ছিলেন। তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে এ ভ্যাকসিনটি নিয়ে আমার আত্মবিশ্বাস অনেক বেশি। অবশ্যই আমাদের এটি পরীক্ষা করতে হবে এবং মানুষের কাছ থেকে তথ্য নিতে হবে। আমাদের এটি দেখাতে হবে যে এটি প্রকৃতপক্ষে কাজ করে। ব্যাপক হারে ভ্যাকসিন ব্যবহারের আগে লোকেরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া ঠেকাচ্ছে কি না, তাও দেখতে হবে।’

এর আগে অধ্যাপক গিলবার্ট বলেছিলেন, এ ভ্যাকসিনটি কাজ করবে বলে তিনি ৮০ শতাংশ আত্মবিশ্বাসী। এর সম্ভাবনা বিষয়ে তাঁর প্রত্যাশা অনেক বেশি।

ভ্যাকসিনটি তৈরিতে শিম্পাঞ্জি থেকে সাধারণ সর্দির ভাইরাসের দুর্বল সংস্করণ (অ্যাডেনোভাইরাস) ব্যবহার করা হয়েছে। এটি এমনভাবে রূপান্তর করা হয়েছে, যাতে মানুষের মধ্যে জন্মাতে না পারে।

এর আগে করোনাভাইরাসের আরেক রোগ মার্সের ভ্যাকসিন তৈরি করেছেন অক্সফোর্ডের গবেষকেরা। এ ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল। ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় এটি সম্ভাবনাময় ফল দেখিয়েছিল।

গবেষকেরা করোনাভাইরাসের কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য স্বেচ্ছাসেবকদের কতজন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন, সে তথ্য পরীক্ষা করবেন।

গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির পেডিয়াট্রিক ইনফেকশন অ্যান্ড ইমিউনিটি বিভাগের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু পোলার্ড।

স্কাই নিউজকে পোলার্ড বলেন, তাঁরা প্রথমে স্বল্প পরিসরে সরাসরি মানুষের ওপর টিকার পরীক্ষা চালাবেন। প্রথমে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তরুণদের ওপর প্রয়োগ করে পরীক্ষা চালানো হবে। এরপর বয়স্ক ব্যক্তিদের ওপর পরীক্ষা চালানো হবে।

অক্সফোর্ডের গবেষক দলটির দাবি, তারা প্রত্যাশা করছে, তাদের উদ্ভাবিত টিকা একবার নিলেই শরীরে যথেষ্ট পরিমাণে প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি তৈরি হবে, যা করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করবে। পরীক্ষামূলক এই টিকার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সিএইচএডিওএক্সওয়ান এনসিওভি-১৯’।

অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন গ্রুপের অধ্যাপক অ্যান্ডু পোলার্ড বলেনে, ‘বর্তমান মহামারি তরঙ্গের শেষ তাড়া করছি। যদি আমরা এটি ধরতে না পারি, তবে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ভ্যাকসিনটি কার্যকর হয় কি না, তা আমরা বলতে পারব না। তবে আশা করি, ভবিষ্যতে আরও কিছু ঘটনা ঘটবে। কারণ এই ভাইরাসটি এখনো যায়নি।’

ভ্যাকসিন গবেষকেরা স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবাকর্মীদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিয়োগকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। কারণ, তাঁদের ভাইরাসের সংক্রমণের আশঙ্কা অন্যদের চেয়ে বেশি।

এর পরের ধাপে সামনের মাসগুলোতে পাঁচ হাজার স্বেচ্ছাসেবীকে নিয়ে পরীক্ষা চালানো হবে। ওই সময় কোনো বয়সের বাছবিচার থাকবে না। সাধারণত বয়স্ক লোকের এ ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রে দুর্বল প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় বলে তাঁদের দুই ডোজ লাগবে কি না, তা নিয়েও চিন্তা করছেন গবেষকেরা।

ভবিষ্যতে কারও শরীরে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঘটিয়ে পরীক্ষা চালানো হবে কি না? গবেষকেরা বলেন, এখনো এর কোনো চিকিৎসা নেই বলে তা নৈতিক নয়। অধ্যাপক পোলার্ড বলেন, ‘যদি আমরা সেই পর্যায়ে পৌঁছে যাই, যেখানে রোগের জন্য কিছু চিকিত্সা থাকবে এবং আমরা স্বেচ্ছাসেবীদের সুরক্ষার গ্যারান্টি দিতে পারি, তবে এটি একটি ভ্যাকসিন পরীক্ষা করার খুব ভাল উপায় হবে।’

পরীক্ষায় অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবীদের আগামী মাসগুলোতে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হবে। কেউ কেউ টিকা পাওয়ার দু-এক দিন পরে ঘা, মাথাব্যথা বা জ্বরে ভুগতে পারেন। তবে অক্সফোর্ডের গবেষক দল বলছে, ভ্যাকসিনে রোগ বাড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি কম।

সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ ১০ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন তৈরির আশা করছেন গবেষকেরা। ভ্যাকসিন কার্যকর প্রমাণিত হলে এরপর উৎপাদনের মাত্রা নির্ণয় করবেন।

অধ্যাপক গিলবার্ট বলেন, উৎপাদনের বিষয়টি এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। কী ঘটবে, তা নির্ধারণ করা আমাদের কাজ নয়। আমাদের একটি ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা করতে হবে, যা কাজ করে এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে এবং তারপর কী হবে এটার সিদ্ধান্ত অন্যরা নেবে। আমাদের চেষ্টা করতে হবে, যাতে পর্যাপ্ত ডোজ পাওয়া যায়, যাতে সবচেয়ে জরুরি যাদের, তারা যেন সেটা পায়। শুধু যুক্তরাজ্যের কথা ভাবলে চলবে না, উন্নয়নশীল দেশগুলোর কথাও মাথায় রাখতে হবে।

অধ্যাপক অ্যান্ড্রু পোলার্ড বলেন, তাঁরা আগামী সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ ১০ লাখ টিকা উৎপাদন করবেন। পাশাপাশি পরীক্ষাও চালিয়ে যাবেন। পরীক্ষা সফল হলে দ্রুততার সঙ্গে তা গণহারে প্রয়োগের ব্যবস্থা করা হবে। তবে এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা বিফল হলে পুরো উৎপাদনই বাতিল হয়ে যাবে।

অক্সফোর্ডের গবেষকেদের পাশাপাশি ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের আরেকটি দল করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন নিয়ে জুন মাসে পরীক্ষা শুরু করবে।সরকারের পক্ষ থেকে অক্সফোর্ড ও ইম্পেরিয়াল টিম চার কোটি পাউন্ড তহবিল পেয়েছে।

ব্রিটিশ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক গত মঙ্গলবার এক ব্রিফিংয়ের সময়ই অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষক দলের উদ্ভাবিত ওই টিকার বিষয়ে বলেছিলেন।  প্রকল্পটি যৌথভাবে পরিচালনা করছে যুক্তরাজ্যের জেনার ইনস্টিটিউট ও অক্সফোর্ড ভ্যাক্সিন গ্রুপ।

মঙ্গলবার ম্যাট হ্যানকক বলেন, ‘আমরা তাদের (টিকা প্রকল্প) সব ধরনের সহযোগিতা করব। সফল হওয়ার সম্ভাবনা যতটা সম্ভব বাড়াতে আমরা তাদের সব ধরনের প্রয়োজনীয়তা মেটানোর চেষ্টা করব।’

এর আগে গত ১৬ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে একটি টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হয়। ইউএসএ টুডে জানায়, সিয়াটলের কায়সার পার্মানেন্ট’স ভ্যাক্সিন ট্রিটমেন্ট অ্যান্ড ইভল্যুশন ইউনিটের গবেষকেরা জানিয়েছেন, তাঁরা এখন স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর দ্বিতীয় দফায় টিকার প্রয়োগ শুরু করেছেন। এর অর্থ হলো, প্রথম দফায় দেওয়া টিকার দৃশ্যমান কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। গবেষক দলের প্রধান লিসা জ্যাকসন বলেছেন, ‘টিকা পরীক্ষার কার্যক্রম থেমে নেই। কাজেই ধরে নেওয়া যায় যে প্রথম দফায় দেওয়া টিকার পরিপ্রেক্ষিতে নেতিবাচক কিছু ঘটেনি।’

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *