মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন/হিজবুল্লাহ’র পুনরুত্থান: ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর ভেতরের গল্প পর্ব ১

লেবাননের রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠন হিজবুল্লাহ একসময় কার্যত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল। শত্রুরা তাদের হিসাবের খাতা থেকে বাদই দিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু চারপাশের শত্রুদের প্রচণ্ড চাপ সত্ত্বেও হিজবুল্লাহ আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। কীভাবে ঘটল এই নাটকীয় পুনরুত্থান? সেই ভেতরের গল্পই উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে।
চরম বিপর্যয় ও বিকল্প পরিকল্পনা
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে হিজবুল্লাহ’র ওপর এক চরম বিপর্যয় নেমে এসেছিল। সে সময় সংগঠনটি পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ইসরায়েলি বাহিনী মাত্র একটি হামলায় ৮০টি শক্তিশালী বোমা বর্ষণ করে হিজবুল্লাহ’র সদর দপ্তর মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। এতে সংগঠনটির প্রধান হাসান নাসরুল্লাহসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা নিহত হন। মাটির নিচে প্রায় ৬০ ফুট গভীর বাঙ্কারে লুকিয়েও নাসরুল্লাহ নিরাপদ থাকতে পারেননি। ইসরায়েলিরা তার অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করেছিল।
হিজবুল্লাহ কমান্ডারদের মনে তখন প্রবল সন্দেহ জাগে। তারা ভাবছিলেন, ইসরায়েলিরা তাদের ফোন হ্যাক করেছে এবং তাদের প্রতিটি কথা ও কাজের খবর রাখছে। এর ওপর ইসরায়েলি গোয়েন্দারা হাজার হাজার পেজার ও ওয়াকিটকিতে বিস্ফোরক ঢুকিয়ে বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে চরম বিপর্যয় তৈরি হয়।
এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকা কমান্ডাররা নিজেদের মোবাইল ফোন ফেলে দেন। এরপর তারা ‘বাইকার গ্যাং’-এর মতো মোটরসাইকেল ও স্কুটারে চড়ে বেইরুটের দক্ষিণের শহরতলি ‘দাহিহা’র হারেত হরিক এবং শিআহসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন। হিজবুল্লাহ’র পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থা তখন ভেঙে পড়েছিল। সবাই ভাবছিলেন, স্বয়ং নাসরুল্লাহ যদি নিরাপদ না থাকেন, তবে আর কেউই নিরাপদ নন।
এবার হিজবুল্লাহকে তাদের সর্বশেষ বা ব্যাকআপ পরিকল্পনার আশ্রয় নিতে হলো। কমান্ডাররা কখনো ভাবেননি যে এই চরম পথ তাদের বেছে নিতে হবে। তারা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য দাহিহার বেকারির দোকান, ব্যাংকের শাখা কিংবা মোবাইলের দোকানের মতো চেনা চেনা জায়গায় জড়ো হতে লাগলেন। কোনো ফোন নয়, সরাসরি দেখা করে চোখের দেখায় যোগাযোগ শুরু হলো।
সেখানে জড়ো হয়ে তারা নতুন পরিকল্পনা করলেন। কীভাবে দলকে আবার চাঙ্গা করা যায় এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের স্থল হামলা মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে তারা ছক আঁকলেন। এখান থেকেই শুরু হলো হিজবুল্লাহ’র ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে এসে দলটি তাদের সামরিক কৌশলে আমূল পরিবর্তন আনল।
মিডল ইস্ট আই হিজবুল্লাহ’র অভ্যন্তরীণ বিষয় সম্পর্কে জানেন এমন সাতজন কর্মকর্তা, দলের ঘনিষ্ঠ সূত্র, লেবাননের রাজনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তা এবং আরব কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলেছে। নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের প্রায় সবাই নাম প্রকাশ না করার শর্তে তথ্য দিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, নানামুখী সংশয় থাকা সত্ত্বেও হিজবুল্লাহ কীভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ল এবং চরম পরাজয়ের পর দলটি কীভাবে তাদের সামরিক শাখাকে আবার পুনর্গঠিত করল।
যুদ্ধের পটভূমি ও নাসরুল্লাহর সিদ্ধান্ত
বন্ধ দরজার আড়ালে হিজবুল্লাহ’র অনেক সদস্যই এখন স্বীকার করেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলে হামলা চালানো তাদের একটি ঐতিহাসিক ও মারাত্মক ভুল ছিল। অন্তত যেভাবে তারা হামলাটি শুরু করেছিল, তা ঠিক হয়নি। তিনটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, হামলা চালানোর সিদ্ধান্তটি ছিল মূলত একা হাসান নাসরুল্লাহর। হিজবুল্লাহ সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘শূরা কাউন্সিল’-এর অনেক সদস্যই এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন।
সম্প্রতি ইসরায়েলি সেনাসূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির আর্মি রেডিও একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে দাবি করা হয়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার আগে হামাস ও হিজবুল্লাহ’র মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল। গাজায় হামাসের তৎকালীন প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ার একসঙ্গে সমন্বিত হামলা চালানোর জন্য নাসরুল্লাহকে অনুরোধ করেছিলেন।
তবে হিজবুল্লাহ’র জ্যেষ্ট কর্মকর্তা ও সাবেক সংসদ সদস্য নওয়াফ মুসাভি এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি কেবলই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। এর বাস্তবে কোনো ভিত্তি নেই। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে হিজবুল্লাহ কয়েকজন সদস্য জানান, ইসরায়েলের এই দাবির পেছনে কিছুটা সত্যতা রয়েছে।
বহু বছর ধরে ইরান ও তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ (অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স) গড়ে তুলেছে। তারা ‘ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট’ কৌশলের আওতায় ইসরায়েলকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার পরিকল্পনা করেছিল। এই কৌশলের মূল চালিকাশক্তি ছিলেন ইরানের প্রয়াত জেনারেল কাসেম সোলাইমানি এবং হাসান নাসরুল্লাহ। নাসরুল্লাহর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সামরিক সাফল্য তাকে মধ্যপ্রাচ্যে এক প্রভাবশালী নেতায় পরিণত করেছিল।
আরবি ভাষায় দক্ষ কাসেম সোলাইমানি ছিলেন ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডের কুদস ফোর্সের প্রধান। তিনি ইরাকি মিলিশিয়া ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মতো ইরানি মিত্রদের যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। ইরানের সর্বোচ্চ মহলেও সোলাইমানির ব্যাপক প্রভাব ছিল। ইরান যখন কোনো সংকটে ‘কৌশলগত ধৈর্য’ ধারণ করতে চাইত, সোলাইমানি তখন নিজের প্রভাবে তেহরানকে সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে পারতেন।
তাদের মধ্যকার বোঝাপড়া কেমন ছিল, তা বোঝাতে একটি সূত্র ২০১২ সালের একটি ঘটনার উল্লেখ করেন। সে সময় সোলাইমানি সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ সরকারকে টিকিয়ে রাখতে নাসরুল্লাহকে সিরিয়া যুদ্ধে যোগ দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তখন নাসরুল্লাহ বলেছিলেন, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন, আমাদের সিরিয়া যাওয়া উচিত। আসলে আমাদের আরও আগেই সেখানে যাওয়া দরকার ছিল।’
২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় কাসেম সোলাইমানির মৃত্যু পুরো হিসাব ওলটপালট করে দেয়। এর ফলে ‘ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট’ গঠনের মূল অভিভাবককে হারায় প্রতিরোধ যোদ্ধারা। হিজবুল্লাহ’র তিনটি সূত্র বলছে, এই নেতৃত্বহীনতার কারণেই সম্ভবত হামাস ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর এককভাবে ইসরায়েলে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
দুটি সূত্রের মতে, হামাসের হামলার পর ইরানের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির-আব্দুল্লাহিয়ান বেইরুট সফরে যান। তিনি নাসরুল্লাহকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে তেহরান এই যুদ্ধে কেবল নৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দেবে, সরাসরি জড়াবে না। নাসরুল্লাহ নিজেও ইরানের মতো যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর প্রতিক্রিয়া এড়াতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি সীমিত পরিসরে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলা শুরুর পরদিন, অর্থাৎ ৮ অক্টোবর তিনি ইসরায়েলে রকেট হামলার নির্দেশ দেন। এভাবে তিনি গাজার সমর্থনে একটি নতুন যুদ্ধক্ষেত্র বা ‘সাপোর্ট ফ্রন্ট’ খুলে বসেন।
তবে নাসরুল্লাহর এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে তার অনেক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা একমত ছিলেন না। বিশেষ করে রাদওয়ান ফোর্সের প্রধান ইব্রাহিম আকিল এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন। তার মতে, হিজবুল্লাহ’র হয় পুরোপুরি যুদ্ধে নামা উচিত ছিল, না হয় একেবারেই দূরে থাকা উচিত ছিল।
মোসাদের চাল ও পেজার-ওয়াকিটকি হামলা
এরপর প্রায় এক বছর ধরে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে সীমান্তজুড়ে পাল্টাপাল্টি হামলা চলে। তবে এই সংঘাতের তীব্রতায় লেবাননের ক্ষয়ক্ষতি ছিল অনেক বেশি। তা সত্ত্বেও হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একটি বড় অংশকে উত্তর সীমান্তে ব্যস্ত রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
প্রথম দিকে দুই পক্ষই এক অলিখিত লাল সীমানা মেনে চলত। হাসান নাসরুল্লাহ হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, দাহিহায় হামলা হলে তার জবাব দেওয়া হবে সরাসরি তেল আবিবে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে। কিন্তু ইসরায়েল ধীরে ধীরে সেই লাল সীমানা অতিক্রম করে হিজবুল্লাহ’র ধৈর্যের পরীক্ষা নিতে শুরু করে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দাহিহায় এক হামলায় হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতা সালেহ আল-আরুরিকে হত্যা করে ইসরায়েল।
এর জবাবে হিজবুল্লাহ মাউন্ট মেরনে অবস্থিত ইসরায়েলের একটি সামরিক ঘাঁটিতে বড় ধরনের রকেট হামলা চালায়। হিজবুল্লাহ’র সূত্রগুলো জানায়, আরুরি ফিলিস্তিনি ছিলেন বলে তেল আবিবে হামলা চালানো হয়নি। জবাবটি পরিকল্পিতভাবে একটু ভিন্ন মাত্রার রাখা হয়েছিল।
এর ঠিক ছয় মাস পর হিজবুল্লাহ’র শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ফুয়াদ শুকরকে হত্যা করে ইসরায়েল। এর জবাবে এক হাজার রকেট ছুড়বার পরিকল্পনা করেছিল হিজবুল্লাহ। কিন্তু ইসরায়েলি বাহিনী আগেভাগেই আক্রমণ চালিয়ে রকেট উৎসক্ষেপণ কেন্দ্রগুলোর বেশির ভাগই ধ্বংস করে দেয়। হিজবুল্লাহ’র দুটি সূত্র জানায়, ইসরায়েলি গোয়েন্দারা আগে থেকেই হিজবুল্লাহ নেতৃত্বের সমস্ত পরিকল্পনা আড়ি পেতে শুনছিল।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত হিজবুল্লাহ বুঝতেই পারেনি যে তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা গভীরভাবে ভেঙে পড়েছে। ২০২৪ সালের ১৭ ও ১৮ সেপ্টেম্বর ইসরায়েল হাজার হাজার পেজার ও ওয়াকিটকির বিস্ফোরণ ঘটায়। ইসরায়েলের সমর্থকেরা একে জেমস বন্ডের সিনেমার মতো এক ‘ঐতিহাসিক’ ঘটনা হিসেবে প্রশংসা করে। মোসাদ মূলত বেনামী কিছু কোম্পানির মাধ্যমে হিজবুল্লাহ’র সরবরাহ ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ে। তারা যোগাযোগের ডিভাইসগুলোতে অত্যন্ত গোপনে শক্তিশালী বিস্ফোরক বসিয়ে দেয়। ওই বিস্ফোরণে অন্তত ৪০ জন নিহত এবং কয়েক হাজার মানুষ আহত হন।
মোসাদের তৎকালীন প্রধান ডেভিড বার্নিয়া একে তাদের মিশনের দুর্দান্ত সাফল্য বলে দাবি করেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই হামলার স্মারক হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে একটি সোনার পেজার উপহার দেন। হিজবুল্লাহ’র সূত্রগুলো স্বীকার করে যে, এটি ছিল এক বিরাট ধাক্কা। তবে তাদের দাবি, মোসাদের এই মিশনটি শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি সফল হয়নি।
১৭ সেপ্টেম্বরের পেজার বিস্ফোরণটি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি করলেও মোসাদের আসল লক্ষ্য ছিল ওয়াকিটকিগুলো। কারণ এগুলো আকারে বড় ছিল এবং এতে বেশি পরিমাণে বিস্ফোরক রাখা সম্ভব হয়েছিল। এগুলো মাঠপর্যায়ের যোদ্ধারা ব্যবহার করতেন। হিজবুল্লাহ সাধারণত অসামরিক কর্মকর্তা ও বার্তা পাঠানোর জন্য পেজার ব্যবহার করত। ২০২২ সাল থেকেই ইসরায়েল এই ক্ষতিকর ডিভাইসগুলো সরবরাহ করা শুরু করে।
অন্যদিকে, ওয়াকিটকির ছকটি প্রায় এক দশক ধরে চলছিল। দুটি সূত্র জানায়, ১৮ সেপ্টেম্বর হামলার দ্বিতীয় পর্যায়ে হিজবুল্লাহ’র গুদামে প্রায় ১৫ হাজার ওয়াকিটকি মজুত ছিল। ভাগ্যবশত, সেগুলোর বেশির ভাগই তখন বন্ধ ছিল।
পেজার হামলার পরদিন মাত্র কয়েক’শ ওয়াকিটকি বিস্ফোরিত হয়েছিল। কিন্তু এর ক্ষয়ক্ষতি ছিল ভয়াবহ। প্রথম দিন পেজার বিস্ফোরণে ১২ জন মারা গেলেও দ্বিতীয় দিন ওয়াকিটকি বিস্ফোরণেই মারা যান ২৫ জন। হিজবুল্লাহ’র দুটি সূত্র জানায়, ইসরায়েল আসলে নির্ধারিত সময়ের আগেই তাড়াহুড়ো করে এই হামলা চালিয়েছিল। কারণ মোসাদ আড়ি পেতে জানতে পেরেছিল যে হিজবুল্লাহ’র মনে সন্দেহ জাগতে শুরু করেছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে হিজবুল্লাহ ও ইরান বুঝতে পারে যে যুদ্ধকে আর সীমিত রাখা সম্ভব নয়। তাই হিজবুল্লাহ অল-আউট যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯ সেপ্টেম্বর দলটির এক বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। সেখানে ইসরায়েলের ওপর বড় ধরনের স্থল অভিযানসহ যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হিজবুল্লাহ’র একটি নিরাপত্তা দল সরবরাহ করা পেজারগুলো নিয়ে বারবার সন্দেহ প্রকাশ করছিল। ডিভাইসগুলো দুটি পরীক্ষায় পার পেয়ে গেলেও সন্দেহ দূর হয়নি। তাই পরীক্ষার জন্য কিছু নমুনা ইরানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর এই পদক্ষেপই ইসরায়েলকে সময়ের আগেই বোতাম টিপতে বাধ্য করে।
একটি সূত্র জানায়, ‘যদি পেজারগুলো আগে বিস্ফোরিত না হতো, তবে ওয়াকিটকিগুলো চালু করে হাজার হাজার যোদ্ধার হাতে তুলে দেওয়া হতো। আর তখন বিস্ফোরণ ঘটলে বড় ধরনের গণহত্যা হয়ে যেত।’
নেতৃত্ব সংকট ও ঘুরে দাঁড়ানো
এরপর ৬৬ দিন ধরে হিজবুল্লাহ’র ওপর নির্মম বিমান ও স্থল হামলা চালায় ইসরায়েল। ইসরায়েলি হামলায় কেবল হাসান নাসরুল্লাহই নিহত হননি, তার খালাতো ভাই ও সম্ভাব্য উত্তরসূরি হাশেম সাফিউদ্দিনও প্রাণ হারান। দলটির প্রায় পুরো সামরিক নেতৃত্ব নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। নিহত হন ইব্রাহিম আকিলসহ রাদওয়ান ফোর্সের সব শীর্ষ কমান্ডার। ২০০৬ সালের যুদ্ধে ব্যবহৃত নাসরুল্লাহর একটি গোপন কমান্ড সেন্টারে বৈঠক করার সময় তাদের ওপর বোমা ফেলা হয়।
হিজবুল্লাহ’র বেশ কয়েকটি সামরিক ইউনিট এবং অস্ত্রাগার পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। বেঁচে যাওয়া কমান্ডাররা মূলত মোবাইল ফোন ব্যবহার না করার কারণেই সে যাত্রায় রক্ষা পেয়েছিলেন। ওদিকে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহ’র ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন দলগুলো ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। উত্তর লেবাননে তাদের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর কী বিপর্যয় নেমে এসেছে, সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না তাদের। তারা কেবল যুদ্ধ করে ইসরায়েলিদের আটকে রাখছিল।
দক্ষিণ সীমান্তে যখন এই প্রতিরোধ চলছিল, তখন ইরান সরাসরি মাঠে নামে তাদের মিত্রকে রক্ষা করতে। দুটি সূত্রের মতে, হিজবুল্লাহ’র সামরিক কাঠামো মূলত ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) আদলে তৈরি। হিজবুল্লাহ’র প্রতিটি কমান্ডারের বিপরীতে একজন করে ইরানি সামরিক উপদেষ্টা বা কাউন্টারপার্ট থাকেন। হিজবুল্লাহ’র বিভিন্ন ইউনিটের প্রধান ও তাদের সহকারীরা যখন নিহত হন, তখন শূন্যস্থান পূরণে ইরানি কর্মকর্তারা সরাসরি লেবাননে চলে আসেন। নাসরুল্লাহর সঙ্গে হামলায় কুদস ফোর্সের লেবানন শাখার প্রধান আব্বাস নিলফোরুশানও নিহত হয়েছিলেন। পরে শূন্যতা পূরণ করতে কুদস ফোর্সের বর্তমান প্রধান ইসমাইল কায়ানি নিজেই লেবাননে আসেন।
হিজবুল্লাহ’র ধারণা, তাদের এই ঘুরে দাঁড়ানো ইসরায়েলকে চমকে দিয়েছিল। যার ফলে শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে বাধ্য হয়। তবে দলটির ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন হিজবুল্লাহকে যুদ্ধক্ষেত্রে না মেরে রাজনৈতিকভাবে ধ্বংস করা সহজ হবে। তিনি লেবাননের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপকে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন, যাতে নিজস্ব সৈন্যদের জীবন ঝুঁকিতে না পড়ে।
সে সময় লেবানন ও দেশের বাইরে একটি সাধারণ ধারণা তৈরি হয়েছিল যে হিজবুল্লাহ’র অবস্থা খুবই নাজুক। তাদের সামরিক শক্তি আগের তুলনায় মাত্র ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। একজন আরব কূটনীতিক জানান, হিজবুল্লাহ’র এই চরম বিপর্যয় দেখে সৌদি আরব অত্যন্ত খুশি হয়েছিল। অন্যদিকে মিসর ও ফ্রান্স হিজবুল্লাহ নেতাদের বোঝানোর চেষ্টা করছিল যে সবচেয়ে বড় সশস্ত্র অ-রাষ্ট্রীয় বাহিনী হিসেবে তাদের দিন শেষ। এবার তাদের সম্মানজনকভাবে মাঠ ছেড়ে দেওয়া উচিত। হিজবুল্লাহ সূত্রগুলোও স্বীকার করে যে সে সময় তারা টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিল এবং বড় ধরনের ছাড় দিতেও প্রস্তুত ছিল।
সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন হিজবুল্লাহ’র জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা ছিল। প্রায় এক দশক ধরে হিজবুল্লাহ সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে রক্ষা করতে গিয়ে অনেক সৈন্য, অর্থ এবং আরব বিশ্বের জনসমর্থন হারিয়েছে। কিন্তু লেবাননে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের দিনই যখন সিরিয়ার বিদ্রোহীরা অতর্কিত হামলা শুরু করে, তখন হিজবুল্লাহ আর আসাদকে বাঁচানোর মতো কোনো শক্তি ছিল না। আসাদের পতন হিজবুল্লাহ শত্রুদের আরও সাহসী করে তোলে।
যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী হিজবুল্লাহ লিতানি নদীর দক্ষিণে সরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন বিভিন্ন দেশ ও লেবাননের অন্য দলগুলো দাবি করতে শুরু করে যে হিজবুল্লাহকে আরও উত্তরে চলে যেতে হবে। শত্রুদের এই অতিরিক্ত চাপ হিজবুল্লাহকে আরও কঠোর হতে বাধ্য করে। এর সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েলি বাহিনী যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে হামলা চালাচ্ছিল, যা দলটিকে আবার অস্ত্র তুলে নিতে উসকানি দেয়।
দলটির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, ‘লেবানন সরকার ও যুক্তরাষ্ট্র হিজবুল্লাহকে মূল ধারায় ফিরিয়ে নেওয়ার একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া করেছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরের পর হিজবুল্লাহ নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিল। এমনকি ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের জুনের যুদ্ধেও হিজবুল্লাহ অংশ নেয়নি।’ কিন্তু একের পর এক ইসরায়েলি হামলা এবং লেবানন সরকারের নিষ্ক্রিয়তা তাদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়। ফলে হিজবুল্লাহ আর নরম সুরে কথা বলার সুযোগ পায়নি।
প্রতিরক্ষা থেকে আক্রমণ: গেরিলা কৌশলে বদল
বাইরে থেকে দেখে মনে হচ্ছিল, ১৫ মাসের যুদ্ধবিরতির সময়ে হিজবুল্লাহ’র সামরিক শাখা পুরোপুরি রক্তশূন্য হয়ে পড়েছে। এই সময়ে ইসরায়েলি বাহিনী প্রায় তিন হাজার বিমান, ড্রোন ও আর্টিলারি হামলা চালায়। ইসরায়েল শুধু মূল কমান্ডারদেরই হত্যা করেনি, তাদের স্থলে যারা দায়িত্ব নিচ্ছিলেন, তাদেরও একে একে নিশানা করতে থাকে।
একই সঙ্গে ইসরায়েলি বাহিনী সীমান্তে তাদের পাঁচটি সামরিক ঘাঁটি আরও শক্তিশালী করে তোলে। সীমান্ত ঘেঁষা শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিটি গ্রাম ও শহর তারা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়। হিজবুল্লাহ’র একটি সূত্র জানায়, ‘সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো এখন ফুটবল মাঠের মতো সমতল হয়ে গেছে। সেখানে কোনো বাড়ি, মসজিদ বা একটি ভবনও দাঁড়িয়ে নেই।’
হিজবুল্লাহ’র নীরবতা দেখে অনেকেই ভেবেছিলেন যে তারা চিরতরে দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু বাস্তবে হিজবুল্লাহ তখন নিঃশব্দে এক বড় ধরনের সামরিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চালাচ্ছিল, যাতে তারা আবারও ইসরায়েলের মুখোমুখি হতে পারে।
দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, হিজবুল্লাহ সামরিক শাখাটি আগে অনেক বড় ও ধীরগতির হয়ে পড়েছিল। যুদ্ধের ধাক্কায় এটি অচল হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। তাই তারা পুরো সামরিক কাঠামোটি ভেঙে ছোট ছোট অংশে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়।
হিজবুল্লাহ’র প্রয়াত কমান্ডার ইমাদ মুঘনিয়ার গেরিলা যুদ্ধের আদর্শ মেনে প্রতিটি ইউনিটকে সম্পূর্ণ স্বাধীন করে দেওয়া হয়। প্রতিটি ইউনিটের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন বা ‘প্লেবুক’ তৈরি করা হয়। এর ফলে যুদ্ধের ময়দানে কেন্দ্রীয় কমান্ডের নির্দেশ ছাড়াই তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করতে পারত। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়, শেষ বুলেট পর্যন্ত যুদ্ধ করার কোনো প্রয়োজন নেই। কৌশলগত কারণে প্রয়োজন হলে পিছু হটে এলাকা ছেড়ে দেওয়ারও স্বাধীনতা দেওয়া হয় তাদের।
লেখক পরিচিতি:
ড্যানিয়েল হিলটন
ড্যানিয়েল হিলটন মিডল ইস্ট আই-এর স্পেশাল করেসপনডেন্ট এবং সংস্থাটির প্রাক্তন হেড অব নিউজ। তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সাংবাদিকতা করেছেন; যার মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে রয়েছে সুদান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন, ইসরায়েল এবং পশ্চিম সাহারা।
অ্যাডাম শামসেদ্দিন
অ্যাডাম শামসেদ্দিন বৈরুতভিত্তিক একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক এবং বাদিল পলিসি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র অ্যাডভাইজার। মিডল ইস্ট আই-এর নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি তিনি পূর্বে ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর হয়ে প্রতিবেদন করেছেন এবং ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এ অবদান রেখেছেন। এছাড়া তিনি লেবাননের আল-জাদিদ টিভির সিনিয়র করেসপনডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন, যেখানে তার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরের দুর্নীতি প্রকাশ করেছিল।
source: Asia Post







