News

ছাড় আদায়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কৌশলগত ছাড় আদায় করতে মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যপথ, নৌপথ ও জ্বালানি অবকাঠামোকে ক্রমেই চাপ সৃষ্টির হাতিয়ারে পরিণত করছে ইরান। তেহরানের লক্ষ্য সরাসরি বড় ধরনের সামরিক বিজয় নয়; বরং সংঘাতের ব্যয় বাড়িয়ে ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে ইরানের দাবি মেনে নেওয়াই তুলনামূলক কম ব্যয়বহুল বলে মনে হবে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের কর্মকর্তাদের ও বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে রয়টার্সের খবরে বলা হয়, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ এড়িয়ে ধাপে ধাপে উত্তেজনা বাড়ানোর একটি কৌশল অনুসরণ করছে তেহরান। এর লক্ষ্য, সংঘাতের পরিধি বাড়ালেও এমন পরিস্থিতি তৈরি না করা, যাতে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বোঝানোই ইরানের উদ্দেশ্য যে, হরমুজ প্রণালি নিয়ে তেহরানের দাবি মেনে নেওয়ার চেয়ে সংকট সামাল দেওয়ার খরচই বেশি হয়ে দাঁড়াবে।

তেহরানের বার্তা হলো, ওয়াশিংটন যদি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের আরও বড় ভূমিকা নিশ্চিত করে এমন নতুন বাস্তবতা মেনে না নেয়, তাহলে সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও জ্বালানি স্থাপনাকে ঝুঁকির মুখে রেখে ভবিষ্যতের যেকোনো আলোচনায় নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে বলেই বিশ্বাস করছে ইরান।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের মাইকেল নাইটস রয়টার্সকে বলেন, “শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় আরও বেশি মাত্রায় উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে ইরান। তারা এমনভাবে পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যাতে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই নতুন কিছু সামনে আনতে পারে— নতুন ভৌগোলিক এলাকা, নতুন ধরনের অস্ত্র কিংবা নতুন ধরনের লক্ষ্যবস্তু।”

তিনি আরও বলেন, “তাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা এই নয় যে তারা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের ক্ষতি করতে পারে। তাদের বড় সুবিধা হলো, তারা আঞ্চলিক দেশগুলো এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষতি করতে পারে।”

হরমুজের বাইরে হুমকি

যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো, সেখানে নৌযান চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা দেখানোর পর তেহরান এখন ইঙ্গিত দিচ্ছে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক নৌপথই তাদের কৌশলের বাইরে নয়।

লোহিত সাগর এবং সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোর প্রতি হুমকি ইঙ্গিত দিচ্ছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য সুরক্ষার ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি ওয়াশিংটন কতটা অস্থিরতা সহ্য করতে পারে, সেটিও যাচাই করছে ইরান।

উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি সূত্রের ভাষ্য, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর কমান্ডারদের মধ্যে এমন বিশ্বাস তৈরি হয়েছে যে, “তারা আরও বেশি কিছু আদায় করতে পারবে।”

তাদের ধারণা, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরেকটি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের গভীরে জড়াতে অনাগ্রহী। সেই সুযোগই কাজে লাগাতে চায় তেহরান।

ওই সূত্রটি বলে, “ইরানিরা বিশ্বাস করে, যুদ্ধের পরিধি বাড়িয়ে এবং চাপ বৃদ্ধি করে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে ছাড় দিতে বাধ্য করা যাবে। ট্রাম্প মনে করেন তিনি ইরানকে কঠোরভাবে আঘাত করে আলোচনার টেবিলে আনতে পারবেন, কিন্তু ইরান নতি স্বীকার করবে না।”

ছাড় আদায়ে উত্তেজনা বৃদ্ধির কৌশল

এই হিসাব-নিকাশই তেহরানের আলোচনার কৌশলের ভিত্তি।

ট্রাম্প বলেছেন, সোমবার ইরানের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা। এর আগে তিনি বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি সমঝোতার আশায় তিনি আসন্ন একটি হামলা স্থগিত করেছিলেন। তবে তেহরান জানিয়েছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো আলোচনা চলছে না।

ইরানের এক জ্যেষ্ঠ সূত্র রয়টার্সকে জানায়, দেশটির নেতৃত্বের মূল্যায়ন হলো, অতীতে নমনীয় অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা কেবল ওয়াশিংটনের চাপই বাড়িয়েছে। তাই অর্থবহ আলোচনায় বসার আগে নিজেদের দর-কষাকষির সক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

ওই সূত্রের ভাষ্য, তেহরানের ধারণা ট্রাম্প যেকোনো ছাড়কে দুর্বলতা হিসেবে দেখেন এবং কেবল চাপের ভাষাই বোঝেন।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল সিং বলেন, তেহরানের বিশ্বাস এখনো পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই তাদের হাতে রয়েছে। এর একটি কারণ হলো, সামরিকভাবে কত দূর পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত, সে বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট নয়।

তিনি বলেন, “ইরানিরা তাদের বর্তমান সুবিধাজনক অবস্থান কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। তারা হরমুজ প্রণালির ওপর সার্বভৌম কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে এবং জলপথটির ওপর বাছাই করে নিয়ন্ত্রণ প্রয়োগ করতে আগ্রহী।”

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক কূটনীতিক ও ইরান বিশেষজ্ঞ অ্যালান আইর বলেন, তেহরান এমন একটি প্রতিরোধমূলক কৌশল অনুসরণ করছে, যার লক্ষ্য ওয়াশিংটনকে অবরোধ প্রত্যাহার এবং সামরিক হামলা বন্ধ করতে বাধ্য করা। তার ভাষায়, “তারা চায় না যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতির গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করুক।”

বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা। আঞ্চলিক সূত্রগুলোর মতে, ওমান উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থনে প্রণালিটি পরিচালনার একটি প্রস্তাব ইরানের কাছে দিয়েছে। এতে ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে স্বেচ্ছাভিত্তিক ফি নেওয়ার বিষয়ও রয়েছে।

তবে তেহরান প্রণালিটির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ এবং সেখানে চলাচলকারী জাহাজ থেকে সেবা ফি আদায়ের ক্ষমতা চাইছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন যেকোনো ধরনের ফি আরোপের বিরোধিতা করে বলছে, হরমুজ একটি আন্তর্জাতিক নৌপথ হিসেবেই থাকতে হবে এবং এর ওপর ইরানের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত নয়।

দীর্ঘস্থায়ী চাপের কৌশল

ইরানের এই কৌশলের একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। হরমুজের বাইরে হুমকি ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক ও পশ্চিমা দেশগুলো এখন ইরানের ওপর আরও চাপ বাড়ানোর বদলে বাণিজ্যপথ ও জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।

সৌদি আরবের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নতুন সামুদ্রিক জোট তারই একটি উদাহরণ। উপসাগরীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য, এই জোটের মূল লক্ষ্য বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দেওয়া, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং নৌপথ সুরক্ষিত রাখা; ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো নয়।

মাইকেল নাইটস এই উদ্যোগের সঙ্গে লোহিত সাগরে ইউরোপীয় ‘অ্যাসপিডিস’ মিশনের তুলনা করেন। তার মতে, ওই মিশনের উদ্দেশ্যও ছিল সামরিক ভারসাম্য বদলে দেওয়া নয়, বরং বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা।

তেহরানের দৃষ্টিতে এটি তাদের কৌশলের একটি সাফল্য। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির সঙ্গে সরাসরি পাল্লা দিতে না পারলেও বিভিন্ন সরকার ও নৌবাহিনীকে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান নিতে বাধ্য করে তারা সংঘাতের খরচ বাড়াতে সক্ষম হচ্ছে।

হরমুজ, লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্তকারী বাব আল-মান্দেব প্রণালি কিংবা অন্য যেকোনো স্থানে নতুন করে হুমকি তৈরি হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য সচল রাখতে আরও বেশি সম্পদ ও সক্ষমতা ব্যয় করতে হচ্ছে।

মূলত এটি সহনশীলতার লড়াই। ইরানি নেতারা মনে করছেন, তারা যত দিন অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করতে পারবেন, তার চেয়ে কম সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটের জন্য বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে বারবার সৃষ্ট বিঘ্ন সহ্য করা কঠিন হয়ে উঠবে।

এই কৌশলের আরেকটি কূটনৈতিক লক্ষ্যও রয়েছে। প্রয়োজন হলে সংকটের পরিধি আরও বাড়ানোর সক্ষমতা দেখিয়ে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য যেকোনো আলোচনার শর্ত নিজেরাই নির্ধারণ করতে চায় তেহরান।

কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের রে তাকেইহ, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে ইরানবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টাও ছিলেন, বলেন, “যদি আলোচনা হয়, তাহলে তার শর্ত তারাই নির্ধারণ করতে চাইবে। উভয় পক্ষই একে অপরের উত্তেজনা বৃদ্ধির জবাবে আরও উত্তেজনা বাড়াচ্ছে।”

তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই পিছু হটার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। ওয়াশিংটন ও তেহরান যখন একে অপরের দৃঢ়তা পরীক্ষা করে চলেছে, তখন দর-কষাকষির অবস্থান শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে নেওয়া এই কৌশল শেষ পর্যন্ত এমন এক সংঘাতে রূপ নিতে পারে, যা কোনো পক্ষেরই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।

source: Rajneete

আরো দেখুন
Close
Back to top button