ইসরায়েলে ভোট— গাজার দুর্ভোগই যে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীদের হাতিয়ার

ইসরায়েলে ভোটের প্রস্তুতি চলছে। আর সীমান্তের ওপারে গাজার বাসিন্দারা অপেক্ষা করছেন এমন এক নির্বাচনি ফলাফলের জন্য, যা তাদের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। প্রায় তিন বছর ধরে চলা যুদ্ধে গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, নিহত হয়েছেন প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ। বাস্তুচ্যুত প্রায় ১০ লাখ ফিলিস্তিনি এখন তীব্র পানি ও স্যানিটেশন সংকটের মধ্যে বাস করছেন। পাশাপাশি রয়েছে নতুন করে ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কা।
কিন্তু ইসরায়েলের নির্বাচনি প্রচারে গাজার এই মানবিক বিপর্যয় প্রায় অনুপস্থিত। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি জোট এবং তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকটের বিরোধী দল ইয়াশার— দুই পক্ষই ৭ অক্টোবরের হামলার পর হামাসকে ধ্বংস করার লক্ষ্যকে সামনে রেখেছে।
হামলার পর ইসরায়েলি সমাজে তৈরি হওয়া নিরাপত্তা ও ক্ষতবোধও প্রচারের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে। কিন্তু সীমান্তের ওপারে যে মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে দুই পক্ষেরই স্পষ্ট রাজনৈতিক পরিকল্পনা নেই।
রাফাহর ৪৭ বছর বয়সী সামি আবু রুমি বাস্তুচ্যুত হয়ে এখন বসবাস করছেন খান ইউনিসের আল-মাওয়াসিতে। তার প্রত্যাশা, ইসরায়েলে এমন একটি সরকার ক্ষমতায় আসবে যারা হত্যা, বাস্তুচ্যুতি ও ফিলিস্তিনিদের নিশ্চিহ্ন করার পথে কম আগ্রহী হবে। তবে তার চোখে ইসরায়েলের সরকারগুলোর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য খুব বেশি নেই।
আবু রুমি বলেন, ‘আমরা আশা করি এমন সরকার আসবে, যে হত্যা ও বাস্তুচ্যুতির দিকে কম ঝুঁকবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলে যারাই সরকারে আসুক, তা,রে সবার চিন্তাভাবনা আমাদের কাছে অনেকটা একই মনে হয়।’
নেতানিয়াহু ও আইজেনকট— দুজনই হামাসের শাসনের অবসান চান এবং দুজনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিতর্কিত শান্তি পরিকল্পনাকে সমর্থন করেন। ফলে আইজেনকটকে নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে দেখা হলেও গাজার বাসিন্দাদের কাছে তিনি যুদ্ধবিরোধী প্রার্থী নন।
-aeb88d.jpg)
সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকট ২০০৬ সালের হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কমান্ডার ছিলেন। গাজায় লড়াই করতে গিয়ে তার ছেলে ও দুই ভাতিজা নিহত হয়েছেন। পরে তিনি ‘দাহিয়া ডকট্রিন’-এর পক্ষে অবস্থান নেন, যেখানে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি থাকা বেসামরিক এলাকায় ব্যাপক ও অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের কথা বলা হয়।
সমালোচকদের অভিযোগ, গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পরবর্তী সময়ে এই নীতিরই প্রয়োগ হয়েছে এবং তা যুদ্ধাপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে।
আবু রুমি বলেন, আইজেনকট হামাসকে পরাজিত করার কথা বলেন, আর নেতানিয়াহু সামরিক অভিযান ও ফিলিস্তিনিদের হত্যাকে নিজের রাজনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন। দুইয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখতে পান না তিনি।
আবু রুমি বলেন, এখানকার পরিবারগুলো সন্তানদের খাবার জোগানো, স্কুলে রাখা এবং চিকিৎসার ব্যবস্থা করতেই হিমশিম খাচ্ছে। বাড়িঘর ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় বেঁচে থাকাটাই এখন প্রতিদিনের সংগ্রাম। আর ওখানে গাজার দুর্ভোগ নির্বাচনি প্রচারের হাতিয়ার হয়ে গেছে।
ইসরায়েলের আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট পার্টি অবশ্য প্রচারে গাজার চিত্র তুলে ধরেছে। চলতি সপ্তাহে দলটি ৪৮ সেকেন্ডের একটি নির্বাচনি ভিডিও প্রকাশ করে, যেখানে ড্রোনে ধারণ করা গাজার ধ্বংসস্তূপের দৃশ্য দেখানো হয়। ভিডিওতে বলা হয়, এমনভাবে আচরণ করা হচ্ছে যেন সেখানে কিছুই ঘটেনি— যেন হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়নি, যেন পুরো শহর ধ্বংস হয়ে বিরানভূমিতে পরিণত হয়নি।
দলটি ঘোষণা করেছে, তারা ‘নীরব থাকবে না’। অন্য দলগুলো যেখানে আরও ধ্বংস চায়, সেখানে তারা ‘জীবনের পক্ষে’ অবস্থান করছে বলে দাবি করেছে।
তবে আইজেনকটের নেতৃত্বে কোনো সরকার গঠিত হলে আরব দলগুলোর সেই সরকারে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তারা বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে। কিন্তু গাজার মানুষের মধ্যে এ নিয়ে আশাবাদও নেই।
বেইত লাহিয়ার ৪৫ বছর বয়সী হানিন হামদুনাও বাস্তুচ্যুত হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন আল-মাওয়াসিতে। নেতানিয়াহু, আইজেনকট কিংবা অন্য কেউ ক্ষমতায় এলেও গাজার মানুষের জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না।
হানিন হামদুনা বলেন, ‘বছরের পর বছর আমরা ভেবেছি, নতুন সরকার আগেরটির চেয়ে ভালো হবে। পরে দেখা গেছে, সেটি আরও খারাপ হয়েছে।’ তার আশঙ্কা, হয়তো গাজায় দিনে ১০০টির বদলে ২০০ ট্রাক ঢুকতে দেওয়া হবে, কিন্তু তাতে মানুষের জীবনে প্রকৃত পরিবর্তন আসবে না।
-14af3b.jpg)
এদিকে ইসরায়েলের নির্বাচনের চেয়ে গাজার মানুষের কাছে এখন বড় চিন্তা খাবার ও পানি। বাজারে তাজা খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট বাড়ছে। বাসিন্দাদের দাবি, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বাণিজ্যিক পণ্যবাহী ট্রাকের প্রবেশ বন্ধ থাকায় দাম বেড়ে গেছে। ময়দার দাম আগের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি হয়েছে। একই সময়ে মানবিক সহায়তা কমে যাওয়ায় নতুন করে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তারপরও গাজার কিছু মানুষ ইসরায়েলের নির্বাচন গভীরভাবে অনুসরণ করছেন। তাদের আগ্রহ পরিবর্তনের আশায় নয়, বরং কে ক্ষমতায় আসছেন এবং তার ফল কী হতে পারে— এই আশঙ্কায়।
৪৩ বছর বয়সী করিম মারিশ জানান, কয়েক দিনের মধ্যে তার এক বন্ধুর ছেলের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইসরায়েলের নির্বাচন পর্যন্ত বিয়ে পিছিয়ে দিয়েছেন তিনি। তার ভয়, কট্টর ডানপন্থি সরকার আবার ক্ষমতায় এলে যুদ্ধ শুরু হতে পারে এবং তাকে ফের পালিয়ে যেতে হতে পারে। এতে তিনি হারাতে পারেন নিজের তাবু এবং অনেক কষ্টে জোগাড় করা বিয়ের সামগ্রীও।
তিন বছরের যুদ্ধ গাজার পুরো জনপদ জুড়ে ধ্বংসের চিহ্ন রেখে গেছে। বাড়িঘর ভেঙে পড়েছে, কোথাও শুধু কংক্রিটের ধ্বংসাবশেষ, কোথাও বোমার গর্ত। খাদ্য ও মানবিক সহায়তার ওপর ইসরায়েলি বিধিনিষেধকে ফিলিস্তিনিরা যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে দেখছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর গাজায় ২০ হাজারের বেশি শিশু নিহত হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গাজা শহরের ২০ বছর বয়সী নূর আল-মোগান্নি বলছেন, তারা এখন আর তাদের দুর্ভোগ দূর করার প্রতিশ্রুতিগুলো বিশ্বাস করতে পারেন না। তিনি বলেন, ‘নেতানিয়াহু জিতুন বা হারুন, এখানকার বাস্তবতা বদলাবে না। আমার মনে হয়, গাজাকে এবং এখানে মানুষের বেঁচে থাকার ভিত্তিগুলো ধ্বংস করাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য।’
ইসরায়েলের নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হবেন, তা হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হবে। কিন্তু গাজার মানুষের কাছে প্রশ্নটি শুধু কে প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন, তা নয়। তাদের কাছে আসল প্রশ্ন— নতুন সরকার কি যুদ্ধ, ধ্বংস ও বাস্তুচ্যুতির পথ থেকে সরে আসবে, নাকি গাজার দুর্ভোগই আবারও ইসরায়েলি রাজনীতির নির্বাচনি হাতিয়ার হয়ে থাকবে?
দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে
source: Rajneete







