News

সার্বিয়ায় ভুচিচকে হারিয়ে শিক্ষার্থীদের জোটের জয়, নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা

সার্বিয়ার আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনে দীর্ঘদিনের শাসক আলেকসান্দার ভুচিচের দলকে হারিয়ে জয় পেয়েছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক জোট ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’। দুর্নীতি ও সরকারের কর্তৃত্ববাদী আচরণের বিরুদ্ধে আন্দোলন থেকে উঠে আসা জোটটির এ জয় দেশটির রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে নির্বাচনে জয়ী হলেও নতুন নেতৃত্ব কীভাবে সরকার পরিচালনা করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, প্রায় ৬০ লাখ মানুষের দেশ সার্বিয়ায় প্রায় ৯৯ শতাংশ ভোট গণনা শেষে শিক্ষার্থীদের প্রার্থীরা পেয়েছেন ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে ভুচিচের সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির (এসএনএস) নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৩৯ দশমিক ২ শতাংশ। এতে ২৫০ আসনের পার্লামেন্টে শিক্ষার্থীদের জোট ১৩৯টি এবং এসএনএস জোট ৯৭টি আসন পেয়েছে। বাকি আসনগুলো গেছে সংখ্যালঘুদের দলগুলোর হাতে।

এদিকে রোববার (২৫ অক্টোবর) রাতে টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে পরাজয় স্বীকার করেন ভুচিচ। তিনি বলেন, “এটি পরিষ্কার যে আমরা নির্বাচনে হেরে গেছি, স্টুডেন্ট লিস্ট জয় পেয়েছে।”

তার এ ঘোষণার পর রাজধানী বেলগ্রেডসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে রাস্তায় নেমে আসেন হাজারো মানুষ। গাড়ির হর্ন বাজিয়ে, নেচে-গেয়ে ও স্লোগান দিয়ে তারা জয় উদ্‌যাপন করেন। বেলগ্রেডের প্রধান সড়কগুলোতে মানুষের ঢল নামে। শিক্ষার্থীদের মুখে শোনা যায় ‘জয়’ ও ‘তার কাজ শেষ’ স্লোগান।

নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও ক্ষমতাসীন সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির (এসএনএস) প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী আলেকসান্দার ভুচিচ। ২৫ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও ক্ষমতাসীন সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির (এসএনএস) প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী আলেকসান্দার ভুচিচ। ২৫ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

বেলগ্রেডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মারিয়ানা রাদোভানোভিচ পাজোভিচ বলেন, “আমি ভেবেছিলাম এটা অবিশ্বাস্য, এখনো তা-ই মনে হচ্ছে। আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না। সময়টা অনেক দীর্ঘ ছিল, আর (ভুচিচ) দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছিলেন।”

২০১৪ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রেসিডেন্ট হিসেবে সার্বিয়ার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন জনতুষ্টিবাদী জাতীয়তাবাদী নেতা ভুচিচ। তবে দুর্নীতি ও সরকারের কর্তৃত্ববাদী আচরণের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন তার দীর্ঘদিনের শাসনকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।

রেলস্টেশনের দুর্ঘটনা থেকে আন্দোলনের বিস্তার

২০২৪ সালে সার্বিয়ার নভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন। এ দুর্ঘটনার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতিকে দায়ী করে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। টানা প্রায় দুই বছরের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে ভুচিচের পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে।

পার্লামেন্ট ভবনের সামনে উল্লাস করেন ‘স্টুডেন্ট লিস্ট-স্টুডেন্টস উইন’ জোটের সমর্থকরা। এ সময় এক ব্যক্তিকে ভুচিচের ছবিকে পা দিয়ে মাড়াতে দেখা যায়। ২৬ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
পার্লামেন্ট ভবনের সামনে উল্লাস করেন ‘স্টুডেন্ট লিস্ট-স্টুডেন্টস উইন’ জোটের সমর্থকরা। এ সময় এক ব্যক্তিকে ভুচিচের ছবিকে পা দিয়ে মাড়াতে দেখা যায়। ২৬ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

এ পরিস্থিতিতে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্টের পদ ছাড়তে বাধ্য হন ভুচিচ। একই সঙ্গে আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হয়। সেই নির্বাচনেই শিক্ষার্থীদের সমর্থনপুষ্ট প্রার্থীদের জোট বড় জয় পেল।

রয়টার্স লিখেছে, এ ফল সার্বিয়ার রাজনীতিতে গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একই সঙ্গে এটি এপ্রিলে হাঙ্গেরির দীর্ঘদিনের নেতা ভিক্টর অরবানের পরাজয়ের কথাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শিক্ষার মান ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে সার্বিয়ার এ জয় নতুন অনুপ্রেরণা হয়ে উঠতে পারে।

নতুন নেতৃত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা

নির্বাচনে বড় জয় পেলেও স্টুডেন্ট লিস্টের নেতৃত্বে কারা সরকার পরিচালনা করবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়। জোটটির প্রার্থী তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, অভিনেতা ও কৃষকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছেন। তবে জোটটির নির্দিষ্ট কোনো নেতা নেই। প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে কাদের নিয়োগ দেওয়া হবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

জোটটির ঘোষিত লক্ষ্য দুর্নীতি দমন ও শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন। বীমা খাতের ৬০ বছর বয়সী কর্মী স্বেতলানা কারাগকোজিদু বলেন, “এই দুর্নীতি আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ঢুকে পড়েছে…অবশ্যই এর পরিবর্তন হবে, আমরা আশা করছি ধীরে ধীরে আমরা একটি স্বাভাবিক সমাজের দিকে এগিয়ে যাব।”

প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী আলেকসান্দার ভুচিচের পরাজয় স্বীকার করার পর উল্লাস করেন ‘স্টুডেন্ট লিস্ট-স্টুডেন্টস উইন’ নির্বাচনি জোটের সমর্থকরা। ২৬ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স
প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী আলেকসান্দার ভুচিচের পরাজয় স্বীকার করার পর উল্লাস করেন ‘স্টুডেন্ট লিস্ট-স্টুডেন্টস উইন’ নির্বাচনি জোটের সমর্থকরা। ২৬ অক্টোবর ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

শিক্ষার্থীদের জোটের প্রার্থী তালিকায় উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ ইলিয়া স্রদানভিচ, সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নর দেজান শোশকিচ এবং বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাদোমির সাইচিচ। নির্বাচনে জয়ের পর শিক্ষার্থীদের পক্ষে বক্তব্য দেন সাইচিচ।

সাইচিচ বলেন, “প্রিয় সার্বিয়া, আজ রাতে জনগণের কণ্ঠস্বর শোনা গেছে। আজ রাতে আমরা জয় উদযাপন করব, আগামীকাল আমরা ভবিষ্যৎ গড়ব।”

তবে নির্বাচনের ফল নিয়ে সবার মধ্যে স্বস্তি নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ৬০ বছর বয়সী সেনকা রাদাকোভিচ বলেন, “দেশকে এভাবে হঠাৎ করে, একসঙ্গে বদলে ফেলা আমার পছন্দ নয়। আমি জানি না এর পেছনে কারা আছে, ওই মানুষগুলো কারা, কারা দেশ পরিচালনা করবেন।”

এদিকে শিক্ষার্থীদের জোটের বিজয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারা ও কর্মকর্তারা। এখন দুর্নীতি দমন, শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নির্বাচনে পাওয়া জনসমর্থনকে কার্যকর সরকার পরিচালনায় কাজে লাগানোই নতুন নেতৃত্বের বড় চ্যালেঞ্জ।

source: Rajneete

আরো দেখুন
Close
Back to top button