১০ মাস পর ভেনেজুয়েলায় মাচাদো, কারাকাসে সমর্থকদের ঢল

প্রায় এক বছর দেশের বাইরে থাকার পর ভেনেজুয়েলায় ফিরেছেন বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। রোববার রাতে রাজধানী কারাকাসে পৌঁছালে হাজারো সমর্থক উল্লাস ও করতালির মধ্য দিয়ে তাকে স্বাগত জানান। এর আগে কয়েকবার দেশে ফেরার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিলেন তিনি। তার প্রত্যাবর্তন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনও সামনে এসেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়, রোববার (২৫ অক্টোবর) রাতে গাড়িতে করে কারাকাসে প্রবেশের সময় মাচাদোকে স্বাগত জানাতে সড়কে জড়ো হন বিপুলসংখ্যক সমর্থক। গাড়ির ছাদ থেকে মাথা বের করে তাদের সঙ্গে হাত মেলান ও আলিঙ্গন করেন তিনি। রাজধানীতে প্রবেশের সময় মাচাদো বলেন, ‘এই দেশ সবাইকে শিক্ষা দিচ্ছে।’
২০২৪ সালের নির্বাচনে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেননি মাচাদো। বিতর্কিত ওই নির্বাচনের পরের বছরটির বেশির ভাগ সময় আত্মগোপনে কাটান তিনি। গত ১০ মাস ছিলেন দেশের বাইরে। শান্তিতে নোবেলজয়ী এই নেত্রী রোববার সকালে ভেনেজুয়েলার পশ্চিমাঞ্চলীয় লারা রাজ্যের একটি গির্জায় যান। পরে সেখান থেকে গাড়িতে করে রওনা হলে স্থানীয় লোকজন জাতীয় সংগীত গেয়ে ও ‘স্বাধীনতা’ স্লোগান দিয়ে তাকে স্বাগত জানান।
-031569.jpg)
সমর্থকদের ভিড়ের কারণে লারা রাজ্য থেকে রাজধানী কারাকাসে পৌঁছাতে মাচাদোর প্রায় আট ঘণ্টা লাগে। পথে সমর্থকদের দেওয়া জপমালা গলায় পরেন তিনি। রাজধানীর কাছাকাছি পৌঁছালে উল্লাসরত মানুষের ভিড়ে মহাসড়কে যান চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাচাদো লেখেন, ‘প্রতিটি পরিবারের পুনর্মিলন, প্রত্যেক রাজনৈতিক বন্দির মুক্তি এবং ভেনেজুয়েলার স্বাধীনতার জন্য।’
দেশে ফেরার অনুমতি নিয়ে বিতর্ক
মাচাদোর যাতায়াতের বিষয়ে সরাসরি অবগত এক ব্যক্তির বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, পানামা ও কলম্বিয়া সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে তার দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়। ওই ব্যক্তির দাবি, মাচাদোর ফেরার অনুমতি দিয়েছিলেন ট্রাম্প এবং পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাকে অবহিত রাখা হয়েছিল।
তবে রোববার হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, মাচাদোর দেশে ফেরার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দেন তিনি।
-41956c.jpg)
মাচাদো সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি খুব ভালো একজন নারী। তবে আমরা ভেনেজুয়েলায় খুব ভালো করছি।’ তবে এ বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি হোয়াইট হাউজ ও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।
মাচাদোর দেশে ফেরার উদ্যোগ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তার সম্পর্কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে আটক করে বিচারের জন্য নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়ার আগেই ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন মাচাদো।
অন্যদিকে মাদুরোর সাবেক উপপ্রধান রদ্রিগেজের প্রতি বারবার সমর্থন জানিয়েছেন ট্রাম্প। ভেনেজুয়েলায় তেল উৎপাদনসহ বিভিন্ন ব্যবসায় মার্কিন কোম্পানিগুলোর চুক্তিরও প্রশংসা করেছেন তিনি। গত সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প বলেছিলেন, দেশটিতে গণতান্ত্রিক নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টি বিবেচনা করার সময় এখনো আসেনি।
গত জুনে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মাচাদোকে অন্তত একবার দেশে ফেরার পরিকল্পনা পিছিয়ে দিতে বলেছিলেন মার্কিন কর্মকর্তারা। এর আগে কয়েকবার দেশে ফেরার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন তিনি। এবার কীভাবে দেশে ফিরেছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি তার দল।
মাচাদোর সফর সম্পর্কে অবগত চার ব্যক্তির বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, তিনি ব্যক্তিগত বিমানে পানামা থেকে কলম্বিয়ায় যান। পরে রোববার স্থলপথে সীমান্ত পেরিয়ে ভেনেজুয়েলায় প্রবেশ করেন। তার যাতায়াত সম্পর্কে অবগত আরেক ব্যক্তি জানান, গত সপ্তাহের শেষ দিকে ওই বিমানযাত্রা হয় এবং পুরো যাত্রায় মার্কিন নিরাপত্তা ঠিকাদারেরা তাকে পাহারা দেন। মাচাদোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত না করতে বা তার কাজে বাধা না দিতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ ও দেশটির কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিল বলেও জানান তিনি।
রোববার এক বিবৃতিতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ‘মাচাদোর নিরাপদে ভেনেজুয়েলায় ফেরার অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে চলা সমঝোতা আলোচনার সরাসরি ফল হিসেবে। এসব আলোচনার মধ্য দিয়ে ইতিমধ্যে শত শত রাজনৈতিক বন্দি মুক্তি পেয়েছেন এবং বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের শত শত নেতা নির্বাসন থেকে দেশে ফিরেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করি, সব রাজনৈতিক পক্ষ এসব আলোচনায় সমর্থন দেবে। গত ৩০ বছরের মধ্যে শান্তিপূর্ণভাবে শুধু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নয়, বরং একটি টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় সুযোগ এনে দিয়েছে এই আলোচনা।’
চলতি মাসে বিরোধী দলের একটি অংশ ও অন্তর্বর্তী সরকার কয়েক দফা আলোচনায় বসেছে। ভবিষ্যতে নির্বাচন আয়োজনের আগে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত ও নির্বাচন পরিষদ পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো এসব আলোচনার লক্ষ্য। তবে মাচাদোর রাজনৈতিক আন্দোলন এতে অংশ নেয়নি।
মাচাদোর দেশে ফেরার বিষয়ে মন্তব্য জানতে ভেনেজুয়েলার সরকারের পক্ষে সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার দায়িত্বে থাকা যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
পথে পথে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস
লারা রাজ্যের বারকিসিমেতো শহরে মাচাদোকে স্বাগত জানাতে জড়ো হয়েছিলেন ৬৯ বছর বয়সী হারনান আদামেস। তিনি বলেন, ‘মারিয়া কোরিনা মাচাদো ভেনেজুয়েলায় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন।’
রাজধানীর কাছাকাছি আরাগুয়া রাজ্যের মহাসড়কের একটি স্থানে মাচাদোর জন্য অপেক্ষা করছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মী ৬১ বছর বয়সী জুলেইমা গ্রানাদিয়ো।
তিনি বলেন, ‘মাচাদোর আগমনের অর্থ কী? আমাদের সামনে সব পথ খুলে যাচ্ছে, ভবিষ্যতের পথ খুলছে। আমরা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি এবং শেষ পর্যন্ত এগিয়ে যাব।’ গ্রানাদিয়ো আরও বলেন, ‘আমাদের নেত্রীর আগমনের মধ্য দিয়ে এই স্বৈরশাসনের অবসান হয়ে গেছে।’
মাচাদোর পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান উপদেষ্টা ডেভিড স্মোলানস্কি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, দেশে ফেরার পর জুনে ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা প্রাণঘাতী ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা রয়েছে মাচাদোর। এ ছাড়া রাজনৈতিক বন্দিদের পরিবারের সদস্য, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং দেশটির গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনের বিভিন্ন নেতার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন তিনি।
স্মোলানস্কি বলেন, ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণে তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করবেন।’
গত মাসে ভেনেজুয়েলায় প্রকল্প সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কয়েকটি আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানি। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট রদ্রিগেজ ও মার্কিন জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটের উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠানে এ-সংক্রান্ত চুক্তি সই হয়।
মাচাদো বলেছেন, বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে কেবল একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক সরকার’।
মাদুরো সরকারের আমলে মাচাদোর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে এক বছরের বেশি সময় মূলত আত্মগোপনে থাকার পর ২০২৫ সালের শেষ দিকে গোপনে দেশ ছাড়েন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল শান্তিতে নোবেল পুরস্কার গ্রহণ করা।
এদিকে বিদেশে থাকা ভেনেজুয়েলার নাগরিকদের ভোটার নিবন্ধনের তথ্য সংগ্রহ করতে শনিবার একটি অ্যাপ চালু করেছে মাচাদোর রাজনৈতিক আন্দোলন ভেন্তে ভেনেজুয়েলা। গত ১৮ মাসে সংগঠনটির ১৫ জন কর্মী মিলে অ্যাপটি তৈরি করেছেন। তাদের আশা, ভবিষ্যতে অ্যাপের মাধ্যমে সংগ্রহ করা তথ্য সংস্কার করা নির্বাচন পরিষদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা যাবে। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
মাচাদোর রাজনৈতিক আন্দোলনের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী এদমুন্দো গঞ্জালেস বর্তমানে স্পেনে বসবাস করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি জানিয়েছেন, শিগগিরই ভেনেজুয়েলায় মাচাদোর সঙ্গে যোগ দেবেন তিনি।
source: Rajneete







