News

ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়, নির্বাচনের আগে চাপে রিপাবলিকানরা

যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত রিপাবলিকান পার্টির জন্য ততই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং ব্যাপক শুল্ক আরোপের প্রভাবে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় চাপে পড়েছেন সাধারণ মার্কিন নাগরিকরা।

শনিবার (২৪ অক্টোবর) রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ভোটারদের দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর ট্রাম্পের এসব নীতির প্রভাব নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এমনকি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাও দলটির জন্য কঠিন হতে পারে।

চলতি মাসের শুরুতে রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৭৮ শতাংশ মানুষ মনে করেন, তাদের আয় যে হারে বাড়ছে, তার চেয়ে দ্রুত পণ্যের দাম বাড়ার জন্য ট্রাম্পের নীতিই দায়ী।

২০০৬ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। ওই বছর প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের নেতৃত্বাধীন রিপাবলিকানরা ইরাক যুদ্ধ নিয়ে জনরোষের মুখে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিলেন।

রয়টার্স লিখেছে, এবারও ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির কারণে রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। জনমত জরিপগুলো বলছে, দুই দশক আগের তুলনায় এবার জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের চাপ ভোটাররা আরও তীব্রভাবে অনুভব করছেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের জ্যেষ্ঠ ফেলো ক্রিস্টোফার প্রেবল বলেন, “মূল কথা হলো, মানুষ ট্রাম্পের যুদ্ধ ও অন্যান্য নীতির প্রভাব অনুভব করছেন। এখন এসব বিষয় তিনি যেভাবে সামলাচ্ছেন, তার প্রতি অসন্তোষ জানানোর সুযোগ ভোটারদের সামনে রয়েছে।”

পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব ফেলছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি

জনপ্রিয়তা কমতে থাকায় ট্রাম্পের বক্তব্য ও পদক্ষেপে দেখা যাচ্ছে, পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সম্পর্ককে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন। প্রকাশ্যে ভিন্ন অবস্থান নিলেও নির্বাচনের আগে তার কিছু সিদ্ধান্তে এর প্রতিফলন রয়েছে।

জ্বালানির দাম কমানোর লক্ষ্যে রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন কয়েকজন রিপাবলিকানও। তাদের আশঙ্কা, এতে ইউক্রেন যুদ্ধে ট্রাম্প ক্রমেই মস্কোর পক্ষ নিচ্ছেন— এমন ধারণা আরও জোরালো হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রলের উচ্চমূল্যের দায় অন্যদের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেছেন ট্রাম্প। এ জন্য ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করার চাপও দিয়েছেন তিনি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রধান কারণ প্রায় আট মাস আগে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের শুরু করা যুদ্ধ।

নির্বাচনের আগে ইরানে নতুন করে হামলার নির্দেশ না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের পর সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জনমত জরিপে দেখা গেছে, ট্রাম্পের শুরু করা যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন অধিকাংশ ভোটার। অথচ নির্বাচনি প্রচারে তিনি বিদেশে নতুন সামরিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ট্রাম্পের যুক্তি, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখতে হলে মার্কিন নাগরিকদের সাময়িকভাবে বেশি দামে পেট্রল কেনার বিষয়টি মেনে নিতে হবে।

তবে ইরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে। জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ও যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, তেহরান ২০০৩ সালে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছিল।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, কানাডার সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ এবং ইউক্রেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন রিপাবলিকান দলের কয়েকজন প্রার্থীও।

এদিকে ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তেলের দাম উঁচু রাখা এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল করার লক্ষ্যে তেহরান নতুন কৌশল নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার নতুন পদ্ধতি ব্যবহার এবং কূটনৈতিক অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান সমর্থন করে হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র ম্যাট মিডলটন বলেন, “ইরান সংঘাতের কারণে বাজারে সাময়িক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, সে বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব সময়ই স্পষ্ট ছিলেন। তবে অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রেকর্ডের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের বিপর্যয়কর বিকল্পের পার্থক্য স্পষ্ট।”

ভোটারদের কাছে অর্থনীতিই প্রধান বিবেচনা

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সাধারণত ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন হিসেবে দেখা হয়। কয়েক দশকের নির্বাচনি অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ভোটারদের সিদ্ধান্তে অর্থনীতি বড় ভূমিকা রাখে। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমলে জনপ্রিয় হওয়া একটি রাজনৈতিক বাক্যেও বিষয়টি উঠে এসেছে: ‘এটা অর্থনীতির বিষয়, বোকা।’

রয়টার্স/ইপসোসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ভোটারদের অগ্রাধিকারের তালিকায় পররাষ্ট্রনীতি তুলনামূলক নিচের দিকে থাকলেও ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ ও শুল্কনীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে বলে মনে করেন অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক। অন্যান্য জরিপেও আন্তর্জাতিক বিষয়ে ট্রাম্পের সামগ্রিক নীতির প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সমর্থন কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে।

শিকাগো কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের সাম্প্রতিক এক জাতীয় জরিপে বলা হয়েছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুর্বল হয়েছে। একই সঙ্গে এসব নীতি দেশের অর্থনীতি ও পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির ক্ষতি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গত বছর দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফেরার পর ট্রাম্প দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন। এর পাশাপাশি মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও আরও স্পষ্ট হয়েছে।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর শঙ্কা রিপাবলিকানদের

এ পরিস্থিতিতে আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। কংগ্রেসের যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ দুই বছরে তার রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন জটিল হয়ে পড়তে পারে।

তবে নির্বাচনে কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে গেলেও ট্রাম্প নিজের মতো করে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে চাইলে আইনপ্রণেতাদের পক্ষে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হতে পারে।

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর বড় প্রশ্ন হবে, রাজনৈতিক ফলাফল ট্রাম্পকে আন্তর্জাতিক বিষয়ে আরও সতর্ক করবে, নাকি আরও আগ্রাসী পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করবে। এরপর প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করবেন, যাকে সাধারণত ‘লেম ডাক’ বা ক্ষমতার শেষ পর্যায় বলা হয়। এ সময়ে প্রেসিডেন্টের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ থাকে না এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনে জবাবদিহির চাপও তুলনামূলক কম থাকে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জন অল্টারম্যান বলেন, “দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিকভাবে চাপে থাকা অনেক প্রেসিডেন্টের জন্য পররাষ্ট্রনীতি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে তারা তুলনামূলক স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন।”

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান, রাশিয়া, চীন ও কিউবার মতো প্রতিপক্ষের বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান এবং বিভিন্ন মিত্রদেশের সঙ্গে তার আচরণে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এর বিপরীতে আন্তর্জাতিক বিষয়ে আগ্রহ কমিয়ে হোয়াইট হাউজে বলরুম নির্মাণের মতো নিজস্ব নির্মাণ প্রকল্পে আরও বেশি মনোযোগীও হতে পারেন তিনি।

source: Rajneete

Back to top button