‘শত্রু’ জিনপিংয়ের জন্য কেন লালগালিচা ট্রাম্পের?

একসময় চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও মধ্যবিত্তের জন্য ‘বড় হুমকি’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, রীতিমতো শত্রুজ্ঞান করেছেন। চীনের কারণে মার্কিন কারখানা বন্ধ হয়েছে, কর্মসংস্থান কমেছে— এমন অভিযোগ তুলে ২০১৬ সালের নির্বাচনি প্রচারে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। অথচ সেই ট্রাম্পই এখন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ‘দারুণ ভদ্রলোক’ বলে প্রশংসা করছেন। শুধু তাই নয়, হোয়াইট হাউজে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজেও জিনপিংকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত তিনি।
ট্রাম্পের এই পরিবর্তন শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের উষ্ণতা নয়, এর পেছনে রয়েছে চীনকে চাপ দেওয়ার মার্কিন কৌশলের সীমাবদ্ধতা এবং পালটা চাপ তৈরিতে বেইজিংয়ের সক্ষমতার এক জটিল সমীকরণ।
বার্তা সংস্থা এপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর চীনের ওপর একের পর এক উচ্চ শুল্ক ও প্রযুক্তি-নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বেইজিংকে চাপে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু তাতে চীনের আচরণ বদলানোর বদলে উলটো যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে ইলেকট্রনিকস, সামরিক সরঞ্জাম ও উচ্চপ্রযুক্তিতে ব্যবহৃত বিরল খনিজের সরবরাহে চীনের শক্তিশালী অবস্থান ওয়াশিংটনের জন্য বড় হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মাইকেল কোভরিগের ভাষায়, ট্রাম্পের অতিরিক্ত শুল্ক ও রপ্তানি-নিষেধাজ্ঞার কৌশল সফল হয়নি। দুই দেশের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে ‘শি ও ট্রাম্প লিভারেজের প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন, যেখানে শি এগিয়ে গেছেন।’
এরপরই ট্রাম্পের কৌশলে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে। কঠোর চাপের বদলে জিনপিংয়ের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ককে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন তিনি। মে মাসে বেইজিং সফরের পর এবার ওয়াশিংটনে শির রাষ্ট্রীয় সফর। দুই নেতা চলতি বছর আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ফাঁকে আরও দুবার বৈঠক করতে পারেন।
চীনের শক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের দরকষাকষি
ট্রাম্পের জন্য সমস্যা হলো, উষ্ণ সম্পর্ক তৈরি হলেও চীনের অর্থনৈতিক উত্থান থামেনি। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক চীনের উৎপাদন খাতকে দুর্বল করার বদলে দেশটিকে নতুন বাজার খুঁজতে আরও উৎসাহিত করেছে। এপি বলছে, গত বছর চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ছিল প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার। একই সময়ে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের গাড়ি শিল্পের ওপর চাপ তৈরি করছে।
অন্যদিকে বিরল খনিজের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আসন্ন ট্রাম্প-শি বৈঠকের আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ও চীনা ভাইস প্রিমিয়ার হে লিফেংয়ের বৈঠকেও বিরল খনিজ, বাণিজ্য ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
শুধু বাণিজ্য নয়, এআই নিয়েও দুই দেশ এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ট্রাম্প দ্রুত এআই উন্নয়নের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার যুক্তি, এ ক্ষেত্রে ধীরগতি চীনকে এগিয়ে দেবে। একই সময়ে চীনা এআই প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন প্রযুক্তি ও মডেল ব্যবহার করছে— এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা— দুই বিপরীত প্রবণতাই এখন সম্পর্কের মধ্যে পাশাপাশি চলছে।
মিত্রদের দূরে সরিয়ে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা?
ট্রাম্পের চীননীতি বদলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী মিত্রদের সঙ্গে টানাপোড়েন। কানাডার সঙ্গে বাণিজ্য বিরোধ, ন্যাটো নিয়ে ট্রাম্পের ওঠানামা ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব— এসবের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের একটি অংশ নিজেদের কৌশল নতুন করে ভাবছে।
কোভরিগের মতে, এতে চীনকে মোকাবিলায় আগে যে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা জোটগুলো ওয়াশিংটন ব্যবহার করতে পারত, সেগুলোও দুর্বল হচ্ছে। ফলে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার চেষ্টা এখন শুধু ওয়াশিংটন-বেইজিং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয় নয়, এটি বৃহত্তর বৈশ্বিক নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার অংশ।
জিনপিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কই কি ট্রাম্পের মূল অর্জন?
ট্রাম্প অবশ্য এই উষ্ণ সম্পর্ক থেকে কিছু প্রতীকী অর্জন দেখাতে পারেন। দুই নেতার পারস্পরিক রাষ্ট্রীয় সফর তাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাত্রা দেখাচ্ছে। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য বাণিজ্য ঘাটতিও ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় কমেছে। তবে এর পেছনে চীন ভিয়েতনামসহ তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠিয়ে মার্কিন শুল্ক এড়ানোর চেষ্টা করছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— জিনপিংয়ের এবারের ওয়াশিংটন সফর থেকে বাস্তব কোনো নীতিগত চুক্তি আসবে কি না। বাণিজ্য, বিরল খনিজ, কৃষিপণ্য, জ্বালানি ও এআই— এসব বিষয়ে দুই পক্ষের আলোচনায় কিছু সমঝোতার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মার্কিন-চীন বাণিজ্যবিরতি ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা থাকায় উভয় পক্ষের সামনে সময়ও সীমিত।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও সাবেক মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের চীনবিষয়ক পরিচালক ইভান মেডেইরোসের মতে, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সম্পর্কনির্ভর কূটনীতি এমন সময়ে হচ্ছে যখন চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
অর্থাৎ, জিনপিংয়ের জন্য লালগালিচা বিছানো ট্রাম্পের কূটনীতির নতুন ছবি হলেও এর আড়ালে রয়েছে একটি কঠিন বাস্তবতা— চীনকে চাপ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারেনি ওয়াশিংটন। এখন তাই সংঘাতের বদলে দরকষাকষি, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও সীমিত সমঝোতার মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চলছে।
source: Rajneete







