News

উপবাসে ১৯১ জনের মৃত্যু: কেনিয়ার ধর্মগুরুর ২০০ বছরের কারাদণ্ড

‘যিশুর দেখা পেতে’ অনুসারীদের উপবাসে বাধ্য করে ১৯১ জনের মৃত্যুর ঘটনায় কেনিয়ার প্রলয়বাদী ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রধান পল ম্যাকেঞ্জিকে ২০০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। নিহতদের একজন ছাড়া সবাই ছিল শিশু। একই মামলায় তার ২৮ সহযোগীকেও সর্বোচ্চ ১৬০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়, শুক্রবার (৬ নভেম্বর) বিচারক ডায়ানা মোচাচে এ রায় ঘোষণা করেন। শিশুদের না খাইয়ে রাখা এবং গণকবর খুঁড়ে মরদেহ গুম করার ঘটনায় ম্যাকেঞ্জির সহযোগীদের দণ্ড দেওয়া হয়।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, অনুসারীদের অনাহারে মৃত্যুর নির্দেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে মূল অপরাধমূলক দায় ম্যাকেঞ্জির। বিশ্ব ইতিহাসে এটিকে অন্যতম প্রাণঘাতী ধর্মীয় উগ্রতার ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এমন নৃশংসতার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট বার্তা দিতেই এ সাজা ‘যথোপযুক্ত ও ন্যায়সংগত’ হয়েছে।

সাজার হিসাব

আদালত ম্যাকেঞ্জিকে হত্যাকাণ্ডের জন্য ১০০ বছর এবং অনুসারীদের অনাহারে রাখার দায়ে আরও ১০০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। তবে দুই সাজা একসঙ্গে কার্যকর হওয়ায় তাকে সর্বোচ্চ ১০০ বছর কারাগারে থাকতে হবে।

মামলার প্রসিকিউশন দল আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছিল। তবে আদালত শুধু কারাদণ্ডের সাজা দিয়েছেন। বিচারক বলেন, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে আসামিদের সংশোধনের বা অপরাধের পথ থেকে ফিরে আসার সুযোগ থাকে না।

বিবিসির খবরে বলা হয়, কেনিয়ায় ১৯৮৭ সালের পর কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি।

দণ্ডিত ২৮ সহযোগীর মধ্যে ছিলেন ম্যাকেঞ্জির অনুসারী একদল প্রহরী। তারা উপবাসের নির্দেশ মানতে অনুসারীদের পাহারা দিতেন। আরেক দল ছিল কবরখোঁড়ার কাজে নিয়োজিত, যারা বনের ভেতরে মরদেহগুলো মাটিচাপা দিত।

অনুসারীদের মধ্যে বিকৃত বিশ্বাস

বিচারক মোচাচে হত্যাকাণ্ডকে ‘পরিকল্পিত ও শীতল রক্তের অপরাধ’ বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আসামিদের মধ্যে কোনো ধরনের অনুশোচনা দেখা যায়নি। বরং তারা নিজেরাও অনাহারে মরতে প্রস্তুত বলে ঔদ্ধত্য দেখিয়েছিল।

গত ১৯ অক্টোবর দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ম্যাকেঞ্জি ও তার সহযোগীরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে আসছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল, কাউকে মৃত্যুর দিকে যেতে বাধ্য করা হয়নি। তবে শুনানির শেষ দিকে তারা আদালতের কাছে অনুকম্পা প্রার্থনা করেন।

আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অনুসারীরা ম্যাকেঞ্জিকে ‘যিশুর কণ্ঠস্বর’ মনে করতেন। তার নির্দেশ বা মতবাদের বিরোধিতা করলে তাদের পিটিয়ে হত্যা করা হতো।

মামলার এক আসামি জানান, যারা উপবাসের নির্দেশ মানত না, তাদের ‘লাথি ও ঘুষি মেরে স্বর্গে পাঠানোর’ নির্দেশ দিতেন ম্যাকেঞ্জি।

বনের ভেতরে মৃতদের মাটিচাপা দেওয়াকে তারা ‘বিয়ে’ হিসেবে উদযাপন করত। প্রচার করা হতো, যারা মারা যাচ্ছে, তারা মূলত ‘যিশুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে’।

ময়নাতদন্তে দেখা গেছে, অধিকাংশ শিশুর মৃত্যু হয়েছে দীর্ঘদিন অনাহারে থাকার কারণে। কয়েকটি মরদেহে শ্বাসরোধ, গলা টিপে ধরা ও মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্নও পাওয়া যায়। কিছু মরদেহ পুরোপুরি পচে যাওয়ায় মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করা যায়নি। আবার উদ্ধার করার পরপরই কয়েকজন মারা যায়। অনাহারে তারা চরম কঙ্কালসার ও দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

শাকাহোলা বনে গণকবর

২০২৩ সালে কেনিয়ার উপকূলীয় শাকাহোলা বনের গণকবর থেকে চার শতাধিক মরদেহ উদ্ধারের পর ম্যাকেঞ্জিকে গ্রেপ্তার করা হয়। বন থেকে ৪০০-এর বেশি মরদেহ উদ্ধার হলেও এ মামলায় ১৯১ জনের মৃত্যুর জন্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

এই ঘটনায় দুই নাতিসহ পরিবারের আট সদস্যকে হারিয়েছেন ফ্রান্সিস ওয়ানজে। শুনানি শুরুর আগে বিবিসিকে তিনি বলেছিলেন, “আমি এমন একটি শাস্তির অপেক্ষায় আছি, যা তার (ম্যাকেঞ্জি) কর্মকাণ্ডের ভয়াবহতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হয়।”

২০২৩ সালের মার্চে ওয়ানজে প্রথম পুলিশকে বিষয়টি জানালেও দ্রুত উদ্ধারে পুলিশ উদ্যোগ নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত এক আত্মীয় ও ম্যাকেঞ্জির সাবেক এক অনুসারীর সহায়তায় ওয়ানজের এক নাতিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ওই শিশুই পরে পুলিশকে গণকবরের সন্ধান দেয়।

ওয়ানজে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “ওটাই হয়তো ওর জীবনের শেষ দিন হতো… ওরা আমার নাতিকেও মেরেই ফেলত।”

কেনিয়ার জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের (কেএনএইচসিআর) তদন্তে উঠে আসে, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে ম্যাকেঞ্জির কর্মকাণ্ডের কথা জানলেও তা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম রুতো একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলেন। তবে পরে আদালত সেটিকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে বাতিল করেন। এর আগেও ম্যাকেঞ্জিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় তখন তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

যেভাবে গড়ে ওঠে গোষ্ঠী

২০০৩ সালে ‘গুড নিউজ ইন্টারন্যাশনাল মিনিস্ট্রিজ’ প্রতিষ্ঠা করেন ম্যাকেঞ্জি। পরবর্তী ১৬ বছরে কেনিয়া জুড়ে চার্চটির হাজার হাজার অনুসারী তৈরি হয়। তার বয়ান প্রচারের জন্য নিজস্ব টেলিভিশন স্টেশন ‘টাইমস টিভি’ও ছিল।

প্রলয়বাদী বক্তব্যে তিনি আধুনিক শিক্ষাকে ‘শয়তানের ফাঁদ’, চিকিৎসাসেবা গ্রহণকে ‘ধর্মের পরিপন্থি’ এবং ডিজিটাল পরিচয়পত্রকে ‘শয়তানের প্রতীক’ হিসেবে প্রচার করতেন। ২০১৯ সালে চার্চ বন্ধ করে অনুসারীদের নিয়ে তিনি শাকাহোলা বনে আস্তানা গড়েন।

হত্যার ঘটনায় ২০০ বছরের সাজা হলেও ম্যাকেঞ্জির বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত নরহত্যা ও সন্ত্রাসবাদের পৃথক অভিযোগে বিচার এখনো চলছে। এসব অভিযোগেও তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আসছেন।

source: Rajneete

Back to top button