‘বাঁধনের ওপর হামলা জুলাই গণহত্যা ও ফ্যাসিবাদের ক্ষতকে গভীর করে তুলেছে’

ইতালিতে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের চালানো হামলার বিরুদ্ধে সংসদে আওয়াজ তুলেছেন সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা। সরব প্রবাসীরাও। রাজনীতিবীদ ও সংস্কৃতিজনরা বলছেন, বাঁধনের ওপর হামলা জুলাই গণহত্যা ও ফ্যাসিবাদের ক্ষতকে গভীর করে তুলেছে।
ফেসবুক লাইভে বাঁধন জানিয়েছেন, হামলাকারীদের বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তিনি ভেনিস ছাড়বেন না। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াই অব্যাহত রাখবেন। অন্যদিকে ইতালিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাস বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
এই হামলাকে ‘ঘৃণ্য ও ন্যক্কারজনক অপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, যারা নারীদের ওপর আক্রমণ চালায় তারা কাপুরুষ। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষকে সোচ্চার ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জোবায়ের বলেন, আমাদের বোন, চলচ্চিত্র অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের পদধারী নেতাকর্মীদের হামলা প্রমাণ করে আওয়ামী লীগ একটি অসভ্য, সন্ত্রাসী ও ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দল। তারা কোনও সভ্যতা-ভব্যতা মানে না। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর নানান মতপার্থক্য থাকতে পারে, তবে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রশ্নে আমরা একমত। দলটি দেশ ও জাতির শত্রু। সরকারের প্রতি অনুরোধ জানাব দূতাবাসের মাধ্যমে যেন এ হামলার দৃষ্টামূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।
তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সুফলে ক্ষমতায় আসা সরকার, এই আন্দোলনে সম্পৃক্তদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিয়ে কতটা দায়িত্বশীল সে প্রশ্ন রয়েছে। জুলাই সনদ ও গণভোট কার্যকর না করার বিষয়টি প্রশ্নাতীতভাবে অগ্রহণযোগ্য।
এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, একটি গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জনগণ যে ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছে, সেই নিষিদ্ধ ও সন্ত্রাসী সংগঠনের পলাতক নেতাকর্মীরা এখনও হামলা-সহিংসতা চালিয়ে যাচ্ছে।
জুলাইয়ে বাঁধন রাজপথে ছিলেন উল্লেখ করেন আসিফ মাহমুদ বলেন, মানুষের অধিকার ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশের দাবিতে বাঁধন নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। তার ওপর হামলা প্রমাণ করে, পরাজিত সন্ত্রাসীরা এখনও প্রতিশোধ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের রাজনীতি থেকে বের হতে পারেনি। তবে হামলা করে, ভয় দেখিয়ে কিংবা সহিংসতা চালিয়ে অরাজকতা করে জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রাখা যাবে না।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এশিয়া পোস্টকে বলেন, শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে তাদের দেশ-বিদেশের নেতাকর্মীদের আচরণে এটা পরিষ্কার যে, তারা রিকনসিয়িলেশন চায় না। তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিশোধ নিতে চায়। অভ্যুত্থানে শুধু রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা অংশ নেয়নি, এতে সব শ্রেণিপেশার মানুষ অংশ নিয়েছে। আওয়ামী লীগ সুযোগ পেলেই জুলাইয়ের অংশীদারদের প্রত্যকের ওপর হামলে পড়ে। গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের জুলাই জঙ্গি, জুলাই সন্ত্রাসী ইত্যাদি বলে বিদ্রুপ করে। আজমেরী হক বাঁধনের ওপর হামলা তারই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
তিনি বলেন, বাঁধনের ওপর হামলাকে উদ্যাপন করে আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মী ও তথাকথিত আওয়ামী গুপ্ত সুশীল সিনিয়র সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা ইনিয়ে বিনিয়ে কথা বলছেন। এতে পরিষ্কার যে, আওয়ামী লীগ তাদের সীমাহীন গুম, খুন, লুটপাট, গণহত্যার জন্য মোটেও অনুতপ্ত নয়।
সরকারকে শুরু থেকেই জুলাই শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার এবং তাদের সুরক্ষার জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানালেও সরকার এ ব্যাপারে উদাসীনতার পরিচয় দিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন মজিবুর রহমান মঞ্জু।
ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যে এখনও পর্যন্ত কোনো ধরনের অনুশোচনায় না ভুগে দেশে-বিদেশে জঙ্গি আচরণ করে যাচ্ছে এই দায় ওইসব সুশীলদের যারা জুলাই গণহত্যার রক্ত হাতে থাকা এই অপরাধীদের পুনর্বাসন নিয়ে মিডিয়ায় লেখা লিখছিলেন।
এশিয়া পোস্টের সঙ্গে আলাপকালে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, জুলাই গণহত্যার সম্মতি উৎপাদনকারী ও সমর্থকদের গণমাধ্যমে জায়গা দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের বক্তব্য প্রচারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। অন্তর্বর্তী ও বিএনপি সরকার, সংস্কৃতি অঙ্গন এবং জুলাইয়ের পক্ষের শক্তিরও এ হামলার দায় রয়েছে। নিজেদের ক্ষমতার লড়াইয়ে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকে এমন ব্যক্তিদের উসকে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী ও বিএনপি সরকারের দায়িত্ব ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক অপরাধের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিচার বা তিরস্কারের আওতায় আনা। সেটি করা সম্ভব হয়নি।
গীতিকবি ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শহীদুল্লাহ ফরায়জী এশিয়া পোস্টকে বলেন, রাজনৈতিক মতের বিরোধিতা করার অধিকার সবার আছে। কিন্তু মতের জবাব হামলা, হুমকি, লাঞ্ছনা কিংবা নারীকে অপমান করার মধ্য দিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভাষা হতে পারে না। বাঁধনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ইতালির মাটিতে। ঘটনাটি বিদেশে ঘটলেও এর সঙ্গে যে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতির প্রশ্ন জড়িয়ে আছে, তা আমাদের গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করে।
শহীদুল্লাহ ফরায়জীর ভাষায়, ক্ষমতার পরিবর্তন শুধু শাসকের পরিবর্তন নয়; রাজনীতির ভাষা, আচরণ ও সংস্কৃতিরও পরিবর্তন ঘটাতে হবে। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা, ব্যক্তির মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক সহনশীলতাই হতে হবে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি। বিদেশের মাটিতে এ ধরনের ঘটনা শুধু একজন মানুষের মর্যাদাকেই আঘাত করে না। এর সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তি ও জাতির আত্মমর্যাদার প্রশ্নও জড়িয়ে থাকে। এই ন্যূনতম বিবেচনাবোধটুকু যদি আমাদের রাজনৈতিক আচরণে অনুপস্থিত থাকে, তাহলে এমন কর্মকাণ্ড কারও জন্যই কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে না।
সংগীতশিল্পী, সাংবাদিক ও লেখক আমিরুল মোমেনীন মানিক এশিয়া পোস্টকে বলেন, বাঁধনকে মেরে পিটিয়ে হয়ত রক্তাক্ত করা যাবে কিন্তু তার হৃদয় ও মস্তিষ্কে ফ্যাসিবাদবিরোধী যে আদর্শ প্রবহমান, তা ধ্বংস করা যাবে না।
তিনি বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তাদের অনুসারীরা এতটাই দেউলিয়া হয়ে গেছে যে, একজন নারী বা শিশুকেও তারা কাপুরুষের মতো আক্রমণ করতে দ্বিধা করছে না। এর একটাই কারণ শারীরিক আকৃতিতেই কেবল তারা মানুষ, অন্য সবকিছুতে এরা হায়েনার চেয়েও নিকৃষ্ট।
আমিরুল মোমেনীন মানিক বলেন, হামলা তখনই করে যখন যুক্তি ও বুদ্ধির কোনো পথ সামনে থাকে না। হামলাকারীদের বিবেক, বোধ ও মনুষ্যত্ব সবকিছু ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত ডায়নেসোরের মতো বিলোপ হয়ে গেছে।
ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামি লেখেন, এই হামলা প্রমাণ করে যে, আওয়ামী লীগের দুষ্কৃতকারী ও গুন্ডারা কোনোভাবেই কোনো ছাড় বা রাজনৈতিক আনুকূল্য পাওয়ার যোগ্য নয়। জুলাই মাসে সংঘটিত সহিংসতা ও নৃশংসতার জন্য তারা যেমন কোনো অনুশোচনা দেখায়নি, তেমনি বারবার প্রতিহিংসাপরায়ণ ও বিদ্বেষপূর্ণ হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বাঁধন আপু ও তার পরিবারের ওপর এই হামলা আমাদের অর্থাৎ বাংলাদেশিদের মনে সৃষ্ট ক্ষতকে আরও গভীর করে তুলেছে। সেখানে ছোট একটি শিশু উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও এই হামলাকারীরা বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি। বাঁধন নিজ সাহসিকতা ও ব্যক্তিত্বে সবাইকে গর্বিত করেছেন। আমি দোয়া করি, তিনি ও তার পরিবার যেন নিজেদের মনোবল অটুট রাখতে পারেন। আপনার শক্তি আরও বৃদ্ধি পাক, আপু।
source: Asia Post







