ময়মনসিংহ/চাঁদা না পেয়ে চিকিৎসককে মারধর, ছাত্রদল নেতা বহিষ্কার

ময়মনসিংহ নগরে এক পশু চিকিৎসকের চেম্বারে ঢুকে তাকে মারধর, ভাঙচুর ও টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর জড়িত থাকার অভিযোগে মহানগর ছাত্রদলের এক নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
শনিবার (২২ আগস্ট) এ ঘটনায় ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানায় অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী চিকিৎসক আশিকুর রহমান। এর আগে শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় নগরের জিলা স্কুলের পাশের একটি গলিতে ‘ডক্টরস পেট কেয়ার’ নামের চেম্বারে ঘটনাটি ঘটে।
তিনি মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তালহাজুর রহমান প্রতীক, আফরিন রশিদ সেঁজুতি ও সাকিবসহ আরও চার-পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগটি দায়ের করেন।
ভুক্তভোগী চিকিৎসক মো. আশিকুর রহমান ‘ডক্টরস পেট কেয়ার’ চেম্বারে বিড়ালের চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি পোষা প্রাণীর আনুষঙ্গিক উপকরণ বিক্রি করেন।
সিসিটিভি ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারী চেম্বারে ঢুকে জুতা খুলে চিকিৎসক আশিকুর রহমানকে মারধর করছেন। পাশে দাঁড়িয়ে তালহাজুর রহমান প্রতীক মোবাইলে দৃশ্যটি ধারণ করছেন। পরে তাকেও চিকিৎসকের ওপর হামলা চালাতে দেখা যায়।
ডা. আশিকুর রহমানের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তার কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল। শুক্রবার সন্ধ্যায় চেম্বারে এসে চাঁদার জন্য চাপ দেওয়া হলে তিনি প্রতিবাদ করেন। তখন আসামিরা সিসিটিভির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তাকে লোহার রড দিয়ে মারধর করে। তাকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে চেম্বারের কর্মী ঈশান আহমেদ, তার স্ত্রী তাওহিয়া আক্তার এবং চিকিৎসকের স্ত্রী সাজনিন তাসনিন সিদ্দিকীকেও মারধর ও টানাহেঁচড়া করা হয়।
হামলার পর ক্যাশ বাক্স থেকে তিন লাখ ২০ হাজার ১৫০ টাকা নিয়ে যাওয়া হয় এবং চেম্বারের মালামাল ভাঙচুর করে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার টাকার ক্ষতি করা হয় বলে তিনি জানান।
চিকিৎসক আশিকুর রহমান আরও জানান, চাঁদা দাবির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যক্তিগত বিরোধ ও এক বছর আগের একটি ঘটনা এ হামলার পেছনে কাজ করেছে। আফরিন রশিদ সেঁজুতি নামের ওই নারী একটি বিড়ালের মৃত বাচ্চা প্রসবের ঘটনা কেন্দ্র করে তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। তা ছাড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্য এক চিকিৎসককে নিয়ে আপত্তিকর লেখার পেছনে তার হাত রয়েছে—এমন ভুল ধারণা থেকেও এ হামলা হতে পারে।
অভিযোগের বিষয়ে সাকিবুল হাসান বলেন, গত সোমবার (১৭ আগস্ট) একটি গর্ভবতী পারশিয়ান বিড়ালকে কেওয়াটখালীর ভেটেরিনারি চিকিৎসক আব্দুল হান্নানের কাছে রেখে যান সেঁজুতি। সেখানে বিড়ালটি মারা যায়। পরদিন ফোন করে তারা বিষয়টি জানতে পারেন। বিড়ালের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে ফেসবুকে লেখালেখি হলে আশিকুর রহমান ভুয়া ফেসবুক আইডি থেকে সেঁজুতিকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন। এই কারণেই আশিকুরকে মারধর করা হয়েছে।
এ ঘটনায় তারাও থানায় অভিযোগ করেছেন বলে সাকিবুল দাবি করলেও কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মুহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম জানান, সাকিবুলদের কোনো অভিযোগ থানায় পৌঁছায়নি।
তবে ওই অভিযোগপত্রটির একটি কপি এসেছে এশিয়া পোস্টের হাতে। সেখানে মো. লাক মিয়া নামের এক ব্যক্তি লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, তাদের পালিত পারশিয়ান বিড়ালটি অন্তঃসত্ত্বা থাকায় ১৭ আগস্ট ভেটেরিনারি চিকিৎসক আব্দুল হান্নানের কাছে নিয়ে যান। আব্দুল হান্নান তাদের আশ্বস্ত করে বিড়ালটিকে ২৪ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার কথা বলে চেম্বারে রেখে দিতে বলেন। এ সময় বিড়ালটিকে একটি ইনজেকশন দেওয়া হয়। চিকিৎসক জানান, কোনো সমস্যা হলে তাদের জানানো হবে। কিন্তু পরদিন ১৮ আগস্ট ডা. হান্নানকে কল দিলে তিনি বিড়ালটির মৃত্যুর খবর জানান এবং তা নিয়ে যেতে বলেন। পরে তারা গিয়ে বিড়ালটি নিয়ে আসেন। তবে চিকিৎসকের সাথে কথা বলতে চাইলে তিনি নানা অজুহাতে এড়িয়ে যান।
লাক মিয়ার দাবি, অপচিকিৎসা ও অবহেলায় বিড়ালটির মৃত্যু হয়েছে। তবে চিকিৎসককে মারধরের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। লাক মিয়া নেত্রকোনা সদর উপজেলার চকপাড়া গ্রামের মৃত সিদ্দিক মিয়ার ছেলে। আর অভিযুক্ত আব্দুল হান্নান ময়মনসিংহ নগরীর কেওয়াটখালী বাজার সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা ও পেশায় ভেটেরিনারি চিকিৎসক।
অন্যদিকে চিকিৎসক আব্দুল হান্নানের ফেসবুক পেজ থেকে করা এক পোস্টে বলা হয়, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) অভি, ঝলক, পলক, সেঁজুতি ও রিফাতসহ অজ্ঞাত আরও তিনজন ডা. আব্দুল হান্নানের চেম্বারে হামলা চালায়। চিকিৎসককে না পেয়ে হামলাকারীরা তার সহকারীকে মারধর ও চেম্বারে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। একই সাথে তারা মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয় এবং পরে বিভিন্ন স্থানে সন্ধান করে ভয়ভীতি দেখাতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় পরদিন শুক্রবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যায় তারা ডা. আশিকুর রহমানের পেট ক্লিনিকে পুনরায় হামলা চালিয়ে ডা. আশিককে মারধর করে।
এদিকে ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ার পর মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তালহাজুর রহমান প্রতীককে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি গোবিন্দ রায়।
ময়মনসিংহ কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শিবিরুল ইসলাম জানান, চিকিৎসক আশিকুর রহমানের অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। একজন চিকিৎসকের চেম্বারে ঢুকে তাকে মারধর করা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ময়মনসিংহ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোষা প্রাণীর চিকিৎসা ও মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
source: Asia Post







