আলজাজিরার কলাম/স্পেন কি কোনো ‘শাস্তি’ পাচ্ছে?

চলতি সপ্তাহের শুরুতে আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডে অবস্থিত স্পেনের দুটি ছিটমহলের একটিতে (সেউতা) মরক্কো সীমান্ত পেরিয়ে প্রবেশের চেষ্টাকালে অন্তত ৫৭ শরণার্থীর মৃত্যু হয়। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে হাজার হাজার মানুষ সেউতায় প্রবেশ করে। একে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ‘আঞ্চলিক অখণ্ডতার লঙ্ঘন’ বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে অনেক শরণার্থী দাবি করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্ট দেখে তারা এই যাত্রায় উৎসাহিত হয়েছিলেন।
জাতিসংঘে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ড্যানি ড্যানন এই সুযোগ হাতছাড়া করেননি। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) ক্ষোভ উগরে দিয়ে লেখেন, ‘স্পেন, যারা ইসরায়েলকে জ্ঞান দেওয়ার কোনো সুযোগই হাতছাড়া করে না, তারা এখন তাদের অভিবাসন নীতির সংকটের মুখে সেউতায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।’
দীর্ঘদিন ধরে সানচেজ সরকার ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনা করে আসছে। স্পেন ইসরায়েলকে একটি ‘গণহত্যাকারী রাষ্ট্র’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং সেই অনুযায়ী বড় ধরনের সামরিক চুক্তি বাতিল করেছে। এমনকি ২০২৪ সালে স্পেন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়।
এখন সেউতা কাণ্ডের পর ইসরায়েল—যে দেশটির রাষ্ট্রীয় নীতিই মূলত ভণ্ডামির ওপর দাঁড়িয়ে—স্প্যানিশদের দ্বিমুখী আচরণের সমালোচনা করার মোক্ষম সুযোগ পেয়েছে। ড্যানন তার এক্স পোস্টে আরও লিখেছেন, ‘আমাদের জ্ঞান দেওয়ার আগে স্পেনের উচিত তারা কেন এখনো আফ্রিকায় উপনিবেশবাদী ছিটমহল বজায় রেখেছে, তা বিশ্বের কাছে ব্যাখ্যা করা।’
বাস্তবতা হলো, অন্য দেশের ‘ঔপনিবেশিক ছিটমহল’ নিয়ে প্রশ্ন তোলার চেয়ে বড় ভণ্ডামি আর কিছু হতে পারে না, যখন নিজের দেশ গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের ওপর সরাসরি গণহত্যা চালাচ্ছে এবং পশ্চিম তীরে নিষ্ঠুর ঔপনিবেশিক দখলদারিত্বের মাধ্যমে কার্যত তা নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে।
অবশ্য ইসরায়েলের কাছে যৌক্তিক আচরণ আশা করাও বৃথা। তারা সবসময় বাস্তবতাকে উল্টে দিতে পছন্দ করে। তাদের বয়ানে, যাদের নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে তারাই নাকি সন্ত্রাসী, আর যারা হত্যা করছে তারাই আসল ভুক্তভোগী!
মেলিলা নামের আরেকটি ছিটমহলের মতো সেউতাকেও মরক্কো নিজেদের দাবি করে। তবে স্পেনের সঙ্গে বৈরিতা থাকলেও মরক্কোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক বেশ চমৎকার। ২০২০ সালে মরক্কো ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এ যোগ দেয়। এর মাধ্যমে তারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিককারী চতুর্থ আরব রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়।
এক্সে ড্যাননের এই ক্ষোভের জবাবে স্পেনের পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে লিখেছেন, ‘যাক, সবকিছু এখন বেশ পরিষ্কার হয়ে উঠছে।’ তার এই মন্তব্যটি মূলত সেউতায় বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর অনুপ্রবেশের পেছনে ইসরায়েলের পরোক্ষ হাত থাকার গুঞ্জনকেই ইঙ্গিত করে। স্পেনের অপরাধ ছিল—তারা গণহত্যার বিরোধিতা করেছিল, আর সে কারণেই হয়তো তাদের এই ‘শাস্তি’ দেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েলের বিভিন্ন কর্মকর্তার বক্তব্য এবং তাদের তল্পিবাহক কলামিস্টদের কলামে এই গুঞ্জনের স্পষ্ট প্রমাণ মেলে। গত মার্চ মাসে পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা মাইকেল রুবিন এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, ‘মরক্কোর নাগরিকদের উচিত দলবদ্ধভাবে বুলডোজার নিয়ে সীমান্তে যাওয়া এবং কোনো অস্ত্র ছাড়াই সেউতা ও মেলিলিতে প্রবেশ করে মরক্কোর পতাকা উড়িয়ে দেওয়া।’
পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘ওয়াইনেট নিউজ’-এর এক প্রতিবেদনে রক্ষণশীল থিংক ট্যাংক ‘মিডল ইস্ট ফোরাম’-এর গবেষক আমিন আইয়ুব প্রস্তাব করেন, ইসরায়েলের উচিত সেউতা ও মেলিলা পুনরুদ্ধার করতে মরক্কোকে ‘সহায়তা’ করা। আইয়ুবের মতে, এই অভিযানের জন্য এখনই উপযুক্ত সময়। কারণ হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেনের মধ্যকার তলানিতে ঠেকে যাওয়া সম্পর্কের কথা উল্লেখ করেন। ফিলিস্তিন ও ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক পদক্ষেপে স্পেনের অসহযোগিতার কারণেই এই দূরত্বের তৈরি হয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে সংঘাত শুরু হলে স্পেন মার্কিন বাহিনীকে তাদের দেশে থাকা সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারে অস্বীকৃতি জানায়। এর পরের মাসেই খবর বের হয় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো থেকে স্পেনের সদস্যপদ স্থগিত করার প্রস্তাব দিয়েছিল।
আব্রাহাম অ্যাকর্ডস মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যে এমন এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে, যা একই সঙ্গে আমেরিকা ও ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করে। এটি মনে করিয়ে দিয়ে আইয়ুব দাবি করেন, ‘সেউতা ও মেলিলা উদ্ধারে মরক্কোকে সহায়তা করা হলে তা এই নতুন সমীকরণকে আরও শক্তিশালী করবে। একই সঙ্গে ন্যাটোর এমন একটি সদস্য দেশকে শাস্তি দেওয়া যাবে, যে জোটের সবচেয়ে বড় সংকটের সময়ে অংশীদারত্বের চেয়ে বাধাদানকে বেছে নিয়েছে।’
নিবন্ধের শেষ বাক্যে আইয়ুব মরক্কোকে ইসরায়েলের এই ‘সহায়তা’র আসল কারণটি ফাঁস করে দেন। তিনি লেখেন, ‘জিব্রাল্টার প্রণালির ওপারে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে যে মরক্কোর হাতে, তার পেছনে বিনিয়োগ করা ইসরায়েলের জন্য একটি বড় কৌশলগত পদক্ষেপ।’
সেউতার এই শরণার্থী সংকটে আসলেই ইসরায়েলের পরোক্ষ ইন্ধন রয়েছে কি না, তা হয়তো ভবিষ্যতে জানা যাবে। তবে এটুকু মনে রাখাই যথেষ্ট যে অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে গোপনে নাক গলানোর দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে ইসরায়েলের।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেউতায় এই ‘অনুপ্রবেশ’কে সানচেজ সরকারের চরম অযোগ্যতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি নিজ দেশের ভোটারদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ‘এটি অত্যন্ত ভয়াবহ। এই ছবিটি মনে রাখবেন। ডেমোক্র্যাটরা ক্ষমতায় ফিরে আসলে আগামী তিন বছরের মধ্যে আমাদের দেশের সীমানাতেও একই চিত্র দেখা যাবে।’
ইসরায়েল নিশ্চয়ই মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে ভিন্ন কোনো বক্তব্য আশা করেছিল; হয়তো এমন কোনো বক্তব্য যাতে সেউতাকে মরক্কোর অংশ বলে দাবি করা হতো। তবে ট্রাম্পের মাথায় সম্ভবত তখন অভিবাসী-বিদ্বেষী ভীতি ছড়ানোর নেশা বেশি চেপে বসেছিল।
স্পেনের দ্বিমুখী নীতির অহেতুক সমালোচনা করে এবং নিজেদের ঔপনিবেশিক নৃশংসতা ও গণহত্যার দিকে বিশ্বের মনোযোগ এড়ানোর যে নোংরা চেষ্টা ইসরায়েল চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়—ইসরায়েলের ভণ্ডামির কোনো সীমানা নেই।
লেখক পরিচিতি: বেলেন ফার্নান্দেজ একজন আন্তর্জাতিক কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও লেখক। তিনি কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা, জ্যাকোবিন ম্যাগাজিন ও মিডল ইস্ট আইসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন।
source: Asia Post







