News

‘ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতে দেবেন না, বিশ্ববিদ্যালয়কে দলীয় রাজনীতি থেকে মুক্ত করুন’

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ। ওই খোলা চিঠিতে ‘দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় রাজনৈতিক দলের অধীন ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা করার দাবি জানান তিনি।

অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ নিয়মিত, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক ছাত্র সংসদ নির্বাচন বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি শিক্ষক সমিতি সম্পূর্ণ পেশাভিত্তিক সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান। ‘শিক্ষার্থী ও শিক্ষক ব্যক্তি হিসেবে রাজনীতি করবেন, মত প্রকাশ করবেন, নির্বাচনে অংশ নেবেন—এসব তাদের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় আর কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক ঘাঁটি হবে না’। যোগ করেন তিনি।

এশিয়া পোস্টের পাঠকদের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষকের খোলা চিঠিটি হুবহু তুলে ধরা হলো:

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

সশ্রদ্ধ সালাম গ্রহণ করবেন। বাংলাদেশের মানুষ শুধু সরকার পরিবর্তনের জন্য নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের প্রত্যাশায় আপনাদের ওপর আস্থা রেখেছে। সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি হলো দেশের বিশ্ববিদ্যালয়। কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় শুধু সংসদে নয়; নির্ধারিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার এবং ছাত্রাবাসে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্রসমাজের অবদান গৌরবময়। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণআন্দোলন এবং চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাই ছাত্ররাজনীতি নয়, বরং জাতীয় রাজনৈতিক দলের লেজুড়ভিত্তিক ছাত্ররাজনীতিই আজ পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।

সম্প্রতি একদিনেই দেশের তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের খবর প্রকাশিত হয়েছে। সংঘর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত ছড়িয়েছে। অনেকে এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলতে পারেন। কিন্তু ইতিহাস বলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকট কখনো হঠাৎ করে তৈরি হয় না; ছোট ছোট সংঘাতকে গুরুত্ব না দিলে একসময় সেগুলোই প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে রূপ নেয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দিয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের শাসনকালে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনকে ঘিরে সহিংসতা, হলকেন্দ্রিক আধিপত্য ও দখলদারিত্বের অভিযোগ জনমনে গভীর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারা সরকারের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। সরকারকে সমর্থনকারী বহু মানুষও প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ছাত্রসংগঠনের কিছু কর্মকাণ্ড সরকারের অর্জনকে ম্লান করে দিয়েছে। এই মূল্যায়ন নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, কিন্তু একটি শিক্ষা স্পষ্ট, ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার রাজনৈতিক মূল্য শেষ পর্যন্ত সরকারকেই দিতে হয়।

এই শিক্ষা কোনো একটি দলের জন্য নয়; এটি প্রতিটি সরকারের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।

আজ যদি ছাত্রলীগের জায়গায় ছাত্রদল, কিংবা ভবিষ্যতে অন্য কোনো দলীয় ছাত্রসংগঠন একই ধরনের প্রভাব বিস্তার করে, তাহলে আমরা শুধু সংগঠনের নাম বদলাব; সমস্যার সমাধান করব না। ব্যক্তি ও দল পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু কাঠামো অপরিবর্তিত থাকলে ইতিহাসও প্রায়শই একইভাবে ফিরে আসে।

এই বাস্তবতায় আমার বিনীত প্রশ্ন—আমরা কি আবার সেই পথেই হাঁটতে চাই?

সমস্যা কোনো নির্দিষ্ট ছাত্রসংগঠন নয়; সমস্যার মূল হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে জাতীয় রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক উপস্থিতি। একইভাবে, শিক্ষক রাজনীতিও যখন দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি এবং একাডেমিক পরিবেশ রাজনৈতিক মেরুকরণের বাইরে থাকতে পারে না।

বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। সেখানে শিক্ষার্থীদের শক্তিশালী প্রতিনিধিত্ব রয়েছে, কিন্তু তা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক; জাতীয় রাজনৈতিক দলের শাখা হিসেবে নয়। শিক্ষক সমিতিগুলোও পেশাগত সংগঠন হিসেবে কাজ করে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানচর্চার স্বাধীন কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হতে পারে। বাংলাদেশেরও এখন সেই সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে।

আমি বিনীতভাবে প্রস্তাব করছি, দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় রাজনৈতিক দলের অধীন ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে স্বাধীন ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা করা হোক। নিয়মিত, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক ছাত্র সংসদ নির্বাচন বাধ্যতামূলক করা হোক। শিক্ষক সমিতি সম্পূর্ণ পেশাভিত্তিক সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলা হোক। শিক্ষার্থী ও শিক্ষক ব্যক্তি হিসেবে রাজনীতি করবেন, মত প্রকাশ করবেন, নির্বাচনে অংশ নেবেন—এসব তাদের সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় আর কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক ঘাঁটি হবে না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

আপনার সামনে দুটি পথ খোলা। প্রথম পথ হলো, আগের সরকারগুলোর মতো সময়ে সময়ে দলীয় ছাত্রসংগঠনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা। এই পথ সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান করবে না। দ্বিতীয় পথ হলো, সমস্যার শিকড়েই হাত দেওয়া। এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করা, যাতে ভবিষ্যতে কোনো সরকার—আজকের হোক বা আগামী দিনের—বিশ্ববিদ্যালয়কে দলীয় শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে।

আমি বিশ্বাস করি, দ্বিতীয় পথটিই ইতিহাসের পথ। ইতিহাস সাধারণত তাদেরই স্মরণ রাখে, যারা শুধু রাষ্ট্র পরিচালনা করেননি; রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করে গেছেন।

আপনি যদি বিশ্ববিদ্যালয়কে দলীয় রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ নেন, তাহলে সেটি শুধু একটি শিক্ষা সংস্কার হবে না; এটি হবে বাংলাদেশের গণতন্ত্র, উচ্চশিক্ষা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিতে একটি যুগান্তকারী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় কোনো রাজনৈতিক দলের নয়; এটি জাতির। তাই বিশ্ববিদ্যালয়কে দলীয় প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নয়, স্বাধীন চিন্তা, মুক্ত বিতর্ক, গবেষণা এবং মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব গঠনের প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার এখনই সময়। ইতিহাস যেন আর নিজেকে পুনরাবৃত্তি করতে না পারে, সেই দায়িত্ব আজ আপনার।

source: Asia Post

Back to top button