ইরানকে ৯০টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা দিচ্ছে রাশিয়া

ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ বাহিনীর বহুল ব্যবহৃত নির্ভুল নিশানায় আঘাত হানতে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার জন্য ৯০টি উৎক্ষেপণব্যবস্থা ইরানকে সরবরাহ করতে রাজি হয়েছে রাশিয়া। হেলিকপ্টারে সংযোজনযোগ্য এসব উৎক্ষেপণব্যবস্থা সরবরাহের বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ইরান ইন্টারন্যাশনালের খবরে বলা হয়, ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ২০২৪ ও ২০২৫ সালের রুশ প্রতিরক্ষা শিল্পের উৎপাদনসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করে এ চুক্তির তথ্য পেয়েছে। নথিতে ‘কে-১০’ সাংকেতিক নামে এক ক্রেতার কাছে ৯০টি এপিইউ-এল উৎক্ষেপণব্যবস্থা রপ্তানির আদেশের উল্লেখ রয়েছে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ইরানকে বোঝাতে ‘কে-১০’ সাংকেতিক নাম ব্যবহার করে। তবে চুক্তি অনুযায়ী এসব উৎক্ষেপণব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত ইরানের হাতে পৌঁছেছে কি না, তা নথিতে নিশ্চিত করা হয়নি।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের লিখেছে, নতুন এই তথ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে রাশিয়ার সহযোগিতার আরেকটি দিক সামনে এনেছে। এর আগে ইরানের জন্য সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে রাশিয়ার গোপন সহায়তার একটি কর্মসূচির তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল। এসব ক্ষেপণাস্ত্র পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জাহাজের জন্য সম্ভাব্য হুমকি তৈরি করতে পারে।
রাশিয়ার হালকা বহুমুখী গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র বহনের জন্য তৈরি করা হয়েছে এপিইউ-এল উৎক্ষেপণব্যবস্থা। এসব ক্ষেপণাস্ত্র এলএমইউআর বা ‘ইজদেলিয়ে-৩০৫’ নামে পরিচিত। চলমান লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে পারে এগুলো।
২০২২ সালে রুশ সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হওয়ার পর থেকে ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে এই ক্ষেপণাস্ত্র। উড্ডয়নের সময় একজন অপারেটর এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ফলে প্রয়োজন অনুযায়ী লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তনের সুযোগ থাকে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইকুইপমেন্ট গাইড’ অনুযায়ী, এপিইউ-এল উৎক্ষেপণব্যবস্থা রাশিয়ার এমআই-২৮ অ্যাটাক হেলিকপ্টারের জন্য তৈরি। প্রতিটি ব্যবস্থায় দুটি ক্ষেপণাস্ত্র বহন করা যায়।
ইরানের কাছে আগে থেকেই রাশিয়ার তৈরি এমআই-২৮ হেলিকপ্টার রয়েছে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, এসব হেলিকপ্টার সরবরাহের ব্যবস্থা চূড়ান্ত হয়েছে। পরে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে অনলাইনে প্রকাশিত কয়েকটি ছবিতে তেহরানের একটি বিমান চলাচলকেন্দ্রে এমআই-২৮ হেলিকপ্টার দেখা যায় বলে জানিয়েছে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
সংবাদমাধ্যমটিকে রাশিয়ার উৎপাদনসংক্রান্ত নথিগুলো সরবরাহ করেছে ইউক্রেনের বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থা ডালাস অ্যানালিটিকস। এ ছাড়া ২০২৪ সালের মে মাসে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভিম্পেলের একটি চিঠিতে অন্য একটি প্রতিরক্ষা ব্যুরোকে উৎক্ষেপণব্যবস্থার যন্ত্রাংশ সরবরাহে বিলম্বের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। চিঠিতে বলা হয়, যন্ত্রাংশ সরবরাহে দেরি হলে কয়েকটি চুক্তি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতেও সহযোগিতা
গত সেপ্টেম্বরে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ইরানের জন্য সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি তৈরিতে রাশিয়ার গোপন সহযোগিতার তথ্য প্রকাশিত হয়। ‘সি৪৩০এল’ সাংকেতিক নামের একটি কর্মসূচির আওতায় এ সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছিল।
সংবাদমাধ্যমটির পর্যালোচনা করা ফাঁস হওয়া রুশ চিঠিপত্র, ভ্রমণসংক্রান্ত নথি ও সামরিক পেটেন্ট অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কর্মসূচিটি শুরু হয়। চলতি বছর ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধ চলার সময়ও তা অব্যাহত ছিল।
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল র্যামজেট প্রপালশন ব্যবস্থা তৈরি করা। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্র শব্দের গতির কয়েক গুণ বেশি গতিতে উড়তে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় কমে আসতে পারে।
ইরানবিষয়ক সাবেক সিআইএ সামরিক বিশ্লেষক জিম ল্যামসন ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, এই প্রযুক্তি ইরানকে নতুন ধরনের কৌশলগত অস্ত্র দেবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জাহাজের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
ইরান ইন্টারন্যাশনালের খবরে বলা হয়েছে, ইরান ওই প্রপালশন ব্যবস্থা তৈরি এবং এর উড্ডয়ন পরীক্ষা চালিয়েছে। তবে রাশিয়ার সহায়তায় তৈরি কোনো সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের সামরিক বাহিনীর নিয়মিত ব্যবহারে যুক্ত হয়েছে, এমন প্রমাণ পায়নি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রুশ প্রকৌশলীরা একাধিকবার ইরান সফর করেছেন। ইরানের উড্ডয়ন পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা জ্বালানি ব্যবস্থা, দহনপ্রক্রিয়ার স্থিতিশীলতা, বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা ও ইঞ্জিনের নকশা নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন।
কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান হিনজ গত সেপ্টেম্বরে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, এটি রাশিয়ার কাছ থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের ঘটনা। কয়েক দশক ধরেই ইরান এ প্রযুক্তি অর্জনের চেষ্টা করছে।
যুদ্ধের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা জোরদার
ইরান ইন্টারন্যাশনাল লিখেছে, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণব্যবস্থা সরবরাহের চুক্তি এবং সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কর্মসূচি ইরানের প্রতি রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতার দুটি দিক তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে অস্ত্র সরবরাহের পাশাপাশি বিশেষায়িত প্রযুক্তিগত জ্ঞান হস্তান্তর।
এর আগে ইরানকে ভারবা কাঁধে বহনযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহে রাশিয়া সম্মত হয়েছে বলেও জানিয়েছিল ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস।
তবে দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা একমুখী নয়। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য এর আগে রাশিয়াকে শাহেদ অ্যাটাক ড্রোন সরবরাহ করেছে ইরান। পাশাপাশি রাশিয়ায় এসব ড্রোনের নিজস্ব উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তুলতেও সহায়তা করেছে দেশটি।
পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলতি বছরের সংঘাতের সময় মস্কো ও তেহরান তাদের সামরিক অংশীদারত্ব আরও জোরদার করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানকে সহায়তা করতে রাশিয়া ‘খুব সামান্য, এমনকি কিছুই করছে না’।
কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের গবেষক নিকোল গ্রাজেউস্কি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, নিজেদের যুদ্ধকালীন চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ইরানকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ অব্যাহত রাখতে রাশিয়ার আগ্রহের বিষয়টি এই সহযোগিতায় স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিমাদের আপত্তির বিষয়েও আগের তুলনায় কম উদ্বিগ্ন মস্কো।
এদিকে সামরিক সহযোগিতা বাড়লেও চলমান সংঘাতে রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে অতিরঞ্জিত ধারণা না করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। জেমস মার্টিন সেন্টার ফর ননপ্রলিফারেশন স্টাডিজের ইউরেশিয়া কর্মসূচির পরিচালক হান্না নোতে বলেন, ইরানকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে মস্কো।
তিনি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেন, এই যুদ্ধে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়ার কিছু নির্দিষ্ট সীমারেখা রয়েছে। তার ভাষায়, এ কারণেই ইরানকে দেওয়া রাশিয়ার সহায়তা সামরিক অভিযানে কার্যকর ভূমিকা রাখলেও তা যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেওয়ার মতো নয়।
source: Rajneete







