News

মধ্যবর্তী নির্বাচনে মুখোমুখি রিপাবলিকান-ডেমোক্র্যাট, ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ভোট

মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তার প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের প্রথম জাতীয় পর্যায়ে বড় মূল্যায়ন করবেন ভোটাররা।

মঙ্গলবারের (৩ নভেম্বর) এ নির্বাচনে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ ও উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি ও বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। পাশাপাশি ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন, অঙ্গরাজ্যের আইনসভা এবং বিভিন্ন স্থানীয় ও গণভোটের বিষয়েও সিদ্ধান্ত দেবেন ভোটাররা।

নির্বাচনের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— ডেমোক্র্যাটরা কি কংগ্রেসের অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নিতে পারবে? নাকি দুই কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথ আরও প্রশস্ত করবে রিপাবলিকানরা? ফলাফল শুধু আগামী দুই বছরের মার্কিন রাজনীতিই নয়, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দুই দলের রাজনৈতিক কৌশল ও নেতৃত্বের লড়াইকেও প্রভাবিত করবে।

কোথায় কত আসনে নির্বাচন

যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভা কংগ্রেসের দুই কক্ষের সব মিলিয়ে ৪৭০টি আসনে নির্বাচন হচ্ছে। প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতেই ভোট দেবেন নাগরিকরা। অন্যদিকে সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টিতে নির্বাচন হচ্ছে। এর মধ্যে ৩৩টি নিয়মিত নির্বাচন এবং দুটি বিশেষ নির্বাচন।

প্রতিনিধি পরিষদে বর্তমানে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সংকীর্ণ। তাদের আসন ২১৮টি, ডেমোক্র্যাটদের ২১৪টি। একজন স্বতন্ত্র সদস্যের সমর্থন রিপাবলিকানদের পক্ষে, দুটি আসন শূন্য রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসন বাড়াতে হবে।

সিনেটে রিপাবলিকানদের অবস্থান তুলনামূলক শক্তিশালী। সেখানে তাদের আসন ৫৩টি, ডেমোক্র্যাটদের ৪৭টি। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসন বাড়িয়ে ৫১-এ পৌঁছাতে হবে। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা ৫০টি আসন ধরে রাখতে পারলেও ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সের টাইব্রেকিং ভোটের কারণে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখতে পারবে।

এ ছাড়া ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন হচ্ছে। প্রায় সব অঙ্গরাজ্যেই আইনসভার বিভিন্ন আসনে ভোট হবে। ভোটারদের সামনে রয়েছে ১৪৫টি অঙ্গরাজ্যভিত্তিক গণভোট ও ব্যালট প্রস্তাব। এসবের মধ্যে করনীতি, গর্ভপাতের অধিকার, ভোটার পরিচয় যাচাই এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।

কোথায় কার লড়াই, কোন আসনে নজর

প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান তুলনামূলক সুবিধাজনক বলে মনে করছেন জরিপ বিশ্লেষকেরা। জাতীয় পর্যায়ের ভোটের পছন্দ বা জেনেরিক ব্যালট জরিপে ডেমোক্র্যাটরা কয়েক পয়েন্টে এগিয়ে। ফক্স নিউজের সর্বশেষ পূর্বাভাসে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত ২২৩টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। ভালো ফল হলে তাদের আসন ২৪০ পর্যন্ত উঠতে পারে। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের জন্য আসন ধরে রাখার লড়াই কঠিন হয়ে উঠেছে।

প্রতিনিধি পরিষদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোর মধ্যে রয়েছে নিউইয়র্ক, পেনসিলভ্যানিয়া, নিউ জার্সি, ভার্জিনিয়া, ফ্লোরিডা, আইওয়া ও নেব্রাস্কার কয়েকটি আসন। বিশেষ করে ভার্জিনিয়া ও ফ্লোরিডায় রিপাবলিকানদের দখলে থাকা আসনগুলোর প্রাথমিক ফল ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতির একটি ধারণা দিতে পারে।

সিনেটের লড়াই আরও জটিল। কারণ, ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকতে হবে এমন কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে, যেখানে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে টেক্সাস, আইওয়া, ওহাইও, আলাস্কা, কানসাস ও নর্থ ক্যারোলাইনা। পাশাপাশি ডেমোক্র্যাটদের নিজেদের আসন ধরে রাখতে হবে মিশিগান ও জর্জিয়ায়। রিপাবলিকানদের হাত থেকে মেইনের আসন ছিনিয়ে নেওয়াও তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষ জরিপগুলোতে বেশ কয়েকটি আসনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। ১ নভেম্বর প্রকাশিত ইউগভের জরিপে টেক্সাসে জেমস তালারিকো রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটনের চেয়ে ৫১-৪৭ শতাংশে এগিয়ে। কানসাসে ডেমোক্র্যাট অ্যাডাম হ্যামিলটন রিপাবলিকান রজার মার্শালকে ৫০-৪৯ শতাংশে পেছনে ফেলেছেন। আইওয়ায় জশ টুরেক রিপাবলিকান অ্যাশলি হিনসনের চেয়ে এক পয়েন্টে এগিয়ে। ওহাইওতে ডেমোক্র্যাট শেরড ব্রাউন ৫০-৪৮ শতাংশে এগিয়ে আছেন।

এ ছাড়া মেইনে ট্রয় জ্যাকসন, মিশিগানে আবদুল এল-সাইয়েদ এবং আলাস্কায় মেরি পেলটোলার পক্ষেও ইতিবাচক জরিপ এসেছে। তবে এসব জরিপের ব্যবধান খুব বেশি নয়। ভোটার উপস্থিতি, শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত এবং জরিপের ত্রুটির কারণে ফল ভিন্ন হতে পারে।

ফক্স নিউজের চূড়ান্ত পূর্বাভাসেও সিনেটের নিয়ন্ত্রণকে অনিশ্চিত বলা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি হলেও সিনেটের ফল নির্ভর করছে কয়েকটি হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ওপর।

ভোটারদের বিবেচনায় অর্থনীতি ও ইরান যুদ্ধ

এবারের নির্বাচনে ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগ জীবনযাত্রার ব্যয়। খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, বাসাভাড়া ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবও নির্বাচনি প্রচারে বড় বিষয় হয়ে উঠেছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। এই যুদ্ধের পক্ষে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানও ভোটারদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করেছে। অভিবাসননীতিতে কঠোর অভিযান, সীমান্ত নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েও দুই দলের মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়েছে।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার নিম্নমুখী প্রবণতা রিপাবলিকানদের জন্য আরেকটি চ্যালেঞ্জ। ফক্স নিউজের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে ট্রাম্পের জনসমর্থন ছিল ৪৪ শতাংশ, পরে তা কমে ৩৬ শতাংশে নেমেছে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট ভোটারদের মধ্যে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ তুলনামূলক বেশি বলে জরিপে উঠে এসেছে। তবে তরুণ, কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি প্রত্যাশার চেয়ে কম হলে ডেমোক্র্যাটদের হিসাবও বদলে যেতে পারে।

এবারের নির্বাচনে আগাম ভোটও গুরুত্বপূর্ণ। সিবিএস নিউজের ২ নভেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, নির্বাচনের আগেই পাঁচ কোটি ৪০ লাখের বেশি ভোটার ভোট দিয়েছেন।

ট্রাম্পের শেষ ২ বছরে কী প্রভাব পড়বে

মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নয়। এতে প্রেসিডেন্টের পদে কোনো পরিবর্তন আসে না। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে গেলে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা প্রয়োগ ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে।

ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারবেন। অভিবাসন অভিযান, ইরান যুদ্ধ, প্রশাসনিক অনিয়ম, প্রেসিডেন্টের পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

প্রতিনিধি পরিষদের বিভিন্ন কমিটির নেতৃত্বও ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যাবে। ফলে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের শুনানিতে তলব, নথি চাওয়া এবং তদন্তের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ানো সম্ভব হবে।

সিনেটের নিয়ন্ত্রণও ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে পরিস্থিতি আরও পরিবর্তিত হবে। মন্ত্রিসভা ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগ এবং ফেডারেল বিচারক নিয়োগের অনুমোদন সিনেটের হাতে। ফলে ট্রাম্পের পছন্দের নিয়োগগুলো আটকে দেওয়ার সুযোগ পাবে বিরোধী দল। তবে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্টের ভেটো ক্ষমতা অতিক্রম করতে পারবেন না, যদি না উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেন।

অন্যদিকে রিপাবলিকানরা দুই কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্পের জন্য আইন প্রণয়ন ও প্রশাসনিক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়া তুলনামূলক সহজ হবে। করছাড়, প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, অভিবাসননীতি এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে পরিবর্তনের মতো বিষয়ে তিনি দলীয় সমর্থন পাবেন। প্রশাসনের বিরুদ্ধে কংগ্রেসীয় তদন্তের চাপও কম থাকবে।

২০২৮ সালের নির্বাচনেরও প্রস্তুতি

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল দুই দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের লড়াইকেও প্রভাবিত করবে। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প আর প্রার্থী হতে পারবেন না। ফলে রিপাবলিকান পার্টিতে তার উত্তরসূরি কে হবেন, তা নিয়ে আলোচনা এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলটির সাফল্য বা ব্যর্থতা ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সসহ সম্ভাব্য নেতাদের অবস্থানকে প্রভাবিত করতে পারে।

ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও নির্বাচনের ফল ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। দলটির একাংশ অর্থনৈতিক জনতুষ্টিবাদী কর্মসূচির পক্ষে, অন্য অংশ মধ্যপন্থি ভোটারদের কাছে ফেরার কৌশলকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এবারের নির্বাচনে কোন ধারার প্রার্থীরা ভালো করেন, তার ওপর ২০২৮ সালের দলীয় মনোনয়ন লড়াইয়ের গতিপথও নির্ভর করতে পারে।

সব মিলিয়ে ৩ নভেম্বরের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এটি একদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের ওপর ভোটারদের মূল্যায়ন, অন্যদিকে কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের লড়াই।

ফলাফলে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকলে ট্রাম্পের শেষ দুই বছরের শাসন আরও নির্বিঘ্ন হতে পারে। আর ডেমোক্র্যাটরা এক বা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে হোয়াইট হাউজের ওপর নজরদারি ও রাজনৈতিক চাপ বাড়বে। তাই এই নির্বাচন শুধু কংগ্রেসের আসন ভাগাভাগি নয়, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির বাকি সময়ের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণের ভোটও।

source: Rajneete

Back to top button