মার্কিন কর্মকর্তাদের ‘হত্যার ষড়যন্ত্র’ জোরদার ইরানের: গোয়েন্দা প্রতিবেদন

মার্কিন নাগরিক ও কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হামলার প্রস্তুতি জোরদার করেছে ইরান। শুধু তাই নয়, দেশটির পক্ষ থেকে মার্কিন কর্মকর্তাদের হত্যার যেসব ‘ষড়যন্ত্র’ চলছে, সেগুলো ‘অগ্রসর পর্যায়ে’ও পৌঁছেছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার এমন সতর্কবার্তার পর মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের কূটনৈতিক মিশনে লোকবল কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওয়াশিংটন।
ইরানের দুজন কর্মকর্তাও মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হামলার প্রচেষ্টা জোরদারের তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যেভাবে হামলা চালিয়ে একের পর এক ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যা করেছেন, তাতে ইরানও মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর হামলা ও তাদের হত্যা করাকে ‘ন্যায্য’ বলে মনে করে।
মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস ও নিউইয়র্ক টাইমস এ খবর দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক জে ক্লেটন গত ২৩ অক্টোবর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে এ সংক্রান্ত একটি মেমো পাঠিয়েছেন।
মেমোতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী মার্কিন কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করার প্রচেষ্টা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে’ ইরান। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের আরও কিছু দেশে মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী হামলার ষড়যন্ত্র ‘অগ্রসর পর্যায়ে’ রয়েছে।
মেমোটিতে ক্লেটন বলেন, বিষয়টি নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য বর্তমানে যেসব মার্কিন কর্মকর্তার কাছে পৌঁছানোর অনুমতি রয়েছে, তার চেয়েও বৃহত্তর পরিসরে তা জানানো প্রয়োজন। এ জন্য সংবেদনশীল তথ্যের যতটা সম্ভব গোপনীয়তা কমিয়ে তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি। মেমোটির অনুলিপি দেওয়া হয় সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফকেও।
অ্যাক্সিওসের খবরে বলা হয়েছে, এই সতর্কবার্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কূটনৈতিক উপস্থিতি কমিয়ে আনার সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের। চলতি সপ্তাহে সৌদি আরবের মার্কিন দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলো থেকে জরুরি নয়— এমন সরকারি কর্মী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয় ওয়াশিংটন।
পরে জর্ডান, লেবানন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মার্কিন মিশনেও লোকবল কমানো হয়। এসব মিশন ‘রেস্ট্রিকটেড অপারেশনস’ অবস্থায় রাখা হয়েছে, যাতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি অনুযায়ী কর্মীসংখ্যা কমানো যায়।
মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের পেছনে দুটি বড় হুমকি কাজ করছে— ইরানের সম্ভাব্য সন্ত্রাসী ‘ষড়যন্ত্র’ এবং ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলা। শনিবার যুক্তরাষ্ট্র উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের এক ডজনের বেশি দেশের জন্য ভ্রমণ সতর্কতাও হালনাগাদ করেছে। তালিকায় রয়েছে সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক ও ইসরায়েল।
নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, মার্কিন গোয়েন্দা সতর্কবার্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন ইরানের দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও, যাদের একজন ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সদস্য। তারা বলেছেন, ইরানের কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং হত্যাকাণ্ডের পর মার্কিন কূটনীতিক ও কর্মকর্তাদের টার্গেট করা তেহরানের কাছে ‘ন্যায্য লক্ষ্য’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে তারা মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার এই মূল্যায়নও নিশ্চিত করেছেন যে মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে ইরান।
তবে মার্কিন গোয়েন্দা মেমোতে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা স্থাপনা, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে কোন দেশ, কিংবা হামলা কবে হতে পারে— এসব উল্লেখ করা হয়নি। ফলে সতর্কবার্তাটিকে তাৎক্ষণিক হামলার ঘোষণা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা অবশ্য বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে এমন কিছু ইরানি অপারেটিভ থাকার তথ্যও রয়েছে, যারা কেবল ইরানি নাগরিক নন। তবে ওই ব্যক্তিদের হামলা চালানোর সক্ষমতা নিয়ে অতিরঞ্জিত তথ্য দেওয়ার প্রবণতা থাকতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত আরও বিপজ্জনক পর্যায়ে ঢোকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রায় আট মাস ধরে চলা এই যুদ্ধের মধ্যে হুতিদের সৌদি আরবের বিরুদ্ধে হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলাও বেড়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান ফের শুরু করার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে।
ফলে ইরানি হামলার আশঙ্কা এখন শুধু যুদ্ধক্ষেত্র বা মার্কিন সামরিক স্থাপনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন কূটনীতিক, সরকারি কর্মকর্তা ও সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তাও বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। আর সেই ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে কূটনৈতিক মিশনগুলোতে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি কমিয়ে আনার পদক্ষেপই দেখিয়ে দিচ্ছে— ওয়াশিংটন হুমকিটিকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে।
source: Rajneete






