News

নেত্রকোনার চায়ের দোকানে জাদুকরী ক্রেন, রূপকার হাতেম আলী

ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপটি হঠাৎ শূন্যে ভেসে চলল। কোনো ওয়েটার বা কর্মচারীর হাত ছাড়াই থালাটি গিয়ে পৌঁছাল একদম বেঞ্চে বসা ক্রেতার সামনে। প্রথম দর্শনে মনে হতে পারে কোনো জাদুকরী কৌশল, কিন্তু ভুল ভাঙবে দোকানের ভেতরে নজর দিলেই। সেখানে শান্ত হয়ে বসে এক মধ্যবয়সী মানুষ কাঠের হাতল ঘোরাচ্ছেন। আর তারের টানে ঝুলন্ত ক্রেনের মতো এগিয়ে চলছে সেই চায়ের থালা।

নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের পাশে জারিয়া ইউনিয়নের বারহা বোর্ডবাজারের প্রতিদিনের দৃশ্য এটি। আর এই অদ্ভুত যান্ত্রিক আশ্চর্যের রূপকার ৫২ বছর বয়সী মো. হাতেম আলী।

পেশায় কাঠমিস্ত্রি ও চা-বিক্রেতা হাতেম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মুখ দেখেছেন মাত্র পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। কিন্তু তার তৈরি এই কাঠের ক্রেন দেখতে এখন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন তার দোকানে।

অভাব থেকেই উদ্ভাবন

আরো পড়ুন

গ্রামীণ বাজারে একটি সাধারণ চায়ের দোকান চালাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত কর্মচারী সমস্যায় পড়তে হতো হাতেম আলীকে। একজন সাহায্যকারী রাখলে বেতন ও খাওয়া বাবদ মাসে অন্তত ২০ হাজার টাকা বাড়তি গুনতে হতো। যা মেটানো তার পক্ষে অসম্ভব ছিল। সেই আর্থিক চাপ ও লোকবল সংকট সামলাতেই শুরু হয় তার নিজস্ব ভাবনা।

প্রকৌশলবিদ্যার কোনো বই না পড়েই তিনি মনের ভেতর নকশা করে ফেলেন এক অনন্য কৌশল। বাজার থেকে কাঠ, তার ও কয়েকটি বিয়ারিং কিনে নিজ হাতে তৈরি করেন এক বিশেষ ক্রেন। পুরো ব্যবস্থাটি দাঁড় করাতে তার মোট খরচ হয়েছে মাত্র সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। এখন নিজের আসন না ছেড়েই তিনি ক্রেতাদের হাতে চা, বিস্কুট, পান-সিগারেট পৌঁছে দিচ্ছেন। আবার সেই ঝুলন্ত পাত্রেই বুঝে নিচ্ছেন বিক্রির টাকা।

পুরোনো অভিজ্ঞতার নতুন রূপ হাতেম আলীর এই সৃষ্টিশীলতা নতুন নয়। পেশাগত জীবনের তিন দশক ধরে কাঠমিস্ত্রি হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতাকে তিনি কাজে লাগিয়েছেন নানা সময়ে।

প্রায় ৩০ বছর আগে রেললাইনে মালামাল পরিবহনের সুবিধার জন্য বিয়ারিং ব্যবহার করে বিশেষ ধরনের এক যান বানিয়ে এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। পাশাপাশি কাঠ কেটে সুনিপুণ মানবমূর্তি তৈরি করার হাতযশও রয়েছে তার। সেই পুরোনো অভিজ্ঞতাই এবার রূপ নিয়েছে দৈনন্দিন জীবন সহজ করার যান্ত্রিক প্রযুক্তিতে।

হাতেম আলীর এই যান্ত্রিক কারসাজি দেখে মুগ্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা। স্থানীয় বাবুল মিয়ার ভাষ্যমতে, ব্যতিক্রমী কিছু করার ঝোঁক হাতেম আলীর বহু পুরোনো।

আরেক বাসিন্দা মো. হাবিবুর রহমান জানান, কেবল চা খাওয়ার জন্য নয়, প্রযুক্তির এই চমক স্বচক্ষে দেখতেই অনেকে তার দোকানে আসেন।

জারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম হাতেম আলীর এই মেধার প্রশংসা করে বলেছেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তিনি একজন অত্যন্ত সৃষ্টিশীল মানুষ। সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এমন মেধা গ্রামীণ অর্থনীতি ও প্রযুক্তিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

দিনশেষে বারহা বোর্ডবাজারের এই চায়ের দোকানটি এখন কেবল আড্ডার স্থান নয় বরং গ্রামীণ মেধা আর অদম্য ইচ্ছেশক্তির এক অনন্য প্রদর্শনী।

source: Asia Post

Back to top button