হাসিনা আমলের অর্থ পাচার নিয়ে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তথ্যচিত্র এআইবির চূড়ান্ত তালিকায়

শেখ হাসিনা সরকারের আমলে অর্থ পাচার, ব্যাংক খাতে লুটপাট এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার পটভূমিতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের তৈরি একটি তথ্যচিত্র ২০২৬ সালের সম্মানজনক ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর ইন্টারন্যাশনাল ব্রডকাস্টিং’ (এআইবি) পুরস্কারের চূড়ান্ত তালিকায় (শর্টলিস্ট) জায়গা করে নিয়েছে।
‘বাংলাদেশ’স মিসিং বিলিয়নস, স্টোলেন ইন প্লেইন সাইট’ শিরোনামের এই প্রামাণ্যচিত্রটি ‘ভিডিও-ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স ডকুমেন্টারি’ বিভাগে মনোনীত হয়েছে। আগামী ২০ নভেম্বর লন্ডনের পার্ক হায়াত লন্ডন রিভার থেমসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক এই সংস্থাটি ২০০৫ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে মানসম্পন্ন সাংবাদিকতা ও তথ্যভিত্তিক অনুষ্ঠানকে পুরস্কার দিয়ে আসছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত এই তথ্যচিত্রে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে দেশ থেকে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ, সেই অর্থে গড়া সম্পদের চিত্র এবং পাচার করা অর্থ ফেরানোর প্রাথমিক চেষ্টাগুলো তুলে ধরা হয়। মূলত ব্যাংক খাত, শাসকগোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী মহল ও বিদেশে অর্থ পাচার নিয়ে এফটির প্রায় বছরব্যাপী অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মিত হয়েছে।
তথ্যচিত্রে শেখ হাসিনার পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া শ্বেতপত্রের একটি হিসাব সামনে আনা হয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার অবৈধ উপায়ে বিদেশে পাচার হয়েছে। ব্যাংক দখল, ভুয়া ও সন্দেহজনক ঋণ বিতরণ, বাণিজ্যের আড়ালে অর্থ পাচার এবং আমদানিতে দর বাড়িয়ে দেখানোর মতো বিভিন্ন কারসাজির বিশদ বিবরণ এতে স্থান পেয়েছে।
২০২৪ সালের অক্টোবরে তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর ফিন্যান্সিয়াল টাইমস-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, শেখ হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো একাই ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলার সরিয়ে নিয়েছে। সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে থাকা শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তির তথ্যও প্রামাণ্যচিত্রটিতে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
এর আগে বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচারের ঘটনা নিয়ে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের রিপোর্টিং-এর বাইরেও আলজাজিরার ইনভেস্টিগেটিভ ইউনিটের ‘দ্য মিনিস্টার’স মিলিয়নস’, দ্য গার্ডিয়ানের ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের যৌথ গবেষণা এবং ওসিসিআরপির পৃথক বেশ কিছু আন্তর্জাতিক অনুসন্ধান প্রকাশ পায়। এফটির এই প্রামাণ্যচিত্রে এসব খণ্ড খণ্ড অনুসন্ধানের গতিপথকে একসাথে যুক্ত করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যাংক থেকে শুরু করে বিদেশের সম্পত্তির বাজার পর্যন্ত অর্থের প্রবাহ অনুসরণ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি ভারতে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানো ও ব্যাংক খাতের সংস্কার শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে স্থান পায়। তথ্যচিত্রটির শুটিং চলাকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর এতে সাক্ষাৎকার দেন। পাশাপাশি এতে বিশিষ্ট সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ, দুর্নীতিবিরোধী বিশেষজ্ঞ এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের বক্তব্য রয়েছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এই প্রামাণ্যচিত্রটির অন্যতম গবেষক ও প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন বাংলাদেশি সাংবাদিক ও এফটির প্রতিবেদক রেদওয়ান আহমেদ।
কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে রেদওয়ান আহমেদ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে বাংলাদেশের এমন একটা জটিল গল্প তুলে ধরা যেমন চ্যালেঞ্জিং, তেমনি ভীষণ তৃপ্তিদায়ক। আমাদের সমাজের ভেতরের নানা রাজনৈতিক ও সামাজিক সমীকরণ সামলে এমনভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করতে হয়েছে, যেন বৈশ্বিক অডিয়েন্স জটিলতাগুলো সহজেই বুঝতে পারেন। ফলে ব্যাংক দখল ও অর্থ পাচারের মতো খটোমটো বিষয়কে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করাই ছিল মূল কাজ।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে আমরা বহু মাস ধরে এই ইস্যুর নানা দিক নিয়ে রিপোর্ট করেছি। প্রামাণ্যচিত্রটিতে সেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা খবরগুলোকে এক সুতোয় বেঁধে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হয়েছে। এটি যেমন দেশ-বিদেশের সাধারণ দর্শককে পুরো ঘটনাটি একনজরে বুঝতে সাহায্য করবে, তেমনি ভবিষ্যতে এই বিষয়ের গবেষকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক রেফারেন্স হয়ে থাকবে।’
পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষে নির্বাচিত বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব পালন করছেন। তবে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ শনাক্ত ও তা ফিরিয়ে আনার আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এখনও চলমান। এ কারণে এফটির তৈরি এই তথ্যচিত্রটি বাংলাদেশের অর্থ পাচারের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ পর্বের প্রামাণ্য নথি হিসেবে রয়ে গেছে।
রেদওয়ান ছাড়াও এই ডকুমেন্টারির সিনেমাটোগ্রাফারদের একজন ছিলেন বাংলাদেশের সালমান সাইদ। এছাড়াও বর্তমানে লন্ডনে এফটির করেসপনডেন্ট এবং আগে বাংলাদেশে থেকে কাজ করা সাংবাদিক সুজানা স্যাভেজ-কেও এই ডকুমেন্টারিতে দেখা যায়।
source: Asia Post







