ওয়াশিংটনে নজিরবিহীন সংবর্ধনায় সিক্ত জিনপিং, আরও ২ মাস চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যবিরতি

চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যযুদ্ধের উত্তেজনা সাময়িকভাবে কমিয়ে আনতে দুই দেশের মধ্যে চলমান বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ আরও দুই মাস বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যেই তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তাকে স্বাগত জানাতে সরসারি বিমানঘাঁটিতে উপস্থিত হয়ে নতুন নজির স্থাপন করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, দিয়েছেন বিরল কূটনৈতিক বার্তা।
ওয়াশিংটন পোস্টের খবরে বলা হয়, বুধবার শি জিনপিংকে বহনকারী বিমান ওয়াশিংটনের বাইরে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে অবতরণ করলে ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প উপস্থিত থেকে চীনা প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রী পেং লিয়ুয়ানকে অভ্যর্থনা জানান। সাধারণত মার্কিন প্রেসিডেন্টরা বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানদের হোয়াইট হাউজে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান, বিমানঘাঁটিতে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবে অভ্যর্থনা জানানোর ঘটনা বিরল।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এর আগে ১১ বছর ধরে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিদেশি নেতাকে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে এভাবে স্বাগত জানাননি। ফলে জিনপিং-ট্রাম্পের এই সাক্ষাৎকে তাই কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং দুই পরাশক্তির সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়ার একটি দৃশ্যমান বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
আল-জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, অভ্যর্থনা অনুষ্ঠানে ট্রাম্প ও শি এবং তাদের স্ত্রীরা করমর্দন করেন, কিছুক্ষণ কথা বলেন ও ছবি তোলেন। এ সময় সামরিক ব্যান্ড বাজানো হয়, কামানের গোলা ছোড়া হয় এবং আকাশে বি-১ বোমারু বিমানের উড্ডয়ন প্রদর্শন করা হয়।
১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বাণিজ্যবিরতি
এদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, জিনপিংয়ের ওয়াশিংটন সফরের আগেই দুই দেশ বাণিজ্যবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বুধবার জানান, ‘বুসান অ্যাগ্রিমেন্ট’ নামে পরিচিত দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে করা চুক্তি আরও দুই মাস কার্যকর থাকবে। চুক্তিটির বর্তমান মেয়াদ ১০ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তা ২০২৭ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত বহাল থাকবে।
বেসেন্ট বলেন, তিনি চীনের ভাইস প্রিমিয়ার হে লিফেংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ছোট ছোট কয়েকটি সমঝোতার বদলে আরও বড় একটি চুক্তির দিকে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করাই তাদের আলোচনার লক্ষ্য।
এর ফলে অন্তত আগামী কয়েক মাস যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে নতুন করে বড় ধরনের শুল্কযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঝুঁকি কমল। তবে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য ও প্রযুক্তিগত বিরোধের সমাধান এখনো হয়নি।
একই বছরে ২ নেতার দ্বিতীয় বৈঠক
জিনপিংয়ের এবারের সফরটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ চলতি বছরেই তিনি এ নিয়ে দ্বিতীয়বার মুখোমুখি হচ্ছেন ট্রাম্পের। এর আগে মে মাসে বেইজিংয়ে ট্রাম্পকে স্বাগত জানিয়েছিলেন জিনপিং। এবার পালা ট্রাম্পের।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এক বছরের মধ্যে বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির শীর্ষ নেতাদের পারস্পারিক দেশে সফর এবং সরাসরি আলোচনায় বসা দুই দেশের সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখার প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দিচ্ছে। চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক গত এক বছরে শুল্ক, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ব্যাপক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাওয়ায় দুই নেতার সাক্ষাৎকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
স্টিমসন সেন্টারের চায়না প্রোগ্রামের পরিচালক ইউন সান শির এবারের সফরকে ‘নজিরবিহীন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, বিশ্বের দুই শীর্ষ শক্তির নেতাদের একই বছরে একে অন্যের দেশে সফর করার নজির যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ইতিহাসে খুবই বিরল।
ইউনের মতে, মাত্র এক বছর আগেও দুই দেশ পরস্পরের পণ্যে শুল্ক বাড়ানো এবং প্রযুক্তি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কঠোর করার পথে এগোচ্ছিল। এখন সেই উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রেখে সম্পর্ককে একটি স্থিতিশীল পর্যায়ে রাখার চেষ্টা চলছে।
বাণিজ্যের বাইরে আলোচনায় তাইওয়ান ও এআই
ট্রাম্প ও জিনপিংয়ের বৈঠকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হবে বাণিজ্য। তবে আলোচনার পরিধি শুধু শুল্ক ও পণ্য বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই, তাইওয়ান ও মধ্যপ্রাচ্যের ইরান যুদ্ধও আলোচনায় আসতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। বিশেষ করে এআই নিয়ে দুই দেশের প্রতিযোগিতা এখন অর্থনীতি ছাড়িয়ে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এআই প্রযুক্তিতে নিজের নেতৃত্ব ধরে রাখতে চায়, অন্যদিকে চীনও দ্রুত নিজস্ব প্রযুক্তি সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে এআই-সংক্রান্ত নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি যোগাযোগের একটি ব্যবস্থাও আলোচনায় রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘নোটিফিকেশন মেকানিজম’ বা পারস্পরিক সতর্কীকরণ ব্যবস্থা তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে। কোনো দেশে এআই-সম্পর্কিত বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি দেখা দিলে অপর দেশকে দ্রুত জানানোর ব্যবস্থা হতে পারে এটি। এমন একটি ব্যবস্থাকে শীতল যুদ্ধের সময়কার যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত ‘হটলাইনে’র সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
তাইওয়ানেও চাপ বাড়াতে পারে বেইজিং
জিনপিংয়ের আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে তাইওয়ান ইস্যু। চীন তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ডের অংশ মনে করে এবং দ্বীপটির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা ও অস্ত্র বিক্রির তীব্র বিরোধিতা করে।
রয়টার্স এক প্রতিবেদনে বলেছে, ওয়াশিংটনে জিনপিং ট্রাম্পের কাছে তাইওয়ানের জন্য মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধ বা কমানোর দাবি তুলতে পারেন। এর মধ্যে কংগ্রেস অনুমোদিত প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজও রয়েছে, যার বাস্তবায়ন এখনো এগোয়নি।
বেইজিংয়ের দৃষ্টিতে তাইওয়ান ইস্যু চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি। অন্যদিকে ওয়াশিংটন তাইওয়ানের আত্মরক্ষার সক্ষমতা বজায় রাখার নীতি অনুসরণ করে আসছে। ফলে বাণিজ্যে সমঝোতার পরিবেশ তৈরি হলেও এই ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থানগত দূরত্ব বজায় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
জিনপিংয়ের জন্য রাজকীয় আয়োজন
জিনপিং সফরে আনুষ্ঠানিকতারও কমতি থাকছে না। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজে তার জন্য রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। এরপর দুই নেতা বৈঠকে বসবেন। থাকবে সামরিক আনুষ্ঠানিকতা ও রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ।
নৈশভোজে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ নির্বাহীদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন আমাজনের জেফ বেজোস, গুগলের সুন্দর পিচাই, ওপেনএআইয়ের স্যাম অল্টম্যান, টেসলার ইলন মাস্ক, এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং ও ডেলের মাইকেল ডেলের মতো ব্যক্তিরা।
source: Rajneete







