News

সৌদি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পেলে কতটা পরিবর্তন আসতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যে?

সৌদি আরবের কাছে ৪৮টি অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি অনুমোদন করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রায় ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তিতে শুধু যুদ্ধবিমান নয়, ৪৯টি প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনি ইঞ্জিন, যোগাযোগ সরঞ্জাম, খুচরা যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য সহায়ক সরঞ্জামও থাকবে। পর্যালোচনা করে মার্কিন কংগ্রেস এ চুক্তি অনুমোদন করলেই তা কার্যকর হবে।

এ চুক্তিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে এ প্রেক্ষাপটে যে আধুনিক যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ কোনো আরব দেশের কাছে নেই। গোটা মধ্যপ্রাচ্যেও কেবল ইসরায়েলের কাছে রয়েছে এই যুদ্ধবিমান। ফলে চুক্তি হলে সৌদি আরব হবে আরব বিশ্বের প্রথম ও মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় দেশ, যার কাছে এফ-৩৫ থাকবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এ কারণেই এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণে নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে। সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের সখ্যের বিপরীতে ইসরায়েলের বৈরিতার প্রেক্ষাপটে গোটা অঞ্চলের রাজনীতিতেও এই চুক্তির প্রভাব পড়বে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, এই চুক্তি কার্যকর হলে সৌদি আরবের ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা জোরদার হবে, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ হুমকি প্রতিরোধের সক্ষমতা বাড়বে এবং মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে সৌদি সামরিক বাহিনীর আন্তঃকার্যক্ষমতা উন্নত হবে।

ওয়াশিংটনের ভাষ্য, সৌদি আরব উপসাগরীয় অঞ্চলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এবং এই চুক্তি দেশটির নিরাপত্তা জোরদারে ভূমিকা রাখবে।

এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কী?

এফ-৩৫ লাইটনিং-২ যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পঞ্চম প্রজন্মের একক-ইঞ্জিনের স্টেলথ বহুমুখী যুদ্ধবিমান। এটি মূলত এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যেন শত্রুর রাডারে শনাক্ত হওয়ার ঝুঁকি কম রেখে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, আকাশযুদ্ধ ও স্থল লক্ষ্যবস্তুতে হামলাসহ বিভিন্ন ধরনের মিশন পরিচালনা করতে পারে।

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু এর স্টেলথ প্রযুক্তি নয়; বরং উন্নত রাডার, ইলেকট্রনিক সেন্সর ও অন্যান্য উৎস থেকে পাওয়া তথ্য এক করে পাইলটকে যুদ্ধক্ষেত্রের একটি সমন্বিত চিত্র দেওয়ার সেন্সর ফিউশন সক্ষমতাই একে অন্য অনেক যুদ্ধবিমান থেকে আলাদা করেছে।

এখানেই শেষ নয়, এটি অন্যান্য যুদ্ধবিমান, ড্রোন ও সামরিক ব্যবস্থার সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানও করতে পারে। ফলে এফ-৩৫কে শুধু একটি যুদ্ধবিমান হিসেবে নয়, বরং আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহ, লক্ষ্য শনাক্তকরণ ও সামরিক অভিযানের সমন্বয়কারী একটি উড়ন্ত নেটওয়ার্ক হিসেবেও দেখা হয়। এ কারণেই বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিমানগুলোর একটি হিসেবে এফ-৩৫কে বিবেচনা করা হয়।

সৌদি-হুতি সংঘাতের মধ্যে হামলা

চুক্তিটির ঘোষণা এমন সময়ে এলো, যখন ইয়েমেনে সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুতিদের মধ্যে লড়াই আবার তীব্র হয়েছে। বুধবার হুতিরা দাবি করে, মারিবের আকাশে তারা একটি সৌদি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। এ দাবির পক্ষে তারা একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত সৌদি প্রতীক বহনকারী একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষের সামনে হুতিদের যোদ্ধাদের দেখা যায়।

হুতিদের দাবি, বিমানটি তারা ‘স্থানীয়ভাবে তৈরি’ ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ভূপাতিত করেছে। দাবিটি সত্য হলে তা ইয়েমেনে সৌদি বিমানবাহিনীর দীর্ঘদিনের আকাশ-সুবিধার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হবে। এতদিন সৌদি বাহিনী ইয়েমেনে বিমান হামলা চালানোর ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বড় সুবিধা ধরে রেখেছিল।

এদিকে বৃহস্পতিবার সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে লড়াইয়ে অন্তত পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে তিনজন শিশু। সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরব ওয়াশিংটনকে হুতিদের বিরুদ্ধে আরও সরাসরি ভূমিকা রাখার আহ্বান জানালেও যুক্তরাষ্ট্র এখনো সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর অবস্থান নেয়নি।

এই প্রেক্ষাপটে এফ-২৫ যুদ্ধবিমান চুক্তিকে শুধু দীর্ঘমেয়াদি সামরিক আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে নয়, সৌদি নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমর্থনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এফ-৩৫ পেলে কতটা বাড়বে সৌদি সামরিক সক্ষমতা

সৌদি আরবের বিমানবাহিনী মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় ও আধুনিক বিমানবাহিনী। তাদের বহরে রয়েছে মার্কিন এফ-১৫সি/এস/এসএ, ইউরোপীয় ইউরোফাইটার টাইফুন ও টর্নেডো যুদ্ধবিমান। চ্যাথাম হাউজের এ বছরেরই এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সৌদি বিমানবাহিনীতে উন্নত সক্ষমতার এসব যুদ্ধবিমানসহ প্রায় ৪৪৯টি বিভিন্ন ধরনের বিমান রয়েছে।

অন্য একটি বিমানবাহিনীভিত্তিক ডেটাবেজে সৌদি যুদ্ধবিমান বহরে ১৬৭টি এফ-১৫এস/এসএ. ৮১টি টর্নেডো আইডিএস, ৭১টি টাইফুন ও ৪৩টি এফ-১৫সি বিমান দেখানো হয়েছে। চ্যাথাম হাউজের পরিসংখ্যানের সঙ্গে এই পরিসংখ্যানের পার্থক্য থাকলেও এটি স্পষ্ট— এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ছাড়াই সৌদি আরবের বিমান বাহিনী যথেষ্ট শক্তিশালী, এফ-৩৫ যেখানে পঞ্চম প্রজন্মের সক্ষমতা যুক্ত করতে পারে।

এফ-১৫এস/এসএ ও টাইফুনের মতো চতুর্থ প্রজন্মের উন্নত যুদ্ধবিমান প্রচলিত আকাশযুদ্ধে অত্যন্ত সক্ষম। কিন্তু এফ-৩৫-এর মূল সুবিধা শুধু গতি বা অস্ত্র বহনের ক্ষমতা নয়; বরং স্টেলথ, রাডার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ও বিভিন্ন সেন্সরের তথ্য একীভূত করে পাইলটকে সমন্বিত যুদ্ধক্ষেত্রের একটি ছবি দেওয়ার যে ক্ষমতা, সেটিই একে সম্পূর্ণ ভিন্ন শ্রেণির প্ল্যাটফর্মে পরিণত করেছে।

অর্থাৎ সৌদি আরব এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পেলে দেশটি শুধু আরও একটি যুদ্ধবিমান পাবে না, বরং আকাশযুদ্ধের তথ্য সংগ্রহ ও পরিচালনার নতুন সক্ষমতা পাবে।

ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক দ্বন্দ্ব

আরব বিশ্বের প্রথম ও মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় দেশ হিসেবে সৌদি আরব এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পেলে তা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক শক্তি ও ক্ষমতার ভারসাম্যকে বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। কারণ এই চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের পর সৌদি আরবই প্রথম এই যুদ্ধবিমান ব্যবহারের সুযোগ পাবে, যা নিঃসন্দেহে তাদের সামরিক সক্ষমতাকে এক ধাপ বাড়িয়ে দেবে।

এ কারণেই এই চুক্তিকে দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ বা সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের তুলনায় প্রযুক্তিগত ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে হবে। এফ-৩৫ পেলে সেই শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সুযোগ পেতে পারে সৌদি আরব।

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নোটিশে অবশ্য বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত অস্ত্র ও সহায়তা ‘এই অঞ্চলের সামরিক ভারসাম্য পরিবর্তন করবে না’। অর্থাৎ সৌদিকে বিমান দেওয়ার পরও ইসরায়েলের সামরিক সুবিধা অক্ষুণ্ন থাকবে— এমন হিসাবেই চুক্তিটি এগোনোর কথা বলছে ওয়াশিংটন।

তবু ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবকে এফ-৩৫ দেওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রিয়াদ ও তেল আবিবের সম্ভাব্য সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে মার্কিন প্রচেষ্টা। সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে এগোলে ওয়াশিংটন-রিয়াদ নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও গভীর হতে পারে, আর এফ-৩৫ সেই বৃহত্তর সমীকরণের অংশ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

জিউয়িশ ইনস্টিটিউব ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি অব আমেরিকার (জিনসা) ফেলো জোনাথন রুহে মনে করেন, এফ-৩৫ কর্মসূচিই মূলত যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা কাঠামোকে সমর্থন করার জন্য তৈরি। তিনি বলেন, ‘সৌদিকে এফ-৩৫ দেওয়ার আগে ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখা ও রিয়াদকে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় আরও গভীরভাবে যুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।’

সামরিক সক্ষমতার সমীকরণে যুক্ত ইরানও

কেবল ইসরায়েল নয়, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ও সৌদি আরবের সামরিক সক্ষমতার সঙ্গে ইরানের নামও জড়িয়ে রয়েছে। ইরানের বিমানবাহিনীর বড় অংশ তুলনামূলক পুরোনো। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও দীর্ঘদিনের যন্ত্রাংশ সংকটের কারণে তাদের প্রচলিত যুদ্ধবিমান বহর সৌদি আরবের তুলনায় আধুনিকতার দিক থেকে পিছিয়ে। তবে এর বিপরীতে ইরান গত কয়েক দশকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিভিন্ন ধরনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে সামরিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত করেছে।

এ কারণে সৌদি-ইরান সামরিক প্রতিযোগিতা মূলত শুধু ‘কার বেশি আধুনিক যুদ্ধবিমান রয়েছে’ প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। তারপরও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের বহুমুখী সক্ষমতা নিঃসন্দেহে সৌদি আরবকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে। বিশেষ করে এই যুদ্ধবিমানের সঙ্গে সঙ্গে সৌদি আরব আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে আরও জোরদারে মনোযোগী হলে তা ইরান-সৌদি সামরিক সম্পর্কের চিত্র বদলে দিতে পারে অনেকটাই।

চীনের হাতে প্রযুক্তি চলে যাওয়ার আশঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে যুদ্ধবিমানের এই চুক্তির সবচেয়ে বড় আপত্তিগুলোর একটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিজের গোয়েন্দা মহল থেকেই। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন— সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের সামরিক, নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে বেইজিং এফ-৩৫-এর গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি ঘাঁটিতে চীনের সম্ভাব্য সামরিক প্রবেশাধিকার এবং সৌদি টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোয় চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার এ উদ্বেগের অন্যতম কারণ।

মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের গোয়েন্দা কমিটির সদস্য রাজা কৃষ্ণমূর্তিও এ কারণেই চুক্তির বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের (যুক্তরাষ্ট্র) গোয়েন্দা বাহিনীগুলোই যখন সতর্ক করছে যে এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক প্রযুক্তি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (চীনের ক্ষমতাসীন দল) নাগালের মধ্যে চলে যেতে পারে, তখন বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

জিনসার ফেলো জোনাথন রুহেও এই যুদ্ধবিমানের সঙ্গে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক নিয়ে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে একটি সামগ্রিক ও দীর্ঘদিন ধরে জিইয়ে রাখা বিষয়ে সমঝোতা প্রয়োজন। প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি নিয়ে সৌদি-চীন সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে উদ্বেগ, এই সমঝোতা তার আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটাতে পারে।

এখানে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দ্বৈত স্বার্থও কাজ করছে— একদিকে সৌদি আরবকে নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে আরও শক্তিশালী করা, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে সৌদি আরবের বাড়তে থাকা সম্পর্কের কারণে মার্কিন সামরিক প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এই দুটির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ।

আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রভাব, নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতার শঙ্কা

বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিটি কার্যকর হয়ে গেলে সৌদি আরবের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানপ্রাপ্তি গোটা মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যের ওপরই প্রভাব ফেলতে পারে। এর ফলে গোটা অঞ্চলে নতুন করে শুরু হয়ে যেতে পারে অস্ত্র প্রতিযোগিতা।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সৌদি আরব এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পেলে অন্য দেশগুলোও নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর চাপ অনুভব করতে পারে। এ ক্ষেত্রে ইসরায়েল তাদের যুদ্ধবিমান বহরের পাশাপাশি অন্যান্য অস্ত্র, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধাস্ত্র ও গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিনিয়োগে মনোযোগী হতে পারে।

সৌদি আরবের সামরিক সক্ষমতা বাড়লে ইরানও ধাবিতে হতে পারে সেদিকে। তবে ইরান যুদ্ধবিমানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যাওয়ার পথে হয়তো হাঁটবে না। তারা বরং এর বদলে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, বৈদ্যুতিক যুদ্ধাস্ত্র, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও তাদের সীমায় প্রবেশযোগ্যতা নিশ্ছিদ্র করার দিকে বেশি মনোযোগী হতে পারে।

উপসাগরীয় অঞ্চলের বাকি দেশগুলোর জন্যও মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠতে পারে সৌদি আরবের এফ-৩৫ ‍যুদ্ধবিমান। তখন সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্য মিত্র দেশগুলো আরও যুদ্ধবিমান, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ও সেন্সর ব্যবস্থা চাইতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। অর্থাৎ সৌদি আরবের বহরে এই এক যুদ্ধবিমানের যুক্ত হওয়ার ঘটনা সামরিক সক্ষমতা ও যুদ্ধাস্ত্রের মজুত নিয়ে গোটা এলাকার সব দেশকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলতে পারে, যা নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতাকে বাস্তবে রূপ দিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা স্টিফেন ব্রায়েনও এই যুদ্ধবিমান চুক্তি ঘিরে আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কংগ্রেসকে এ বিষয়গুলো সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

ব্রায়েন বলেন, সৌদি প্রতিরক্ষা খাতে চীনের প্রভাব ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের জন্য প্রযোজ্য সম্ভাব্য সুরক্ষাব্যবস্থা নিয়ে কংগ্রেসকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করতে হবে। সৌদি আরবের কাছে এই যুদ্ধবিমানের বিক্রি আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে কী প্রভাব পড়তে পারে— সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কংগ্রেসের সামনে বড় পরীক্ষা

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনুমোদন দেওয়ার পর এখন সৌদি আরবের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির চুক্তি অনুমোদন পেতে হবে কংগ্রেস থেকে। কংগ্রেসের পর্যালোচনার পরই চুক্তিটি পরবর্তী ধাপে যাবে। ফলে সৌদির কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির বিষয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে চীনের কাছে প্রযুক্তি ফাঁসের আশঙ্কা, ইসরায়েলের আঞ্চলিক সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ও সৌদি আরবের মানবাধিকার রেকর্ড— এসব বিষয় কংগ্রেসে আলোচনায় আসতে পারে।

এর আগে সৌদি আরব ২০২৫ সালের শুরুতেই ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহ জানিয়েছিল। দেশটি বহুদিন ধরে এই যুদ্ধবিমান পাওয়ার চেষ্টা করছে। কংগ্রেসে অনুমোদনের পালা বাকি থাকলেও মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনকে সৌদি আরবের সেই প্রচেষ্টা অর্জনের পথে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

ওয়াশিংটন-রিয়াদ সম্পর্কের নতুন মাত্রা

এফ-৩৫ চুক্তিটি সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককেও নতুন মাত্রা দিচ্ছে। একই সময়ে রিয়াদ নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ওয়াশিংটনের ওপর একক নির্ভরতা কমানোর চেষ্টাও করছে।

গত মাসে সৌদি আরব পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, যা দেশটির বহুমুখী নিরাপত্তা অংশীদারত্ব তৈরির প্রচেষ্টার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কও ক্রমেই গভীর হয়েছে। ফলে রিয়াদকে সবচেয়ে উন্নত মার্কিন যুদ্ধবিমান দেওয়ার সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটন একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও দৃঢ় করছে, অন্যদিকে চীন-সৌদি ঘনিষ্ঠতার কারণে তৈরি নিরাপত্তা ঝুঁকিও সামলাতে চাইছে।

সব মিলিয়ে ২৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের এফ-৩৫ চুক্তি শুধু সৌদি বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ইয়েমেনে নতুন করে তীব্র হওয়া সংঘাত, ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার মার্কিন নীতি, চীনের সঙ্গে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠতা ও মধ্যপ্রাচ্যে বদলে যাওয়া নিরাপত্তা সমীকরণের মধ্যে ওয়াশিংটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সিদ্ধান্ত মনে করা হচ্ছে এই চুক্তিকে।

সূত্র: রয়টার্স, এপি, আল-জাজিরা, গার্ডিয়ান, জেরুজালেম পোস্ট, চ্যাথাম হাউজ, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, মিডল ইস্ট মনিটর, নিউইয়র্ক টাইমস, অ্যাক্সিওস

source: Rajneete

Back to top button