সাভারে বোমার ল্যাব স্থাপন করতে চেয়েছিল নব্য জেএমবি

ঢাকার সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির সদস্যরা বোমা তৈরির শক্তিশালী ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা করেছিল বলে দাবি পুলিশের। সে লক্ষ্যে বিভিন্ন বিস্ফোরক দ্রব্যসহ যন্ত্রপাতি জড়ো করছিল বলে গ্রেপ্তারকৃত আরিফের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সদস্যরা।
এদিকে সদস্যপদ গ্রহণ, সংগঠনটির আদর্শ ও সত্তাকে সমর্থন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার প্রস্তুতির অভিযোগে একটি মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় ছয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও ছয়-সাতজনকে আসামি করা হয়েছে বলে সিটিটিসি ও ঢাকা জেলা পুলিশের সূত্রে জানা গেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র বলছে, পুলিশের গাড়িতে হামলা করার হুমকি দিয়েছিল বোমারু মামুন। হুমকি বাস্তবায়নের জন্য সে কী কী পরিকল্পনা করছে, কোথায় হামলা করতে চেয়েছিল—এমন কিছু প্রশ্ন সামনে রেখে আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানায় পুলিশের একটি সূত্র।
সূত্র আরও বলছে, আরিফ বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেও মামুন কোথায়, কখন কী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে, তা কাউকে বলে না। ঘটনার কয়েক মিনিট আগে তাদের জানানো হয়।
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের এক উপপুলিশ কমিশনার নাম প্রকাশ না করার শর্তে এশিয়া পোস্টকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে আরিফ বলেছে, বোমারু মামুন বড় ধরনের হামলার যে পরিকল্পনা করছিল, তা বাস্তবায়নের জন্য কেরানীগঞ্জে আস্তানা গড়ে তুলেছিল। অসাবধানতাবশত বোমা বিস্ফোরণের পর সাভারে এসে বোমা তৈরির শক্তিশালী একটি ল্যাব স্থাপন করতে চেয়েছিল। এখানে বোমা তৈরি করে দূরে কোথাও ঘটনা ঘটাতে পারত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেকটা নিরাপদ মনে করে এই বাসায় ইতিমধ্যে প্রেসার কুকার, পাইপসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্রে বোমা তৈরির সরঞ্জাম সংগ্রহ করে।

তিনি আরও বলেন, মামুন সাভারে এই বাসায় যাওয়া-আসা করে কাজ করছিল। সে অন্য কোথাও বাসা নিয়ে বসবাস করে। সেক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, সাভার কিংবা আশপাশের এলাকায় আরও আস্তানা গড়ে তুলতে পারে। এসব বিষয় ছাড়াও আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রেখে আরিফকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। এছাড়াও ভাড়া বাসা থেকে বিস্ফোরক তৈরির নানা সরঞ্জাম, পাঁচটি পাইপ বোমা, ডেটোনেটর, রিমোট-কন্ট্রোলার, রাসায়নিক ও বিয়ারিং বল কোথা থেকে, কীভাবে এবং কাকে দিয়ে সংগ্রহ করে আসছে—এসব তথ্য জানতেও আরিফকে বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়েছে।
পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের এডিসি (ইনভেস্টিগেশন) মাঈন উদ্দীন চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, এই ঘটনায় সাভার মডেল থানায় বুধবার (১২ আগস্ট) একটি মামলা রুজু করা হয়। মামলা নম্বর ৫৫। এতে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর ৬(২), ৮, ৯ ও ১০ ধারার উল্লেখ রয়েছে। মামলার বাদী কাউন্টার টেরোরিজম ইনভেস্টিগেশন বিভাগ, সিটিটিসি, ডিএমপির এসআই (নিরস্ত্র) মো. আলমগীর হোসেন।
তিনি আরও বলেন, মামলায় আসামি ১২ থেকে ১৩ জন। মামলার নথিতে নাম উল্লেখ করা ছয় আসামি হলেন—মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরান (২৬), মো. নাজমুল হাসান মামুন (৩২), মো. আক্কাস আলী (৩০), কামাল হোসেন ডাক্তার (৪৫), বাক্মী (৩০) এবং রাকিব (৩০)। এর সঙ্গে এজাহারে ‘অজ্ঞাতনামা আরও ৬/৭ জন আসামি’ উল্লেখ করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুরের একটি ভাড়া বাসা থেকে বিপুলসংখ্যক আলামত উদ্ধারের কথা। তার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের তরল রাসায়নিক, রাসায়নিক পাউডার, বিস্ফোরকজাতীয় পাউডার, ডেটোনেটর, রিমোট ও কন্ট্রোলার, বৈদ্যুতিক তার, ভোল্টমিটার, স্প্রিং, জিআই তার, বিয়ারিং বল, গ্যাস ক্যান, গ্যাস টর্চ, বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং জিহাদসংক্রান্ত বই। এ ছাড়া পাঁচটি নিষ্ক্রিয়কৃত পাইপ বোমার ধ্বংসাবশেষ (আইইডি) উদ্ধারের কথাও নথিতে রয়েছে। এসব বোমার ধ্বংসাবশেষ জননিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ঘটনাস্থলেই নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণীতে বলা হয়েছে, আসামিরা সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন নব্য জেএমবির সদস্যপদ গ্রহণ করেছে। তারা নিষিদ্ধ সংগঠনের আদর্শ ও সত্তাকে সমর্থন করেছে এবং বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সংহতি, জননিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার উদ্দেশ্যে জনসাধারণের কোনো অংশের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য তৎপর ছিল বলে পুলিশ অভিযোগ করেছে। এজাহারে আরও বলা হয়েছে, পুলিশ অথবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যকে হত্যা কিংবা গুরুতর আঘাত করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত থেকে সন্ত্রাসী কার্য করার উদ্দেশ্যে তারা সমবেত হয়েছিল।
রাতভর কী ঘটেছিল
মামলার এজাহারে ঘটনার সময় ১১ আগস্ট রাত ৭টা ৩৫ মিনিট থেকে ১২ আগস্ট রাত ৩টা ৩৫ মিনিট পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের প্রথম স্থান হিসেবে সাভার থানাধীন বাগবাড়ি থেকে ট্যানারীগামী রাস্তার শেষ মাথায় বিসিক ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যানারি এস্টেটের পশ্চিম দেয়ালসংলগ্ন বেড়িবাঁধের ওপর বটগাছের নিচের এলাকার কথা বলা হয়েছে। এটি তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায়। থানা থেকে স্থানটির দূরত্ব আনুমানিক ছয় কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্বিতীয় স্থানটি সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর গুলশান মোড় এলাকা। সেখানে জনৈক আব্দুল জলিলের তিনতলা ভবনের নিচতলার দক্ষিণ পাশের একটি ভাড়া বাসার কথা উল্লেখ রয়েছে। নথি অনুযায়ী, ওই বাসাটি মামলার অন্যতম নামীয় আসামি মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানের ভাড়া বাসা।
পাঁচটি পাইপ বোমার ধ্বংসাবশেষ
পুলিশের জব্দ তালিকায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামতগুলোর একটি হলো পাঁচটি নিষ্ক্রিয়কৃত পাইপ বোমার ধ্বংসাবশেষ (আইইডি)। নথিতে বলা হয়েছে, তিনটি সাদা রঙের জিপার পলিথিনে এসব ধ্বংসাবশেষ রাখা ছিল। এগুলো জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হওয়ায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ঘটনাস্থলেই নিষ্ক্রিয় করা হয়।
এজাহারের প্রথম জব্দ তালিকাতেও পাঁচটি নিষ্ক্রিয়কৃত পাইপ বোমার ধ্বংসাবশেষের কথা রয়েছে। একই তালিকায় পাইপ বোমা তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে—এমন একটি স্টিল পাইপ ও একটি নাট-বল্টুর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
চাপাতি, সুইচ গিয়ার নাইফ ও মোবাইল ফোন
প্রথম জব্দ তালিকায় স্টিল ও কাঠ মিশ্রিত হাতলযুক্ত স্টেইনলেস স্টিলের একটি চাপাতির কথাও রয়েছে। চাপাতিটির বাটসহ দৈর্ঘ্য ১২ ইঞ্চি বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া ১০ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের স্টিলের হাতলযুক্ত একটি সুইচ গিয়ার নাইফ এবং একটি ব্যাটারি ও সিমযুক্ত নীল রঙের নকিয়া বাটন মোবাইল ফোন উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া একটি কালো রঙের ক্রস-চেস্ট ব্যাগ উদ্ধার করা হয়েছে, যার ওপর ইংরেজিতে ‘WENGER NOBIR’ লেখা ছিল বলে জব্দ তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে।
রাসায়নিকের তালিকাও দীর্ঘ
দক্ষিণ শ্যামপুরের বাসা থেকে চারটি তরল রাসায়নিক ভর্তি বোতল উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে। এর তিনটির ধারণক্ষমতা পাঁচ লিটার এবং একটির চার লিটার। এ ছাড়া সাদা রঙের হাতল ও ঢাকনাযুক্ত একটি তরল রাসায়নিক ভর্তি ড্রাম এবং গায়ে ইংরেজিতে ‘11’ লেখা আরেকটি তরল রাসায়নিক ভর্তি ড্রাম উদ্ধার করা হয় বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। আরও রয়েছে প্রায় ৪০০ গ্রাম রাসায়নিক পাউডার, প্রায় এক কেজি ওজনের কমলা রঙের মতো রাসায়নিক পাউডার এবং প্রায় ১৫০ গ্রাম বিস্ফোরকজাতীয় পাউডার।
জব্দ তালিকায় ‘FertiMAX-NK, POTASSIUM NITRATE’ লেখা একটি প্যাকেটের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। নথির দুই অংশে ওই প্যাকেটের ওজনের বর্ণনায় অমিল রয়েছে—এজাহারের বিবরণে প্রায় এক কেজি বলা হলেও জব্দ তালিকার অংশে প্রায় দুই কেজির উল্লেখ আছে। ফলে প্রকাশের ক্ষেত্রে ওজনটি নিশ্চিত না করে ‘পটাশিয়াম নাইট্রেটের প্যাকেট’ হিসেবে উল্লেখ করাই নিরাপদ।
ডেটোনেটর, রিমোট ও বৈদ্যুতিক তার
জব্দ তালিকায় একটি সাদা পলিথিনে রাখা রিমোট ও কন্ট্রোলারের সঙ্গে একটি ডেটোনেটর পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া একটি সাদা প্লাস্টিকের ব্যাগে অসংখ্য বৈদ্যুতিক তার, একটি ভোল্টমিটার, একটি ডিজিটাল ওয়েট মেশিন, কাঠের হাতলযুক্ত একটি ড্রিল মেশিন, প্রায় দুই ফুট জিআই তার এবং প্রায় ১৪ ইঞ্চি লম্বা একটি স্প্রিং পাওয়া যায় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। জব্দ তালিকায় থাকা এসব আলামত বিস্ফোরক তৈরির কাজে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত ও পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণের বিষয়।
জিহাদসংক্রান্ত তিন বই
পুলিশের জব্দ তালিকায় তিনটি জিহাদসংক্রান্ত বইয়ের উল্লেখ রয়েছে। একটির ওপরের পৃষ্ঠায় ‘জিহাদ সংক্রান্ত উৎকৃষ্ট মাসায়েল’ লেখা রয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বিতীয় বইয়ের ওপরের পৃষ্ঠায় মোল্লা উমারের মৃত্যু নিয়ে একটি প্রসঙ্গ লেখা রয়েছে। তৃতীয় বইটির ওপরের পৃষ্ঠায় ‘সিলসিলাহ’ এ ঈসমিয়াহ’ এবং মূল লেখক হিসেবে আবু হামযাহ আল-কুরাইশির নাম উল্লেখ রয়েছে বলে জব্দ তালিকায় বলা হয়েছে।
বিয়ারিং বল, অ্যাসিড ও গ্যাস ক্যান
জব্দ করা আলামতের মধ্যে ১০টি পলিথিন জিপার প্যাকেটে রাখা ছোট ছোট সিলভার রঙের বিয়ারিং বলের কথাও রয়েছে। এ ছাড়া ‘Nitric Acid’ লেখা একটি কাচের বোতল এবং ‘সালফিউরিক এসিড ৯৮%’ লেখা একটি প্লাস্টিকের বোতল উদ্ধার করা হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। আরও রয়েছে ১০ লিটার ধারণক্ষমতার দুটি তরল রাসায়নিকসহ প্লাস্টিক কনটেইনার, একটি কাচের জগ, ‘SUN’ ও ‘MOON’ লেখা দুটি গ্যাস ক্যান, একটি গ্যাস টর্চ এবং ‘GTS Galaxy Super Gold’ লেখা একটি লাল গ্যাস ল্যাম্প।
জব্দ তালিকার শেষাংশে বলা হয়েছে, উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে ধৃত আসামি মোহাম্মদ আরিফ ওরফে ইমরানের ভাড়া বাসা থেকে আসামির নিজ দেখানো মতে উল্লিখিত আলামতগুলো পাওয়া যায়। পরে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে সেগুলো জব্দ করা হয়।
source: Asia Post







