মেসির জীবনে পাঁচ বছর ব্যবধানে আরেক বেদনাময় ৮ আগস্ট

ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখটি একই, বদলেছে শুধু বছর ও বিদায়ের ধরন। ২০২১ সালের ৮ আগস্ট চোখের জলে নিজের প্রাণপ্রিয় বার্সেলোনাকে বিদায় জানিয়েছিলেন লিওনেল মেসি। ঠিক পাঁচ বছর পর, ২০২৬ সালের একই দিনে তার জীবনে এল আরও গভীর এক শোক। এবার মেসিকে বিদায় বলতে হচ্ছে নিজের বাবা ও দীর্ঘদিনের পথপ্রদর্শক হোর্হে মেসিকে।
শনিবার আর্জেন্টিনার রোজারিওর একটি হাসপাতালে ৬৮ বছর বয়সে মারা গেছেন হোর্হে। বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থতার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তিনি। তবে তার মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ প্রকাশ করেনি পরিবার।
হোর্হে মৃত্যুর খবর সামনে আসার পর পাঁচ বছর আগের সেই ৮ আগস্টের স্মৃতি নতুন করে ফিরে এসেছে। সেদিন ক্যাম্প ন্যুর অডিটোরি ১৮৯৯-এ পরিবারের সদস্য, সতীর্থ ও কর্মকর্তাদের সামনে শেষবারের মতো বার্সেলোনার খেলোয়াড় হিসেবে সংবাদ সম্মেলনে এসেছিলেন মেসি।
কথা শুরু করার আগেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন আর্জেন্টাইন তারকা। স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জোর দেওয়া টিস্যু দিয়ে বারবার চোখ মুছতে হয়েছিল তাকে। মেসি বলেছিলেন, ‘এটি নিঃসন্দেহে আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত।’
মেসির বার্সেলোনা ছাড়ার ঘোষণা অবশ্য এসেছিল তিন দিন আগে, ৫ আগস্ট। আর্থিক সংকট ও লা লিগার বেতনসংক্রান্ত নিয়মের কারণে তার সঙ্গে নতুন চুক্তি করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছিল কাতালান ক্লাবটি। মেসি থাকতে চেয়েছিলেন, বার্সেলোনাও তাকে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ২১ বছরের সম্পর্কের ইতি ঘটে।
৮ আগস্টের সংবাদ সম্মেলনটি তাই ছিল বার্সেলোনার সঙ্গে মেসির আনুষ্ঠানিক বিদায়ের মুহূর্ত। যে ক্লাবে কিশোর বয়সে এসেছিলেন, সেখান থেকে ৩৫টি শিরোপা ও অসংখ্য রেকর্ড নিয়ে বিদায় নিতে হয়েছিল তাকে।
মেসির সেই বার্সেলোনা-যাত্রার শুরুতেও ছিলেন হোর্হে। ছেলের শরীরে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ধরা পড়ার পর ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছিল পরিবারটি। রোজারিওর একটি ধাতব কারখানায় দীর্ঘ সময় কাজ করেও চিকিৎসার খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল তার পক্ষে।
বার্সেলোনা আগ্রহ দেখানোর পর ২০০০ সালে ১৩ বছর বয়সী মেসিকে সঙ্গে নিয়ে স্পেনে যাওয়ার সাহসী সিদ্ধান্ত নেন জর্জ। পরিচিত শহর, চাকরি ও স্বাভাবিক জীবন পেছনে রেখে ছেলের চিকিৎসা ও ফুটবল ক্যারিয়ারের জন্য নতুন দেশে পাড়ি জমান তিনি।
সেই সিদ্ধান্তই বদলে দিয়েছিল মেসি ও বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাস। বার্সেলোনা তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়। বয়সভিত্তিক দল পেরিয়ে মূল দলে জায়গা করে নেন মেসি। এরপর ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ক্লাবটির ইতিহাসের সেরা ফুটবলারদের একজন।
ছেলের ক্যারিয়ার এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হোর্হের ভূমিকাও বদলেছিল। পেশাদার এজেন্ট হিসেবে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনিই হয়ে ওঠেন মেসির প্রধান প্রতিনিধি। চুক্তি, পৃষ্ঠপোষকতা ও গুরুত্বপূর্ণ দলবদলের আলোচনা সামলেছেন দীর্ঘদিন।
২০২১ সালে বার্সেলোনার সঙ্গে মেসির শেষ দিকের আলোচনাতেও যুক্ত ছিলেন হোর্হে। পরে পিএসজিতে যোগদান এবং ২০২৩ সালে ইন্টার মায়ামিতে যাওয়ার প্রক্রিয়ায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল তাঁর।
তবে মেসির কাছে হোর্হের পরিচয় শুধু বাবা কিংবা প্রতিনিধি হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। ম্যাচ শেষে নিজের পারফরম্যান্স নিয়ে বাবার সঙ্গে কথা বলতেন তিনি। বিশ্বের সেরা ফুটবলার হয়ে ওঠার পরও বাবার মতামত তার কাছে আলাদা গুরুত্ব বহন করত।
এক সাক্ষাৎকারে মেসি বলেছিলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই সবসময় বাবার অনুমোদন চাইতাম। ম্যাচ শেষে তাকে জিজ্ঞাসা করতাম, আমাকে কেমন দেখেছে।’
হোর্হেও ছিলেন ছেলের কঠোর সমালোচক। মেসি ভালো খেললেও কোথায় ভুল করেছেন, সেটি ধরিয়ে দিতেন। বাবার সেই সমালোচনাই তাকে প্রতিনিয়ত আরও ভালো ফুটবলার হওয়ার তাগিদ দিয়েছে বলে জানিয়েছিলেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী তারকা।
পাঁচ বছর আগে ৮ আগস্ট মেসিকে বিদায় বলতে হয়েছিল সেই ক্লাবকে, যেখানে তাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন হোর্হে। পাঁচ বছর পর একই তারিখে বিদায় নিলেন সেই মানুষটিই, যার হাত ধরে বার্সেলোনায় শুরু হয়েছিল তার কিংবদন্তি হয়ে ওঠার যাত্রা।
source: Asia Post







