শুক্রবারে জন্ম, শুক্রবারেই চিরবিদায়

সুমধুর কোরআনের তেলাওয়াতে মুগ্ধ করতেন মুহাম্মাদ আরমান হুসাইন। তাকে বড় আশা নিয়ে কোরআনে হাফেজ বানিয়েছেন বাবা রফিকুল ইসলাম। বাবার স্বপ্ন ছিল ছেলে হয়ে উঠবে মাওলানা-মুফতি। সে আশায় ঢাকার নড়াইবাগ ইসলামিয়া মাদ্রাসায় সপ্তম শ্রেণিতে (মিযান জামাত) পড়ছিলেন আরমান।
কিন্তু একটি দুর্ঘটনায় থেমে গেল সব। নিজের মাদ্রাসার উদ্দেশে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিযেছে সে। শুক্রবার (৭ আগস্ট) সিলেটের ওসমানীনগরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে এই কোরআনে হাফেজের জীবনাবসান ঘটে। ছেলেকে হারিয়ে বাবার বুকফাটা আর্তনাদ থামছে না কিছুতে।
কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম দীর্ঘ দিন ধরে সিলেটে থেকে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। তার দুই ছেলে মাদ্রাসায় পড়াশোনা করছিল। বড় ছেলে আরমান হাফেজ হয়ে ঢাকায় উচ্চতর শিক্ষার পথে এগোচ্ছিলেন, ছোট ছেলেও একই ধারায় পড়াশোনা করছে।
ছেলে হারানোর খবর পেয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন রফিকুল ইসলাম। বিলাপ করতে করতে করতে তিনি বলেন, আমি আমার ছেলেকে বলতাম–তোর জন্ম শুক্রবারে, মৃত্যু হলেও যেন শুক্রবারেই হয়। আরও বলতাম, বাবা, শুক্রবারে বেশি বেশি নবীজির ওপর দুরুদ পড়বি। আমি আমার ছেলেকে হাফেজ, মাওলানা ও মুফতি বানাতে চেয়েছিলাম। ঢাকায় পড়াশোনা করাচ্ছিলাম। আল্লাহর কাছে এমনই নিয়ত করেছিলাম।
সন্তান হারানোর শোকে বারবার ভেঙে পড়েন আরমানের বাবা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আল্লাহ নিয়ে গেছেন, আল্লাহ নিয়ে গেছেন। আমার ছেলে কোরআন তেলাওয়াত করত, আল্লাহ আল্লাহ করত। ইনশাআল্লাহ, আমার ছেলে নবীর দরবারের পথে রওনা হয়েছে। ছেলে আর নেই, ছেলে আর নেই। দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। আল্লাহ নিয়ে গেছেন।
শুক্রবার সকালে সিলেটের ওসমানীনগর উপজেলায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ইউনিক পরিবহন ও বেঙ্গল পরিবহনের বাসের সংঘর্ষে ৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। নিহত সবাই ইউনিক পরিবহনের যাত্রী।
নিহতরা হলেন, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর থানার লক্ষ্মীপুর গ্রামের মৃত সাফিউদ্দিনের ছেলে হাজি সাইফুল ইসলাম, সিলেট নগরের দক্ষিণ সুরমা থানার চণ্ডীপুল এলাকার জাহাঙ্গীরের চার বছরের মেয়ে ফাইজা, সিলেটের সোবহানীঘাট এলাকার উত্তম রায়ের ছেলে সপ্তম রায় প্রীতম, কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানার চণ্ডিবের গ্রামের বাবুল মিয়ার মেয়ে বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর থানার বগডহর গ্রামের মৃত বারেক মিয়ার ছেলে আবুল হোসেন, কুমিল্লার বাঙ্গুরা বাজার থানার পীরকাশিমপুর গ্রামের আব্দুস সালামের ছেলে সানিয়াদ জাহাঙ্গীর সৌরভ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানার শেরপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলামের ছেলে মো. সাইফুল ইসলাম ইমন এবং কিশোরগঞ্জের নিকলী থানার ষাইধার (আটরামপুর) গ্রামের রঞ্জিত সূত্রধরের ছেলে রুবেল সূত্রধর।
দুই বাসের অন্তত ২৪ জন যাত্রী আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৪ জন বর্তমানে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
দুর্ঘটনার পর ইউনিক পরিবহনের বাসের পেছনে থাকা একটি গাড়ির ড্যাশক্যামে ধারণ করা ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিপরীত দিক থেকে তীব্র গতিতে ছুটে আসা বেঙ্গল পরিবহনের স্লিপার বাসটি ইউনিক পরিবহনের বাসের সামনের ডান পাশে ধাক্কা দেয়। এই আঘাতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের খাদে গিয়ে পড়ে ইউনিক পরিবহনের বাসটি।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী গণমাধ্যমকে জানান, সামনে থাকা একটি পিকআপ ভ্যানকে ওভারটেক করতে গিয়ে বিপরীত লেনে চলে আসে বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি। তখন দুই বাসের সংঘর্ষ ঘটে।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. উমর রাশেদ মুনীর জানান, দুর্ঘটনার পর হাসপাতালের ক্যাজুয়ালিটি বিভাগে ১৬ জনকে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে পরবর্তীতে ইএনটি, চক্ষু ও নিউরোসার্জারি বিভাগে স্থানান্তর করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নিউরোসার্জারি বিভাগে ভর্তি তিনজনের মধ্যে একজনের সিটিস্ক্যান রিপোর্ট স্বাভাবিক এসেছে। একজনের সিটিস্ক্যান এখনো সম্পন্ন হয়নি এবং আরেকজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আইসিইউতে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
পরিচালক আরও জানান, হাসপাতালে আনা ১৬ জনের মধ্যে একটি শিশুকে প্রথমে মৃত ঘোষণা (ব্রোড ডেড) করা হয়। পরে আরেকজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। বাকি ১৪ জনের মধ্যে দুইজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
আহতদের দেখতে হাসপাতালে যান সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন। তিনি জানান, হতাহতদের আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা হবে। পুলিশ আইনি বিষয়টি দেখবে।
source: Asia Post







