News

২০ হাসপাতালে ২১ হাজার শয্যা, যুক্ত হচ্ছে হেলিকপ্টার-অ্যাম্বুলেন্স

চিকিৎসার জন্য রোগীদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা কমাতে এবং এ খাতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে দেশের স্বাস্থ্য খাতে বড় সুযোগ তৈরি হচ্ছে। চীনের সঙ্গে সরকার-সরকার (জি-টু-জি) পর্যায়ে দেশে তৈরি হতে যাচ্ছে ২০টি আধুনিক ও বিশেষায়িত হাসপাতাল। এগুলোর মোট শয্যাসংখ্যা হবে ২১ হাজার। এ ছাড়া জরুরি চিকিৎসা সেবা ত্বরান্বিত করতে থাকবে ১০০টি অত্যাধুনিক সুবিধা সম্বলিত অ্যাম্বুলেন্স ও চারটি হেলিকপ্টার।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশিদের বিদেশে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা এমনিতেই কমে আসবে। ট্রমা, স্নায়ুরোগ, হৃদরোগ, কিডনি, ক্যানসার ও লিভারের মতো জটিল রোগের সাশ্রয়ী চিকিৎসা মিলবে দেশেই। মান ও সেবার দিক থেকে এটি হবে সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ডের সমতুল্য। একই সঙ্গে দেশের স্বাস্থ্য অর্থনীতিতে সূচিত হবে এক যুগান্তকারী অধ্যায়।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বড় বিনিয়োগের লক্ষ্যে এর মধ্যেই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু করেছে চীন। প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, এই দ্বিপক্ষীয় প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে মোট ২১ হাজার শয্যার ২০টি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে ১৮টি হবে ১ হাজার শয্যার সাধারণ হাসপাতাল। নারী ও শিশুদের জন্য থাকবে দুটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। এগুলোর শয্যা সংখ্যা হবে ৩ হাজারের মতো।

শুধু ভবন বা অবকাঠামো নয়, জরুরি চিকিৎসা সেবা ত্বরান্বিত করতে এই মেগা প্রকল্পের আওতায় ১০০টি অত্যাধুনিক সুবিধা সংবলিত অ্যাম্বুলেন্স ও চারটি হেলিকপ্টারও দেবে চীন। বাংলাদেশ সরকার শুধু জমির সংস্থান করবে, আর অবকাঠামো নির্মাণ থেকে শুরু করে যাবতীয় সরঞ্জামের সব খরচ বহন করবে বেইজিং।

ঢাকার বাইরে অগ্রাধিকার

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিব এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘চীনের তৈরি হাসপাতালগুলোর স্থাপত্য ও নির্মাণশৈলী হবে বিশ্বমানের। স্বাস্থ্যসেবা ঢাকাকেন্দ্রিক না রেখে বিকেন্দ্রীকরণ করার লক্ষ্যে এগুলো স্থাপনের ক্ষেত্রে ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও খুলনা অঞ্চলকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হবে।’

হাসপাতালগুলোতে দেশি-বিদেশি কাঠামোর সংমিশ্রণে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হবে। সেবার মান সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ বা ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালের মতো হলেও রোগ নির্ণয় পরীক্ষা ও চিকিৎসার ফি রাখা হবে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে।

নীলফামারীতে বিশেষায়িত হাসপাতাল

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে রংপুর অঞ্চলের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে নীলফামারীতে ১ হাজার শয্যার একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে মাঠ পর্যায়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়।

সম্প্রতি সেই প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী। চীনা অর্থায়ন ও সহায়তায় প্রস্তাবিত এই মেগা প্রকল্পটিকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও বাস্তবায়নযোগ্য বলে জানিয়েছেন তিনি।

মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। নির্দেশনার পর একটি বিশেষজ্ঞ টিম নিয়ে তিনি নীলফামারীতে যান।

প্রকল্পের সম্ভাব্যতা তুলে ধরে স্বাস্থ্য সচিব বলেন, ‘প্রস্তাবিত স্থানটি একটি হাইওয়ের পাশে এবং সেখানে সরকারি জমি রয়েছে। ফলে খুব কম দামে জমি পাওয়া সম্ভব। এটি বাস্তবায়িত হলে পুরো অঞ্চলে চিকিৎসা সেবার একটি মূল কেন্দ্র বা হাব গড়ে উঠবে।’

তিনি জানান, স্থানটির পাশেই সৈয়দপুর বিমানবন্দর ও রেলযোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া নিকটবর্তী উত্তরা ইপিজেডে চীনা বিনিয়োগ রয়েছে। সামনে আরও বিনিয়োগ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। নীলফামারীসহ আশপাশের একাধিক জেলার চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত মানুষের কাছে এটি বিশেষায়িত সেবা পৌঁছে দিতে সহায়ক হবে।

চীনা মেগা প্রকল্প বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে? এমন প্রশ্নে মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘সরকারি উদ্যোগে এ ধরনের বড় বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে তা জনগণের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’

দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চীন দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের জন্য সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। ঢাকার পক্ষ থেকে আন্তরিকতা বজায় রেখে আলোচনা এগিয়ে নিলে দ্রুত এটি আলোর মুখ দেখবে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরকে কেন্দ্র করে দ্রুত এই মেগা প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘চীনের সহায়তায় দেশে ২০টি অত্যাধুনিক হাসপাতাল তৈরির একটি বিশাল প্রকল্প নিয়ে কাজ চলছে। এ সংক্রান্ত ফাইল প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। এটি একটি জি-টু-জি প্রকল্প হবে।’

মন্ত্রী জানান, কুড়িগ্রাম বা নীলফামারীর মতো এলাকায় বড় হাসপাতাল করার যে পরিকল্পনা ঝুলে ছিল, তা কেটে গেছে। দ্রুত এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের দিকে অগ্রসর হচ্ছে দুই দেশ।

সাশ্রয় হবে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা

অর্থনীতিবিদ ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অর্থনীতির জন্য টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, বর্তমানে উন্নত চিকিৎসার পেছনে প্রতিবছর দেশের প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশেই যদি এই মানসম্পন্ন ও সাশ্রয়ী সেবা নিশ্চিত করা যায়, তবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। এটি দেশের মূল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বড় অবদান রাখবে। তবে বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ নিলেও দেশীয় স্বাস্থ্য খাতকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বাংলাদেশে এখনও উন্নত চিকিৎসা সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। চীনের মতো দেশগুলোর পক্ষ থেকে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এলে এবং মানসম্মত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলে দেশে ভালো মানের চিকিৎসা, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও নির্ভরযোগ্য ডায়াগনস্টিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব। এতে রোগীদের বিদেশ ভ্রমণের বাড়তি পরিবহন ও অবস্থানজনিত খরচ বাঁচবে। চীনের এই উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘বিদেশি অর্থায়নে হাসপাতাল নির্মাণের ফলে শুরুতেই কনস্ট্রাকশন খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। স্থানীয় অর্থনীতিতে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া হাসপাতালে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি দেশীয় ডাক্তার ও নার্সদের কর্মসংস্থান হবে। ফলে কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা হস্তান্তরের (স্কিল ট্রান্সফার) সুযোগ তৈরি হবে।’

সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে উন্নত হাসপাতাল তৈরি হলে তৃণমূলের মানুষকে আর চিকিৎসার জন্য রাজধানী বা দেশের বাইরে ছুটতে হবে না। ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকেও এ ধরনের বিদেশি অংশীদারত্ব দেশের পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক নীতিতে এক ধরনের ভারসাম্যের সুযোগ তৈরি করে।’

বিদেশি উদ্যেোগের পাশাপাশি জোর দিতে হবে দেশীয় স্বাস্থ্যখাতে

চীনা উদ্যোগ নিয়ে আশাবাদী হলেও কেবল বিদেশি হাসপাতালের ওপর নির্ভরতাকে টেকসই সমাধান মনে করছেন না সৈয়দ আব্দুল হামিদ। তিনি বলেন, ‘দুই-চার বা ১০টি চাইনিজ হাসপাতাল সব সমস্যার সমাধান করে দেবে না। সরকারের মূল অগ্রাধিকার হওয়া উচিত আমাদের বিদ্যমান স্থানীয় ব্যবস্থা বা স্বাস্থ্য নেটওয়ার্ককে কার্যকর করা।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপকের মতে, চিকিৎসক সংকট, যন্ত্রপাতির যথাযথ মেরামত না হওয়া, বাজেট ও মোটিভেশনের অভাবের মতো দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। দেশীয় স্বাস্থ্য খাতের মূল অবকাঠামোর সার্বিক উন্নয়ন না হলে শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু বিদেশি উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে না।

source: Asia Post

Back to top button