ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তদন্তকারী বিচারপতি লিবারহান আর নেই

ভারতের অযোধ্যার ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা তদন্তের নেতৃত্ব দেওয়া বিচারপতি মনমোহিন সিং লিবারহান আর নেই। ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনে এই বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশন উল্লেখ করে যে, এই ধ্বংসযজ্ঞটি মোটেও কোনো আকস্মিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল উগ্রপন্থিদের সুনির্দিষ্ট ও পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ফসল।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, অন্ধ্রপ্রদেশ ও মাদ্রাজ হাইকোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি মনমোহন সিং লিবারহান গত রোববার চণ্ডীগড়ে নিজ বাসভবনে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। গতকাল সোমবার বন্ধুবান্ধব, পরিবার ও দীর্ঘদিনের সহকর্মীদের উপস্থিতিতে চণ্ডীগড়ে তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে।
১৯৩৮ সালের ১১ নভেম্বর চণ্ডীগড়ের কাছে জন্মগ্রহণ করেন মনমোহন সিং লিবারহান। ১৯৬৪ সালে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে আইন পেশার মাধ্যমে তার দীর্ঘ কর্মজীবন শুরু করেন। পরে ১৯৭০ সালে তিনি প্রথমবার পাঞ্জাব ও হরিয়ানা বার কাউন্সিলে নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে বহাল ছিলেন।
বিচার বিভাগীয় ক্যারিয়ারে তিনি ১৯৯৭ সালের ৭ জুলাই মাদ্রাজ হাইকোর্টের ও ১৯৯৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অন্ধ্রপ্রদেশ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তবে বিচারপতি লিবারহানের দীর্ঘ বিচারিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ও ঐতিহাসিক অধ্যায়টি ছিল ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তদন্ত পরিচালনা। সেবছর ৬ ডিসেম্বর উগ্রপন্থিদের হামলায় ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঠিক ১০ দিন পর অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর ভারত সরকার তার নেতৃত্বে একক সদস্যের তদন্ত কমিশন (লিবারহান কমিশন) গঠন করে।
দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে এই তদন্ত চলেছে। প্রতিবেদন জমার মেয়াদ সবোর্চ্চ ৪৩ বার পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। সবশেষে ২০০৯ সালের ৩০ জুন লিবারহান কমিশন তাদের ১ হাজার ২৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে জমা দেয়। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এটিই ছিল দীর্ঘ সময় ধরে চলা কোনো বিচার বিভাগীয় তদন্ত।
নিজের প্রতিবেদনে বিচারপতি লিবারহান স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছিলেন, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনাটি মোটেই কোনো আকস্মিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল উগ্রপন্থিদের একটি সুনির্দিষ্ট ও পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ফসল।
প্রতিবেদনে তিনি লেখেন, ‘…এটি নিঃসন্দেহে প্রমাণিত যে সেদিনের ঘটনাগুলো স্বতঃস্ফূর্ত ছিল না বা জনগণের আবেগের কোনো অপ্রত্যাশিত বহিঃপ্রকাশও ছিল না। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও উগ্র ডানপন্থি একাধিক সংগঠনের যোগসাজশে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল।’
অভিযুক্ত কট্টরপন্থি রাজনৈতিক নেতাদের পরবর্তীতে আদালত বেআইনি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস দিলেও, ভারতীয় রাজনৈতিক ও বিচারিক ইতিহাসে লিবারহান কমিশনের এই প্রতিবেদনটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এক রাজনৈতিক দলিল হিসেবে গণ্য হয়।
বিচারপতি লিবারহানের প্রয়াণে পাঞ্জাবের সিনিয়র অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল অনু চাতরাথ গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, ‘তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক বিচারক। বিচারিক পরিবেশ যতই উত্তপ্ত হতো না কেন, তার রসবোধ ও বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্ব আদালতের পরিবেশকে সবসময় শান্ত রাখত।’
source: Asia Post







