News

জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন হামলা, ছড়িয়ে পড়ছে ইরান যুদ্ধ

কয়েক দিনের বিরতির পর আবারও ইরানে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। জর্ডানে মার্কিন সেনাদের একটি ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে নতুন করে ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় এসব হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে ওয়াশিংটন।

দ্য গার্ডিয়ান, বার্তা সংস্থা এপি ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, এর আগে সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথভাবে ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর ইরাকে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সময়ে ইরানও হরমুজ প্রণালি ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ও মিত্র দেশের অবস্থানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে কয়েক মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধ এখন আরও বিস্তৃত আঞ্চলিক সংঘাতের দিকে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, বুধবার প্রায় দুই ঘণ্টা জুড়ে চালানো সর্বশেষ হামলায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ‘ডজনখানেক’ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা হয়েছে। এসবের মধ্যে ছিল সামরিক কমান্ড সেন্টার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন স্থাপনা এবং উপকূলীয় নজরদারি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। হামলার পর ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে হামলায় দুজন আহত হয়েছেন। খুজেস্তান প্রদেশেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।

এ হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। জর্ডানে মার্কিন সেনা অবস্থান লক্ষ্য করে ইরানের হামলার পর তিনি বলেন, এবার ‘খুব কঠিনভাবে’ ইরানকে আঘাত করা হবে। নতুন মার্কিন হামলা তাই শুধু একটি বিচ্ছিন্ন প্রতিশোধমূলক অভিযান নয়, কয়েক দিনের যুদ্ধবিরতির পর সংঘাত নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করার ইঙ্গিতও দিচ্ছে।

এর আগের দিনই যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থান লক্ষ্য করে ইরাকে যৌথ হামলা চালায়। সৌদি আরব অভিযোগ করেছিল, ইরাকভিত্তিক মিলিশিয়ারা তাদের তেল স্থাপনাগুলোতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। হামলায় ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) অন্তত ২০ জন সদস্য নিহত ও ৩২ জন আহত হওয়ার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি। তেহরানের এক আঞ্চলিক কর্মকর্তাও বলেছেন, ইরানের ছয়জন সামরিক উপদেষ্টা নিহত হয়েছেন।

পিএমএফ মূলত শিয়া-প্রধান ও ইরানঘনিষ্ঠ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর জোট। ইসলামিক স্টেটের (আইএস) উত্থানের পর ২০১৪ সালে গঠিত এই জোটকে পরে ইরাকি সশস্ত্র বাহিনীর আনুষ্ঠানিক কাঠামোর অংশ করা হলেও এর কয়েকটি গোষ্ঠী উল্লেখযোগ্য স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখেছে এবং অতীতে ইরাকে মার্কিন স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালিয়েছে। ফলে ইরাক এখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের সংঘাতের আরও সরাসরি অংশ হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এদিকে সংঘাতের বিস্তার শুধু ইরাক ও জর্ডানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মিসরের দামিয়েত্তা বন্দরে দুটি প্রাকৃতিক গ্যাসবাহী জাহাজে ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রে জানিয়েছে, হামলায় একটি মার্কিন মালিকানাধীন ভাসমান স্টোরেজ স্থাপনা ও একটি গ্রিক মালিকানাধীন ট্যাংকারে আগুন লাগে। তবে কারা হামলা চালিয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি।

অন্যদিকে সৌদি আরবও হুতিদের সঙ্গে নতুন করে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। ইরানঘনিষ্ঠ ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি তেল স্থাপনা ও লোহিত সাগরমুখী নৌ যানে হামলা চালানোর পাশাপাশি বাব আল-মান্দেব প্রণালির ওপরও অবরোধের হুমকি দিয়েছে। সোমবার তারা সৌদি আরবের তেল পরিবহন অবকাঠামো লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার দাবি করে। এর ফলে ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক নৌ পথও ঝুঁকিতে পড়েছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথে যুদ্ধের কারণে নৌ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সম্প্রতি ইরান ওমানের মধ্যস্থতায় দেওয়া প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছে। ওই প্রস্তাবে আঞ্চলিকভাবে প্রণালিটির ব্যবস্থাপনা এবং জাহাজ চলাচলের জন্য স্বেচ্ছা ফি নেওয়ার কথা ছিল। তেহরান বলেছে, তারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন অংশে একক ব্যবস্থাপনা বজায় রাখতে চায়।

এ পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক উদ্যোগও বড় ধাক্কা খেয়েছে। কয়েক দিনের তুলনামূলক শান্ত পরিবেশে মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবার আলোচনায় ফেরানোর আশা করছিলেন। কিন্তু সর্বশেষ হামলা-পালটা হামলায় সেই সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে গেছে। এর মধ্যেও আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা যুদ্ধবিরতি ফেরানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাতও এরই মধ্যে স্পষ্ট। নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার খবরের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একপর্যায়ে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৮ ডলারের ওপরে উঠে যায়। বৃহস্পতিবার দাম কিছুটা কমে ৮৭ দশমিক ৩০ ডলারে দাঁড়ালেও বাজার এখনো মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি ও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তার দিকে তাকিয়ে আছে।

ফলে ইরান যুদ্ধ এখন আর শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সরাসরি সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইরাকের ইরানপন্থি মিলিশিয়া, সৌদি আরব, জর্ডান, হুতি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেন, হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব— একের পর এক নতুন ফ্রন্ট যুক্ত হচ্ছে এতে।

যুদ্ধবিরতি টিকিয়ে রাখা ও ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফেরানোর যে কূটনৈতিক চেষ্টা চলছিল, সর্বশেষ হামলাগুলো তা আরও কঠিন করে তুলেছে। এখন সবচেয়ে বড় আশঙ্কা— একটি পক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আরেকটি দেশ বা সশস্ত্র গোষ্ঠী সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে পুরো মধ্যপ্রাচ্যই দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে চলে যেতে পারে।

source: Rajneete

Back to top button