News

কাশ্মীরের পাঠাগারে অভিযান চালাচ্ছে ভারত

ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের সব সরকারি পাঠাগার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বই এবং ডিজিটাল আর্কাইভে একযোগে অভিযান ও পর্যালোচনার (অডিট) নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য প্রশাসন।

‘রাষ্ট্রবিরোধী’ বা ‘সন্ত্রাসবাদকে উসকে দেয়’—এমন বই চিহ্নিত করে তা বাজেয়াপ্ত করতে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ভারতের কেন্দ্র সরকারের এমন পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় শিক্ষক, গবেষক ও সাধারণ বাসিন্দারা। তাদের মতে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কাশ্মীরের একাডেমিক স্বাধীনতা ও ইতিহাসকে পুরোপুরি ধ্বংস করা হচ্ছে।

সম্প্রতি নয়াদিল্লি নিযুক্ত জম্মু ও কাশ্মীর প্রশাসন একটি নির্দেশ জারি করেছে। তাতে বলা হয়, পাঠাগার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে থাকা সব বই, সাময়িকী, রেফারেন্স বই ও ডিজিটাল উপাদানের পূর্ণাঙ্গ তালিকা অডিট করা হবে।

নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, ভারত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, ঐক্য ও অখণ্ডতার বিরুদ্ধে যায় কিংবা বিচ্ছিন্নতাবাদ, সহিংসতা বা চরমপন্থাকে উৎসাহিত করে—এমন কোনো বই বা তথ্য উপাদান সংগ্রহ, বিতরণ বা রাখা যাবে না।

মূলত ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কয়েকজন নেতার আপত্তির পর এই মহাজোড়সে অডিট শুরু হয়। সরকারি অর্থায়নে ‘সমগ্র শিক্ষা’ প্রকল্পের অধীনে অঞ্চলের প্রায় ২৫০টি স্কুলে সম্প্রতি দুটি বই বিতরণ করা হয়। বই দুটি হলো—হিলাল আহমেদ ও সন্তোষ মীনার লেখা ‘পার্সোনালিটিজ অ্যান্ড লিজেন্ডস অব জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর’ এবং ড. সুশান্ত গিরির ‘গ্রেট পার্সোনালিটিজ অব জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর’।

জম্মু ও কাশ্মীরের বিরোধীদলীয় বিজেপি নেতা সুনীল শর্মা অভিযোগ করেন, বইগুলোতে ‘ভারত অধিকৃত কাশ্মীর’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে। একে ভারতের সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ এবং তরুণদের মগজধোলাইয়ের চেষ্টা বলে আখ্যা দেন তিনি।

এই বিতর্কের জের ধরে অঞ্চলটির প্রশাসনিক প্রধান মনোজ সিনহা স্কুলশিক্ষা বিভাগের আট কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন। একই সঙ্গে পুরো বিষয় ও লেখকদের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি বিতর্কিত বই দুটির প্রকাশনা সংস্থাকে কালো তালিকাভুক্ত করে তাদের প্রকাশিত অন্যান্য বইও বাজার থেকে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২৪০ পৃষ্ঠার ‘পার্সোনালিটিজ অ্যান্ড লিজেন্ডস অব জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর’ বইটির কিছু লেখা। যেখানে লেখক ও কবিদের পাশাপাশি সশস্ত্র সংগঠন জম্মু অ্যান্ড কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্টের (জেকেএলএফ) প্রতিষ্ঠাতা মকবুল ভাটকে ‘শহীদ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর ভারতীয় কর্তৃপক্ষ নিউ দিল্লির তিহার জেলের ভেতর মকবুল ভাটের লাশ দাফন করেছিল। এ ছাড়া কাশ্মীরের প্রয়াত নেতা সৈয়দ আলি শাহ গিলানির একটি বক্তব্য বইটিতে উদ্ধৃত করা হয়েছিল, যেখানে কাশ্মীরকে ‘জাতিসংঘের অধীনে রাজনৈতিক সমাধানের অপেক্ষায় থাকা একটি বিরোধপূর্ণ এলাকা’ বলে উল্লেখ করা হয়।

কাশ্মীরে বই ও চিন্তার ওপর এমন বিধিনিষেধ এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০২৫ সালের আগস্টে ভারতের বিতর্কিত ফৌজদারি আইনের তোয়াক্কা করে এজি নূরানীর ‘দ্য কাশ্মীর ডিসপ্যুট’, ভিক্টোরিয়া স্কোফিল্ডের ‘কাশ্মীর ইন কনফ্লিক্ট’ এবং অরুন্ধতী রায়ের ‘আজাদী’সহ প্রায় ২৫টি বিখ্যাত রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

এমন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে ইউনিভার্সিটি অব নর্দার্ন কলোরাডোর নৃতত্ত্বের অধ্যাপক ড. আতর জিয়া বলেন, ‘অবাঞ্ছিত উপাদান স্রেফ ছুতো মাত্র। এটি আসলে কাশ্মীরের মানুষের নিজস্ব ইতিহাস ও সত্যকে চিরতরে মুছে ফেলার একটি রাষ্ট্রীয় চক্রান্ত। স্বাধীন চিন্তার প্রকাশ বন্ধ করে এখানে অন্ধ আনুগত্যের এক পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।’

একই সুর প্রবীণ কাশ্মীরি নেতা মীরওয়াইজ উমর ফারুকের কণ্ঠেও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘বই নিষিদ্ধ করে কাশ্মীরের মানুষের ইতিহাস ও জীবনসংগ্রামের স্মৃতি মুছে ফেলা যাবে না।’

২০১৯ সালের আগস্টে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের মাধ্যমে কাশ্মীরের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেওয়ার পর থেকেই এই অঞ্চলে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের নজরদারি চরম মাত্রায় পৌঁছেছে। বইয়ের দোকান ও ঘরে ঘরে পুলিশি তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

পরিস্থিতি এতটাই আতঙ্কের যে কাশ্মীরি বাসিন্দারা এখন নিজেদের ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা ইতিহাস ও রাজনীতিবিষয়ক বই ধ্বংস করে ফেলছেন। নাফিস নামের এক সরকারি চাকরিজীবী আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাবার আমল থেকে সংগৃহীত অনেক দুর্লভ বই আমি নিজের হাতে ফেলে দিতে বাধ্য হয়েছি। যেকোনো সময় পুলিশ এসে হয়রানি করতে পারে—সেই ভয় এখন আমাদের সবাইকে গ্রাস করেছে।’

এএম

source: Daily Amar Desh

Back to top button