জামিনে মুক্তি পেলেন মায়ের চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করে জেলে যাওয়া রায়হান

মায়ের মৃত্যুতে গাজীপুরে ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিরুদ্ধে চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ তোলার পর শক্তিশালী হাসপাতাল মালিকদের পাল্টা মামলায় গ্রেফতার হওয়া তরুণ রায়হান হোসেন রুদ্র আজ রোববার মুক্তি পেয়েছেন।
রায়হানের আইনজীবী এডভোকেট তপন কুমার বলেন, “শুক্রবার গ্রেফতারের পর আজ আদালতে মামলাটি শুনানি করা হলে আমি জামিন আবেদন করি। আদালত সন্তুষ্ট হয়ে আবেদন মঞ্জুর করে রায়হানকে মুক্তির নির্দেশ দেয়।”
গত ১৬ মার্চ চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে আদালতে মামলা করেছিলেন ওই যুবক। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে টাকার বিনিময়ে সমঝোতার প্রস্তাব দিলে তিনি সেটি প্রত্যাখ্যান করেন। পরে কর্তৃপক্ষ রায়হানের বিরুদ্ধে ভাঙচুর ও হাসপাতাল স্টাফদের মারধরের অভিযোগ তুলে পাল্টা মামলা দায়ের করে রায়হানের বিরুদ্ধে। গত শুক্রবার সেই মামলার আসামি হিসেবে রায়হানকে গ্রেফতার টঙ্গী পূর্ব থানা পুলিশ। আজ রোববার মামলার শুনানি হলে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করে।
রায়হান জেল থেকে মুক্তি পেয়ে দ্য ডিসেন্টকে বলেছেন, “টঙ্গী পূর্ব থানার এসআই মনিরুজ্জামান আমাকে গ্রেফতার করার পর বলেছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সাথে সমঝোতা করে ফেললে ভালো হয়। আমি সেটা করতে অস্বীকার করেছি।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে উপ-পরিদর্শক মনিরুজ্জামান দ্য ডিসেন্টকে বলেন, “আদালতের ওয়ারেন্টের কারণে আমরা তাকে এরেস্ট করেছি। এখানে তো আমরা সমঝোতার প্রস্তাব দেওয়ার কেউ না। আমাদের তো এখানে কোন ইনভলভমেন্ট নাই।”
মায়ের মৃত্যুতে রায়হানের তোলা অভিযোগের বিভিন্ন দিক এবং ৮টি ভুয়া পোর্টাল থেকে তার বিরুদ্ধে চালানো সংঘবদ্ধ ক্যাম্পেইন নিয়ে গত ১৯ জুলাই একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য ডিসেন্ট।
দ্য ডিসেন্টের অনুসন্ধানে টাকার বিনিময়ে সমঝোতা প্রস্তাবের প্রমাণ পাওয়া যায়।
এছাড়া রায়হান অভিযোগ করেছিলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হয়ে হুমকি দেন মোহাম্মদ হোসেন নামে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত স্থানীয় এক ব্যক্তি।
মোহাম্মদ হোসেন দ্য ডিসেন্টকে বলেছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুরোধে তিনি ফোন করেছিলেন এবং রায়হানের সাথে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল।
রায়হান দ্য ডিসেন্টকে আরও জানিয়েছিলেন টঙ্গী পশ্চিম থানার ওসি মোহাম্মদ আরিফুর রহমান তাকে ডেকে নিয়ে সাইবার ট্রাইবুন্যালে মামলা ও গুম হওয়ার ভয়-ভীতি দেখিয়ে হাসপাতাল এমডির কাছে দু:খ প্রকাশ করতে বলেছেন। রায়হান আরও অভিযোগ করেন, ওসি তাকে সতর্ক করে বলেছেন, হাসপাতাল কতৃপক্ষের অনেক টাকা, তারা সবকিছু কিনে ফেলবে।
তবে ওসি মোহাম্মদ আরিফুর রহমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, তিনি রায়হানের ভালোর জন্যই তাকে সতর্ক করেছিলেন।
রায়হান তার মায়ের চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করেছিলেন ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিরুদ্ধে।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত কমিটির একজন সদস্য দ্য ডিসেন্টকে জানিয়েছিলেন, চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগের বিপরীতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যেসব ডকুমেন্ট উপস্থাপন করেছে সেখানে তারা অসঙ্গতি পেয়েছেন।
রায়হানের বিরুদ্ধে হাসপাতালে ভাঙচুর ও স্টাফদের মারধরের যে অভিযোগ হাসপাতাল কতৃপক্ষ তুলেছে সে ব্যাপারে কর্তৃপক্ষের কাছে প্রমাণ আছে কিনা তা জানতে চাওয়া হয়।
প্রশ্নের জবাবে হাসপাতালটির সহকারি পরিচালক ডা শেখ মাহমুদ হাসান বলেন, “রায়হান ও সাথের লোকজন হাসপাতালের স্টাফদের মারধর করেছেন এবং আইসিউতে ভাঙচুর চালিয়েছেন এটা সত্য ব্যাপার। আমাদের কাছে ভাঙা কাঁচের ছবি আছে। ভাঙচুর ও মারধর করার ফুটেজ নাই কারণ ওই এলাকায় সিসিটিভি কাভারেজ নেই।”
গাজীপুর ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালের এমডি এম এ মুবিন খান পতিত আওয়ামী সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহেদ মালেকের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ছিলেন।
এছাড়াও আওয়ামী লীগের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন, দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী নীলুফার আহমেদ, প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান, প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক, হাসিনার উপদেষ্টা কুখ্যাত হলমার্ক কেলেঙ্কারির জনক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল মুবিন খানের।
ডা. সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেয়ার লিমিটিডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন। মোদাচ্ছের আলীর দুই কন্যা মোনা আলী ও সাদিয়া আলী রয়েছেন কোম্পানির পরিচালক বোর্ডে।
মুবিন খানের ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেয়ার লিমিটেডের বোর্ড অব ডিরেক্টরস-এ পরিচালক হিসেবে রয়েছেন যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সীমান্তিক এনজিও’র প্রতিষ্ঠাতা আহমদ আল কবির। আহমদ আল কবির ২০০৯ সাল থেকে দুই মেয়াদে মোট ৬ বছর রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন।
২০২৪ সালের নির্বাচনে সিলেট-৫ আসন থেকে আওয়ামী লীগ থেকে নমিনেশন চেয়ে না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন তিনি। আহমদ আল কবির সাবেক অর্থমন্ত্রী এম এ মুহিত ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেনের আত্মীয়। আহমদ আল কবির ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেয়ার এর অন্যতম শেয়ারহোল্ডার।
কোম্পানিটির বোর্ড অব ডিরেক্টরস এর আরেক সদস্য জাতীয় অধ্যাপক ড. শাহলা খাতুন আবুল মাল আব্দুল মুহিত ও আব্দুল মোমেনের আপন বোন। তিনি কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডার হিসেবেও রয়েছেন।
হাসিনার পতনের পর মুবিন খান বিএনপির সাথে মিশে যাওয়ার চেষ্টায় আছেন। সম্প্রতি তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সাথে একটি বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।
সম্প্রতি মুবিন খান সচিবালয়ে গিয়ে বর্তমান মন্ত্রিসভার বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সদস্যের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী, কৃষিমন্ত্রী এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রীসহ আরও অনেকে।
source: The Dissent






