News

ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের কথা বলে পাঠানো হয় রাশিয়ায়, যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত মামুন

ইলেকট্রিশিয়ানের চাকরির কথা বলে ময়মনসিংহের নান্দাইলের তরুণ মামুন মিয়াকে (২৫) রাশিয়ায় পাঠানোর পর যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি জনশক্তি রপ্তানিকারক এজেন্সির বিরুদ্ধে। সেখানে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় নিহত হন মামুন। তার সঙ্গে রাশিয়ায় যাওয়া ঝিনাইদহের রাজন হোসেনের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা তার মৃত্যুর খবর জানতে পারেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছে পরিবার।

রাজধানীর ঢাকার নিকুঞ্জ-২ এলাকায় অবস্থিত ‘জাবাল-ই নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ নামের ওই জনশক্তি রপ্তানিকারক ও রিক্রুটিং এজেন্সি মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে মামুনকে উচ্চ বেতনের ইলেকট্রিশিয়ানের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাশিয়ায় পাঠায়। পরিবারের অভিযোগ, সেখানে পৌঁছানোর চার দিনের মাথায় এজেন্সির লোকজন ও স্থানীয় একটি পাচারকারী চক্র মামুনসহ দলের সবাইকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। পরে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে জোরপূর্বক যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো হয়।

নিহত মামুন উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খারুয়া গ্রামের মৃত আবুল কাশেম ও রোকেয়া খাতুন দম্পতির একমাত্র ছেলে। দেশে তিনি ইলেকট্রিশিয়ান ও প্লাম্বিংয়ের কাজ করতেন। স্ত্রী, এক ছেলে ও পাঁচ মাসের মেয়েকে রেখে চলতি বছরের ৭ মে রাশিয়ার উদ্দেশে দেশ ছাড়েন তিনি। লক্ষ্য ছিল বিদেশে গিয়ে সংসারে সচ্ছলতা ফেরানো।

ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের আশ্বাস পেয়ে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন আল মামুন। তাঁর মৃত্যুর খবর এসেছে বাড়িতে। ছবি: পরিবার থেকে পাওয়া

ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের আশ্বাস পেয়ে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন আল মামুন। তাঁর মৃত্যুর খবর এসেছে বাড়িতে। ছবি: পরিবার থেকে পাওয়া

পরিবার সূত্রে জানা যায়, মামুনের পরিবারটি আর্থিকভাবে খুবই অস্বচ্ছল। সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় ঢাকার জাবাল-ই নূর এজেন্সির কাছ থেকে উচ্চ বেতনের ইলেকট্রিশিয়ানের চাকরির প্রতিশ্রুতি পেয়ে রাশিয়ায় যান মামুন। তাকে রাশিয়ায় পাঠানোর জন্য এজেন্সি তার কাছ থেকে সাড়ে আট লাখ টাকা নেয়। ওই যাত্রায় মামুনের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকার আরও প্রায় ৩০ জন তরুণ ও যুবকের একটি দল ছিল।

রাশিয়ায় পৌঁছানোর চার দিনের মাথায় এজেন্সির লোকজন ও সেখানকার একটি পাচারকারী চক্র মামুনসহ দলের সবাইকে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। সেখানে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে জোরপূর্বক যুদ্ধের ময়দানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

ওই দলে থাকা ঝিনাইদহের রাজন হোসেন গত ৮ সেপ্টেম্বর মামুনের পরিবারকে ফোন করে তার মৃত্যুর খবর জানান। তিনি বলেন, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে ইউক্রেনীয় বাহিনীর একটি ড্রোন হামলায় মামুন নিহত হয়েছেন। মোবাইলে নেটওয়ার্ক না পাওয়ায় খবরটি সময়মতো জানাতে পারেননি তিনি।

মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে রাজন হোসেন জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের দলের ১৭ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। তিনিও গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে এক সহৃদয় চিকিৎসকের সহায়তায় হাসপাতাল থেকে পালিয়ে দেশে ফিরে আসতে পেরেছেন।

মামুনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ভাঙাচোরা বসতঘরের সামনে উঠানে বসে কান্না করছেন মা রোকেয়া খাতুন ও স্ত্রী মহিমা আক্তার। প্রতিবেশীরা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। মহিমা আক্তার জানান, গত ২৬ আগস্ট স্বামীর সঙ্গে তার শেষবার কথা হয়েছিল। তখন মামুন জানিয়েছিলেন, তিনি যুদ্ধের ময়দানে আছেন। তখন তিনি বুঝতে পারেননি, স্বামী কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে গেছেন, তার তো যুদ্ধের ময়দানে থাকার কথা নয়। এখন তিনি স্বামীহারা। কীভাবে তার সংসার চলবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।

মা রোকেয়া খাতুন বলেন, একটু সচ্ছলতার আশায় চার মাস আগে প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা ব্যাংকঋণ ও ধারদেনা করে ছেলেকে বিদেশ পাঠানো হয়েছিল। কারও টাকা এখনো পরিশোধ করতে পারেননি। ছেলের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে ঋণদাতা সমিতির লোকজন বাড়িতে এসে ঘুরে গেছেন। একমাত্র সন্তানের এমন পরিণতি হবে, তা তিনি ভাবেননি। ছেলের রেখে যাওয়া সন্তানদের কীভাবে মানুষ করবেন, তা-ও বুঝতে পারছেন না। এ কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. জামাল উদ্দিন বলেন, মামুনের পরিবারটি খুবই দরিদ্র। চাকরি দেওয়ার নাম করে যারা ছেলেটিকে রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়েছে, তারা গুরুতর অপরাধ করেছেন। এখন মামুনের পরিবারটির কী হবে? স্বজনদের অভিযোগ, উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এ দেশের একটি চক্র প্রতারণা করে যুবকদের যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত বলেন, ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক। বিষয়টি পররাষ্ট্র ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। মামুনের পরিবার লিখিত আবেদন করলে তিনি সেটি কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেবেন।

source: Rajneete

আরো দেখুন
Close
Back to top button