নির্বাচনে বিপর্যয়, ট্রাম্পকে নীতি পরিবর্তনে চাপ রিপাবলিকানদের

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের কাছে বড় পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রাজনৈতিক ও নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছেন তার দলের নেতারা। হোয়াইট হাউজের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পরিবর্তন, প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও বিতর্কিত নীতিগুলো পুনর্বিবেচনার দাবি তুলেছেন রিপাবলিকান কৌশলবিদ ও ট্রাম্পের কয়েকজন মিত্র।
বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ ও আমদানি শুল্কনীতিকে নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন রিপাবলিকান নেতারা। ট্রাম্পের ওপর এসব নীতি-সিদ্ধান্ত বদলে চাপ তৈরির কৌশলের পথে তারা হাঁটছেন।
তবে নির্বাচনের ফলাফলকে নিজের জন্য রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখতে নারাজ ট্রাম্প। ফলে পরাজয়ের পর রিপাবলিকান শিবিরে কৌশলগত মতপার্থক্য ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে।
মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট— উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে। একই সঙ্গে ট্রাম্পের সরাসরি সমর্থন পাওয়া বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থী গুরুত্বপূর্ণ আসনে পরাজিত হয়েছেন। এমনকি দীর্ঘদিন রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কয়েকটি রাজ্যেও ডেমোক্র্যাটরা বড় জয় পেয়েছে।
নির্বাচনের এই ফলকে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনামলের বিরুদ্ধে বড় ধরনের জনরায় হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। রিপাবলিকান কৌশলবিদ জন ফিহেরি নির্বাচনের ফলকে ট্রাম্পের জন্য ‘বড় বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ফিহেরির মতে, এখনই হোয়াইট হাউজে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, ট্রাম্পকে প্রশাসনের অকার্যকর ব্যক্তিদের সরিয়ে নতুনভাবে শুরু করতে হবে। তা না হলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে তার প্রভাব আরও কমতে থাকবে।
কিন্তু ট্রাম্প নিজে পরাজয়ের দায় নিতে রাজি নন। মঙ্গলবার রাতে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নির্বাচনের ফলকে নিজের বিরুদ্ধে আঘাত হিসেবে দেখছেন না। তার এই অবস্থান রিপাবলিকান শিবিরের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
শুধু তাই নয়, ট্রাম্প তার সোশ্যাল নেটওয়ার্ক ট্রুথ সোশ্যালে এ-ও লিখেছেন, ব্যালট পেপারে তার নিজের নাম থাকার কারণেই এই বিপর্যয়কর ফলাফল এসেছে। ব্যালট পেপারে শুধু তার নাম থাকলেই ভূমিধস জয় নিশ্চিত হতো।
ইরান যুদ্ধ ও শুল্কনীতি নিয়ে অসন্তোষ
রিপাবলিকানদের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের সঙ্গে আট মাস ধরে চলা যুদ্ধ। নির্বাচনের আগে দলটির অভ্যন্তরীণ জরিপে দুই কক্ষেই পরাজয়ের আশঙ্কা উঠে এসেছিল বলে হোয়াইট হাউজের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন। তার দাবি, যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে সতর্ক করা হলেও ট্রাম্প অবস্থান পরিবর্তনে রাজি হননি।
যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে এবার প্রকাশ্যে কথা বলেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও। তিনি নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের জন্য ইরান যুদ্ধকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ট্রাম্পের সম্ভাব্য রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত ভ্যান্সের এই মন্তব্যকে প্রেসিডেন্টের অবস্থান থেকে দূরত্ব তৈরির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকানদের ভেতরে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ট্রাম্পের আমদানি শুল্কনীতি নিয়েও দলের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। ব্যবসায়িক খাত ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর এর প্রভাব এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি নির্বাচনী প্রচারে রিপাবলিকানদের বিপাকে ফেলেছে। দলটির উপদেষ্টারা মনে করছেন, অর্থনীতি ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে ভোটারদের উদ্বেগ যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে পারেনি প্রশাসন।
হোয়াইট হাউজে পরিবর্তনের চাপ, সামনে তদন্তের আশঙ্কা
নির্বাচনের পর হোয়াইট হাউজের ভেতরেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে পদত্যাগ, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল ও মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের আশঙ্কা রয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, প্রশাসনের ভেতরে মনোবল এখন তলানিতে। নির্বাচনের ছয় সপ্তাহ আগেই অভ্যন্তরীণ জরিপে দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের হারার আশঙ্কা দেখা গিয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প সেই সতর্কতা আমলে নেননি।
নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে ট্রাম্পের জন্য আরেকটি বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটরা তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করতে, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ আটকে দিতে এবং আইন প্রণয়নে বাধা দিতে পারবে। বিশেষ করে প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, ব্যয় ও নীতিগত কর্মকাণ্ড নিয়ে কংগ্রেসে শুনানি ও তদন্তের চাপ বাড়তে পারে।
রিপাবলিকানদের এক উপদেষ্টা সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্প আগামী দুই বছরও যদি একই বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকেন এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উদ্বেগ উপেক্ষা করেন, তাহলে পরবর্তী নির্বাচনে দল আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
তবে কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও ট্রাম্পের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে। অভিবাসন, শুল্ক, আবাসন ও সরকারি ব্যয়ের মতো বিষয়ে কংগ্রেসের বাধা এড়িয়ে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নিজের কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও রয়েছে হোয়াইট হাউজের। ফলে আগামী দুই বছর ট্রাম্প প্রশাসন ও ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘাত আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
রয়টার্স অবলম্বনে
source: Rajneete







